শুক্রবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

অসাধু চক্রের কারণে সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছে অনেক ভোক্তা

টিসিবির ট্রাকসেলে ক্রেতাদের ভিড়

এইচ এম আকতার : নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিসিবির ট্রাকে পণ্য বিক্রি করছে সরকার। যদিও বাজারে ইতিবাচক কোন প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। ভোগ্যপণ্যে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস অবস্থা। তবে কিছুটা সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকের দীর্ঘ লাইনে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষও দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে অসাধু কিছু ভোক্তা এ পণ্য প্রতিদিন সংগ্রহ করে বেশি দামে বিক্রি করছে। এতে করে বঞ্চিত হচ্ছে অনেক ভোক্তা।
গত প্রায় ৫ মাস ধরেই চাল তেল ডাল চিনিসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম কোন যুক্তির কারণ ছাড়াই বাড়ছে। সরকার দফায় দফায় ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠক করলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। চাল এবং পেঁয়াজের ভরা মৌসুমেও দাম বেড়েছে নানা অযুহাতে। বৃদ্ধির তালিকায় যুক্ত হয়েছে চিনি,ডাল গুড়াদুধসহ সব ধরনের বেকারি পণ্যের। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রনে অভিযান চালালেও কোন কাজ হয়নি। উল্টো কোন কোন স্থানে দাম আরও বেড়েছে। এনিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। গত রমজানে সরকার টিসিবির মাধ্যমে ট্রাকে পণ্য বিক্রি জোরদার করলেও বাজারে তার কোন ইতিবাচক প্রভাব পরেনি।
জানা গেছে, শুধু ঢাকাই ১০০ ট্রাকে টিসিবির পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এ পন্য কিনতে আগে নিম্ম আয়ের লোকেরা ভিড় করলেও এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত। যার কারণে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু এক শ্রেনীর অসাধু ভোক্তার কারণে এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। অভিযোগ রয়েছে,এক শ্রেণীর গরিব মানুষ প্রতিদিনই টিসিবির পন্যের জন্য ট্রাকের লাইনে দাড়ান। টিসিবি’র পণ্যের মূল্যের সাথে খোলা বাজারে পণ্যের দামে অনেক ফারাক। যার কারণে এ চক্র প্রতিদিনই পন্য কিনছে। দীর্ঘ লাইনের অধিকাংশ থাকেন তারা। এ শ্রেনির মধ্যে রয়েছে কাজের বুয়া,ফুটপাতের ছিন্নমূল মানুষ। রয়েছে বেকার মানুষও। বাজারে এক কেজি সয়াবিন তেওেলর দাম এখন ১৫৩ টাকা। আর ট্রাকে এক কেজি তেলের দাম ১০০ টাকা। একইভাবে এক কেজি ডালের দাম ৫৫ টাকা আর বাজারে ৯০ টাকা। প্রকার ভেদে এক কেজি মসুর ডালের দাম ১৩০ টাকা। চিনি খোলা বাজারে বিক্রি হয় ৭৫/৭৮ টাকায় আর ট্রাকে তা বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। একইভাবে এক কেজি পেঁয়াজ খোলা বাজারে ৪৫/৫০ টাকা আর ট্রাকে তা বিক্রি হয় ২০ টাকায়। এতে করে এ অসাধু চক্র দিন দিন বাড়ছে। প্রথমে তারা সংখ্যায় কম ছিল এখন প্রতিটি ট্রাকের সামনেই তাদের সংখ্যাই থাকে ৪০/৫০ জন। আর তারাই থাকেন লাইনের আগে। তারা পল্টনে সকালে দাড়ালে বিকালে দাড়ান যাত্রাবাড়ি। দিনে একই ব্যক্তি একাধিক স্থান থেকে পন্য সংগ্রহ করেন থাকেন। এসব পন্য তারা নিজেদের স্বচ্ছল আত্মীয় এবং প্রতিবেশির কাছে বেশি দামে বিক্রি করেন। তবে তা খোলা বাজার থেকে অনেকটা সাশ্রয়ী। যার কারণে এ পন্য বিক্রি করতে কোন অসবিধা হয় না। একই ব্যক্তি ট্রাকের পন্য ঘুরে ফিরে নানা স্থান থেকে কেনার কারণেই বাজার তার কোন প্রভাব পড়ছে না। কারণ সর্বস্থরের সাধারণ মানুষ এ পন্য পাচ্ছে না।
 এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন,দয়াগঞ্জের বাসিন্দা আমানুল হক। তিনি বলেন,আমি যতদিনই ট্রাক থেকে পণ্য ক্রয় করেছি তত দিনই এই ৩০/৩৫ জন মহিলাকে এখন থেকে পন্য সংগ্রহ করতে দেখিছি। এছাড়াও আমি দয়াগঞ্জে একটি অফিসে কাজ করি। সকাল-বিকাল অফিস থেকে এ রাস্তায় আসা যাওয়া করি। সব সময় তাদের লাইনে দেখি। তারা এত পন্য কি করেন। অবশ্যই তারা তা বিক্রি করেন। তাদের কারণে অনেকে দীর্ঘ লাইন দেখে চলে যান পন্য সংগ্রহ না করেই। এতে করে সাধারন মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। সরকার যদি আগের মত ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ফটো কপি নিয়ে পন্য বিকি করতেন তাহলে এমন হতো না। তাছাড়া টিসিবির মনিটরিংও থাকার দরকার ছিল। কিন্তু তা নেই।
তবে ক্ষুদ্ধ ক্রেতারা মনে করেন সরকার বাজারে টিসিবির পণ্য বিক্রি করে বাজার নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থ চেষ্টা আগেও প্রমানিত হয়েছে। এতে কিছু গরিব মানুষের উপকার হলেও বাজার দাম নিয়ন্ত্রনে তেমন কোন প্রভাব ফেলে না। সরকার যদি সারা দেশে মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে পারতো তাহলেই দাম নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু সরকার তা না করে কিছু ডিলারকে সুবিধা দেয়া জন্যই এ পদ্ধতি চালু রাখে। তারা মনে করেন, কোম্পানিগুলো কত দামে কোন পণ্য আমদানি করে তা জানা আছে। আর তারা কত দামে বিক্রি করবে তাও জানা আছে। সরকার নানা সময় কিছু পণ্যের দাম নির্ধারন করে দিলেও তা ব্যবসায়ীরা মানছে না। কিন্তু কেন তার কোন উত্তর নেই।
 ট্রাকের চিত্র দেখে প্রশ্ন জাগে দেশে দারিদ্রের সংখ্যা কত। ন্যায্যমূল্যে চিনি, মসুর ডাল ও সয়াবিন তেল কিনতে দীর্ঘলাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে ক্রেতারা। তারা বলছেন, বাজারে এসব পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়াতেই টিসিবির ট্রাকে যাচ্ছে তারা। এতে আগের তুলনায় টিসিবির পণ্য শেষও হচ্ছে দ্রুত। ফলে অনেকে অপেক্ষা করেও পণ্য পাচ্ছে না।
পণ্য কিনতে আসা ক্রেতারা স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। গাদাগাদি ঠেলাঠেলি করে লাইনে দাঁড়িয়ে তারা পণ্য কিনছেন। প্রয়োজনের তুলনায় পণ্য সরবরাহ কম ও নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে ট্রাক আসায় এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। রাজধানীর খিলগাঁও, মালিবাগ, মুগদা, রামপুরা ও প্রেসক্লাব এলাকায় এমন চিত্র দেখা যায়।
খিলগাঁও রেলগেট কাঁচাবাজারের কাছে ফ্লাইওভারের নিচে টিসিবি ট্রাকের সামনে শত শত ক্রেতার দীর্ঘ সারি দেখা যায়। পুরুষদের লাইন যেমন দীর্ঘ, তেমনি নারীদের লাইনও অনেক লম্বা। নারী ক্রেতারা ধাক্কাধাক্কি করছে পণ্য নিতে। একই অবস্থা দেখা যায়, মুগদা এলাকার ট্রাকেও। সেখানে ক্রেতাদের লাইন অনেক দীর্ঘ। দুপুরের খাঁ খাঁ রোদেও গাদাগাদি করে লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনছেন ক্রেতারা।
রহিমা নামের এক ক্রেতার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেই সকাল থাইক্যা লাইনে দাঁড়াইছি। অহনো জিনিস কিনতে পারি নাই। এক কেজি ডাইল, এক কেজি চিনি আর এক কেজি তেল দিতাছে। লাইনে ফাঁকা রাখলে মাঝখানে আরেকজন ঢুইক্যা যায়। তাই ঘেইষ্যা দাঁড়াইছি। তবে বিক্রেতাদের এসব দেখার সময় নেই। তারা দ্রুত পণ্য দিয়ে ক্রেতাদের বিদায় করছেন। এক কেজি করে তেল, ডাল ও চিনির প্যাকেজ ২১০ টাকায় বিক্রি করছেন।
টিসিবি পণ্যের বর্তমান মূল্য হচ্ছে- মসুর ডাল ৫৫, চিনি ৫৫ এবং তেল ১০০ টাকা কেজি। কোথাও কোথাও আবার দুই কেজি ডাল, দুই কেজি চিনি এবং দুই কেজি তেল এরকম প্যাকেজ করে বিক্রি করা হয়।
খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নিচে টিসিবির পণ্য বিক্রেতা মো. ছালাম বলেন, প্রতিদিন ১০টা থেকে এখানে আমরা ট্রাকে পণ্য বিক্রি করি। আমরা মসুর ডাল, তেল ও চিনি বিক্রি করছি। প্রতি লিটার তেল ১০০ টাকা, প্রতিকেজি ডাল ৫৫ টাকা, প্রতিকেজি চিনি ৫৫ টাকায় বিক্রি করছি। প্রথম ঘণ্টায় মসুর ডাল ও তেল শেষ হয়ে গেছে। এজন্য ক্রেতাদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আমরা কি করব টিসিবি যে পরিমাণ পণ্য দেয়, আমরা তাই বিক্রি করি।
এককেজি সয়াবিন তেলের বাজার দর ১৫৩ টাকা। আর ট্রাকে বিক্রি হয় ১০০ টাকায়। আর এ কারনে ট্রাকে এখন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষও দীর্ঘ লাইনে দাড়াচ্ছেন। কিন্তু অনেক ট্রাকেই সয়াবিন তেল নেই। ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ শিউলি আক্তার । তিনি একটি গার্মেন্টেসে চাকরি করেন। তিনি বলেন,তেলের জন্য লাইনে দাড়িয়েছি। কিন্তু তেল পাইনি। তাহলে কি লাভ হলো দুই ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে। তিনি আরও বলেন যেসব ট্রাকে তেল আছে সেখানে আবার শর্ত জুড়ে দেন চিনি নিতে হবে দুই কেজি। তাহলেই দুই কেজি তেল পাবে।
স্বাস্থ্যবিধির কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, মানুষ না মানলে কি করব। কে কার আগে লাইনে দাঁড়াবে, এ নিয়ে ঠেলাঠেলি ধাক্কা শুরু হয়। কেউ মানতে চায় না। আমরা পণ্য বিক্রি করব, নাকি লাইন মেনটেন করব। আসলে মানুষ নিজ থেকে সচেতন না হলে জোর করে সচেতন করা যায় না। পণ্য কিনতে আসা কাদির মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, এখন শুনি মসুর ডাল নেই, তেল নেই। এত কষ্ট করে দাঁড়ানোর পরে যদি শুনি মাল নেই তাহলে কেমন লাগে।
জানা গেছে, গত ১ মার্চ থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে আসন্ন রমজান মাস উপলক্ষে ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রয় শুরু করেছে টিসিবি। টিসিবির পণ্য দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টিসিবির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যে ঢাকা শহরের ১০০টি স্থানে ট্রাকের মাধ্যমে টিসিবি পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
ঢাকায় যেসব স্থানে টিসিবির পণ্য বিক্রি হচ্ছে- প্রেসক্লাব, সচিবালয় গেট, দিলকুশা/বাংলাদেশ ব্যাংক, যাত্রাবাড়ী বাজার, ইত্তেফাক মোড়, শান্তিনগর বাজার, ডিসি অফিস, শাহজাহানপুর বাজার, শ্যামলী মোড় ন্যাম গার্ডেন, গাবতলী/টেকনিক্যাল, বাংলা কলেজ, সাভার বাজার, খামারবাড়ী, আনন্দ সিনেমা হল (ফার্মগেট), বেগুনবাড়ী, মিরপুর-১ মাজার রোড, নন্দিপাড়া কৃষি ব্যাংক, উত্তরা/আবদুল্লাহপুর, আদাবর/মনসুরাবাদ, হাজী ক্যাম্প, শেওড়াপাড়া, ৬০ ফিট (ভাঙা মসজিদ), মিরপুর-১০ গোলচত্বর, মিরপুর-১১, মিরপুর-২/১২, মিরপুর-১৩ দিগন্ত সমবায় সমিতি, মিরপুর-১৪ কচুক্ষেত, আনসার ক্যাম্প মিরপুর, ভাসানটেক বাজার, কালশী (ইসিবি), পলাশি ছাপড়া মসজিদ, জিগাতলা/ধানমন্ডি সরকারি কলোনী, শাহ সাহেব বাজার/আজিমপুর, বছিলা, মতিঝিল সরকারি কলোনী, মধ্যবাড্ডা, সাতারকুল বাজার, বনশ্রী বাজার, মেরাদিয়া বাজার, মুগদা, গোপীবাগ কমিউনিটি সেন্টার, শনির আখড়া, সারুলিয়া বাজার, গুলশান ভাটারা বাজার, উত্তর বাড্ডা বাজার, ভিকারুননিসা ১০নং ইস্টার্ন হাউজিং গেট, কারওয়ান বাজার, কলমিলতা বাজার, রামপুরা বাজার, মালিবাগ বাজার, বাসাবো বাজার, ধলপুর কমিউনিটি সেন্টার, মৌচাক, খিলগাঁও তালতলা, কাপ্তান বাজার, শোয়ারীঘাট/নবাবগঞ্জ সেকশন, রাজলক্ষী/জসিমউদ্দিন ও তেজগাঁও গুদামের পেছনে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ