মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

ঠেকানো যাচ্ছে না করোনার বিস্তার

স্টাফ রিপোর্টার : করোনার সবচেয়ে সংক্রমণশীল ধরন ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। দেশে গত এক সপ্তাহে এর প্রভাবে করোনায় আক্রান্তের হার ৫৫ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়েছে। মৃত্যুর হার বেড়েছে হয়েছে ৪৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। ফলে কোনভাবেই দেশে ঠেকানো যাচ্ছে না করোনার বিস্তার। দিন যতই যাচ্ছে করোনা আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। বাড়ছে  লাশের সংখ্যা। জনমনে বাড়ছে আতংক। আবারো শনাক্তের হার অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সবমহলে বেড়েছে উদ্বেগ। নতুন করে বাড়ানো হচ্ছে লকডাউন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার ডেল্টা ধরনের প্রভাবের মধ্যেই এখন ভাইরাসটির সাউথ আফ্রিকান, নাইজেরিয়ান ও ইউকে ভ্যারিয়েন্টও সক্রিয় হয়ে উঠছে। তবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি অল্প সময়ের মধ্যে মারত্মক শারীরিক জটিলতা তৈরির মাধ্যমে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভারতকে যেভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে, তাতে করোনার এই ধরনটি বড় উদ্বেগের কারণ। এরপরও করোনার বিস্তার ঠেকাতে যে কাজগুলো  করা দরকার ছিল তার কিছুই করা হয়নি। প্রয়োজনের তুরনায় স্বল্প সংখ্যক নমুনা পরীক্ষা ও অ্যান্টিজেন টেস্টের ভেতর দিয়ে সংক্রমণ কত বিস্তৃতভাবে ও কোন ভ্যারিয়েন্টের মাধ্যমে ছড়িয়েছে তার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামের রাস্তায় বের হলে মনে হয় ভাইরাসের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাজারের ভিড় কিংবা যানজটে আটকে থাকা অবস্থাতেও অনেকে মাস্ক পরার বিষয়টি গ্রাহ্য করেন না। এটা অবশ্যই দ্রততার সঙ্গে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি এক জায়গায় অনেক লোক জড়ো হওয়ার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।
সরকারকে অবশ্যই দ্রুততার সঙ্গে ভ্যাকসিন ক্রয় এবং সারা দেশের মানুষকে তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে করে সবাইকে সংক্রমণের সেই গুরুতর অবস্থা থেকে সুরক্ষিত রাখা যায়। তা ছাড়া, সংক্রমণ তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। এ ছাড়া, হাসপাতালগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যা, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ও অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উচ্চ সংক্রমণের এলাকাগুলোতে কোভিডের উপসর্গ নিয়ে অনেক মৃত্যুর ঘটনা হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। মহামারির একেবারে শুরুর দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরীক্ষা, আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্নকরণ ও কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। যা এই ভাইরাসের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাথমিক উদ্যোগ।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত দেড় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ১৩ হাজার ৪৬৬ জনের। নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন তিন হাজার ৫৭ জন। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৪৮ হাজার ২৭ জনে। মৃত ৬৭ জনের মধ্যে পুরুষ ৩৪ জন ও ৩৩ জন নারী। যা গত ৪৮ দিনের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যু। এর আগে গত ২ মে করোনায় ৬৯ জনের মৃত্যু হয়ে ছিল।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৬৭ জনের মধ্যে খুলনা বিভাগেই রয়েছেন ২৪ জন। এছাড়া ঢাকায় ১৪, চট্টগ্রামে ১১, রাজশাহীতে আট, সিলেটে এক, রংপুরে আট এবং ময়মনসিংহে একজন মারা গেছেন।
এরই মধ্যে চীন সরকারের উপহার সিনোফার্মের টিকা দিয়ে দেশে আবারও শুরু হয়েছে টিকাদান কার্যক্রম। গতকাল শনিবার সকাল থেকে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের দিয়ে এই টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
 করোনা নিয়ে সাপ্তাহিক রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ১৩ জুন থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত দেশে সংক্রমণের ২৪তম সপ্তাহে এক লাখ ৪৯ হাজার ১৪০টি নমুনা পরীক্ষায় ২৩ হাজার ৫৪১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ সময় মৃত্যু হয়েছে ৩৯৫ জনের। এছাড়া করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন ১৬ হাজার ১২২ জন।
এর আগে ৬ জুন থেকে ১২ জুন পর্যন্ত সংক্রমণের ২৩তম সপ্তাহে এক লাখ ২২ হাজার ১০৩টি নমুনা পরীক্ষায় ১৫ হাজার ১৭২ জনের করোনা শনাক্ত হয়, মৃত্যু হয় ২৭০ জনের।
গতকাল শনিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাছিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দৈনিক মৃত্যু এবং শনাক্তের তথ্য জানিয়ে বলা হয় ২৪ ঘন্টায় সারা দেশে শনাক্তের হার গড়ে ১৮ শতাংশ। কোন কোন জেলায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শনাক্তের হার দেখা যাচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা সিটিসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ও বাড়িতে উপসর্গ বিহীন রোগীসহ গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন এক হাজার ৭২৫ জন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ৭ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ জন। সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৫১০টি ল্যাবে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে আরটি-পিসিআর ল্যাব ১৩২টি, জিন এক্সপার্ট ৪৪টি, র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ৩৩৪টি। এসব ল্যাবে ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ১৬ হাজার ৯৪৭টি। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৬৩ লাখ পাঁচ হাজার ৫০৩টি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ২৪ ঘণ্টায় মৃত ৬৭ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে রয়েছেন ১৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১১ জন, খুলনা বিভাগে ২৪ জন, রাজশাহী বিভাগে ৮ জন, সিলেট বিভাগের একজন, রংপুর বিভাগে ৮ জন এবং ময়মনসিংহের একজন রয়েছেন। এদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৫৭ জন, বেসরকারি হাসপাতালে ৭ জন এবং বাড়িতে ৩ জন মারা গেছেন।
মৃতদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬০ বছরে ঊর্ধ্বে ২৭ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ২২ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ১২ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের নিচে তিনজন, ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে তিনজন রয়েছেন।
এতে আরও জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে এসেছেন এক হাজার ২৩৪ জন ও আইসোলেশন থেকে ছাড় পেয়েছেন ৪৬৭ জন। এ পর্যন্ত আইসোলেশনে এসেছেন এক লাখ ৫৬ হাজার ১৪০ জন। আইসোলেশন থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৭১৪ জন। বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন ৩০ হাজার ৪২৬ জন।
এদিকে, সম্প্রতি করোনার সাম্প্রতিক রূপ নিয়ে গবেষণা চালিয়েছে গুজরাট বায়োটেকনোলজি রিসার্চ সেন্টার (জিবি আরসি)। তারা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে এই গবেষণা চালায়। তাদের গবেষণা প্রতিবেদনটি এখনও কোনও জার্নালে প্রকাশিত হয়নি এবং পিয়ার-রিভিউ চলছে। এতে বলা হয়েছে, আগের সংক্রমণ বা টিকা নেওয়ার পর শরীরে যে অ্যান্টিবডির জন্ম হয় সেটিকে পাশ কাটাতে পারে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট।
গবেষণা অনুসারে, করোনা ভাইরাসে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে দুটি অ্যামিনো এসিড নেই। তাই ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনে ই১৫৬জি রূপান্তরিত হয়। করোনার স্পাইক প্রোটিন মানবদেহে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় এই সর্বোচ্চ পরিবর্তনের কথা জানান দেয়। ভ্যারিয়েন্টটিতে এই পরিবর্তনের ফলে তা অ্যান্টিবডিকে পাশ কাটাতে পারে। কারণ অ্যান্টিবডি ভাইরাসের যে প্রতিলিপিকে স্মরণ করতে পারে সেটির সঙ্গে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সামঞ্জস্য থাকে না।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিবডিকে পাশ কাটিয়ে সংক্রমিত হওয়ার ঘটনা খুব বেশি না। ভারতীয় চিকিৎসক ড. অমিত প্রজাপতি জানান, এপ্রিল-মে মাসে তারা দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়া মাত্র একজনকে পেয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের বিভাগে দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়া মাত্র একজন রোগী পাওয়া গেছে। তাই এই গবেষণাকে একটি সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখা উচিত। যাতে করে অ্যান্টিবডি তৈরি হলেও নিজেদের সুরক্ষার বিষয়টি আমরা যেনও অগ্রাহ্য না করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ