সোমবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

কেমন আছেন কঠিন সময়ের পরম বন্ধু সেবিকারা

ইবরাহীম খলিল : করোনা মহামারিতে চ্যালেঞ্জের মুখে বিশ্ব। কঠিন সময় পার করছে গোটা দুনিয়া। ক্ষুদ্র এক ভাইরাস থমকে দিয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবন। আতঙ্কজাগানিয়া এই সময়ে যারা মানবতার তরে নিজেদের সঁপে দিয়েছেন তাদের মধ্যে নার্সরা অন্যতম। নিজেদের জীবনবাজী রেখে, পরিবার-পরিজনের মায়া ভুলে তারা মমতার পরশ দিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন রোগীদের। নিজেদের জীবন বিপন্ন করে তারা দাঁড়িয়েছেন আর্ত-মানবতার পাশে। করোনা আক্রান্তদের সেবা দিতে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেক নার্স নিজেরাই আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুমুখ থেকে কেউ ফিরে এসেছেন, আর কেউ পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে।
যখন কোন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন হাসপাতালে দক্ষতার সঙ্গে পরম বন্ধুর মতো মায়া মমতা দিয়ে সেবা দেন সেবিকারা। ইংরেজিতে তাদের ডাকা হয় নার্স। বিশেষ করে এই করোনাকালে মহা মসিবতের দিনে কেউ কভিডে আক্রান্ত হয়েছেন; জানতে পারলেই আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবরা অনেকেই দূরে সরে গেছেন। কোনমতে হাসপাতালে ভর্তি করে দিতে পারলেই বাঁচা গেল। অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে। হাসপাতালে ভর্তির পর একজন রোগীর জন্য সবচেয়ে আপনজন হয়ে ওঠেন চিকিৎসক এবং সেবিকারা। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের চেয়েও বেশি সময় কাছে থাকেন সেবিকারা। একজন রোগী ভাল-মন্দ প্রয়োজনের সময় কাছে পান তাদের।
বিশেষ করে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে রোগীদের সঙ্গে আত্মীয় স্বজন থাকার কোনো সুযোগ নেই। এই সময়ে রোগীদের পরমবন্ধু এবং একান্ত নির্ভরতার জায়গা হয়ে ওঠেন সেবিকারা। তারাই দায়িত্ব নেন রোগীর ভালমন্দ দেখাশোনা করার। নিজেদের ভাল-মন্দ চাওয়া পাওয়া উপেক্ষা করে কোনরকামের প্রনোদনা না পেয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা রোগীদের সেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বাংলাদেশের সেবিকারা। যাদের প্রনোদনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তারা দীর্ঘ পরও পাননি সেই সামান্য অর্থ। ঠিক কবে পাবেন তার ঠিক ঠিকানা নাই। কেবল আশ্বাসের আশাতেই দিন কাটছে তাদের।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স আবিদা ছানজানা (ছদ্মনাম)। সীমান্তবর্তী জেলার এই হাসপাতালটি এখন করোনা ডেডিকেটেড। ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ করেই হাসপাতালে করোনার করোনা রোগী বেড়ে গেছে। তাই দলে দলে করোনার চিহ্ন নিয়ে রোগী আসতে থাকে হাসপাতালে। অবিবাহিত আবিদা এসব করোনা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন অকাতরে। স্বামী-সন্তান নাই অনেকটাই পিছুটান হীন আবিদা। ১৫ দিন ডিউটি করার পর আরও ১৫ দিন থাকতে হয় কোরেনটিনে। নানা কারণে ঠিক মতো থাকতে পারেন না আইসোলেশনে। একারণে ইতিমধ্যে তার বাবা আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। নিজেকেও মাঝেমধ্যে আকান্ত মনে হয়। সেই সন্দেহ থেকে স্যাম্পল দিয়েছেন।
দৈনিক সংগ্রামের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানালেন, হাসপাতালে নিলুফা নামের একজন রোগী প্রথম করোনা নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। সেই রোগী তিনি নিজেই রিসিভ করেছিলেন। এরপর আরও অনেক রোগীকে তিনি সেবা দিয়েছেন। এখন হাসপাতালে রোগী বাড়লেও ততটা আতংক নেই। কিন্তু শুরুর দিকে প্রচণ্ড উদ্বেগ-উৎকন্ঠার মধ্যে রোগীর সেবা করতে হয়েছে। মনে হয়েছে এই বুঝি আমি নিজেও আক্রান্ত হলাম। মৃত্যুর কাছাকাছি থেকেই আমাকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। অনেকে রোগীর সেবা দিতে গিয়ে মারা গেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, করোনা রোগীর সবচেয়ে কাছে থাকতে হয় নার্সদের। করোনা রোগী দেখে আত্মীয় স্বজন বন্ধু-বান্ধব সবাই পালালেও আমাদের পালানোর সুযোগ নেই। আমাদের থাকতে হয় রোগীর কাছাকাছি। সেবা দিতে হয় একান্ত আপনজন মনে করে। সেবার মানসিকতা নিয়ে এই পেশায় এসেছি। সেই তারণা থেকেই আমাদের সাধ্যমত সেবাটা দিয়ে থাকি।
তিনি আরও জানালেন, শুরুর দিকে প্রচণ্ড ভয় কাজ করলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ডিউটি করেছি। এখন ভয় অনেকটা কমে গেছে। অনেকটা আক্ষেপের সুরে তিনি জানালেন, কঠিন সময়ে আমরা ডিউটি করেছি। কিন্তু প্রনোদনার একটি টাকাও পেলাম না আজ পর্যন্ত। আমাদের সঙ্গে ডাক্তাররাও দায়িত্ব পালন করেছেন তারা প্রণোদনার টাকা পেলেন কিন্তু আমরা পেলাম না। কবে পাবো তাও জানতি পারছি না।
আবিদা ছানজানার মতো সারাদেশে দায়িত্ব পালন করা বেশিরভাগ নার্সের কাজের অভিজ্ঞতা এবং আক্ষেপ একইরকম। করোনাকালে ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকেরা যেমন রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে গেছেন, তেমনি রোগীর পাশে থেকেছেন নার্সরা। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব নার্সেস জানিয়েছে, গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বের ৫৯টি দেশের ২ হাজার ৭১০ জন নার্স করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএনএ) হিসাবে, দেশে ১৪ হাজারের বেশি নার্স সরাসরি করোনা রোগীর সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে তিন হাজারের বেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ২৫ জন। এই হিসাবটি শুধু সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের। সবকিছু জেনেই সেবা দিতে হয় একজন নার্সকে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা হিসেবে দুই মাসের বেসিকের কথা ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক সময় পার হলেও সেই টাকা অনেকেই এখনও পাননি।
নার্সিং পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনার কারণে সারা বিশ্বেই নার্সদের ভূমিকা নতুন করে সামনে এসেছে। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য খাতে নার্সরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তা সবাই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। নার্সরা বলেছেন, করোনার শুরুর দিকে হাসপাতালে নানা রকম সংকট ছিল। করোনা রোগীর সেবার কারণে সামাজিকভাবে তাঁদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। কেউ কেউ হেনস্তারও শিকার হয়েছেন। তবু তাঁরা পিছু হটেননি। সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছেন সব ভয়কে উড়িয়ে।
নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন জানায়, মারা যাওয়া ২৫ জন নার্সের মধ্যে ১৮ জন ৩৭ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। বাকিদের ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়াধীন। বিএনএর হিসাবে দেশের সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৩৮ হাজার নার্স কাজ করেন। বেসরকারি হাসপাতালে নার্সের সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার। সংগঠনটির দাবি, হাসপাতালের শয্যার অনুপাত বিবেচনা করলে দেশে আরও ৮০ হাজার নার্স প্রয়োজন।
 সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি এন্ড রাইটসের করা এক জরিপ বলছে, করোনাকালে ৮৬ শতাংশ নার্স পূর্ণ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম পায়নি। গত ১৯শে এপ্রিল থেকে ২৪শে এপ্রিল পর্যন্ত অনলাইনে একটি জরিপ করে এই তথ্য পাওয়া যায়। ওই জরিপে অংশ নিয়েছিল সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের ৭০০শর বেশি নার্স।
এসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, প্রথম দিকে নার্সরা সুরক্ষাসামগ্রী দেরিতে পান। এত কিছুর পরও নার্সরা সেবা থেকে পিছু হটেননি। আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে দোষত্রুটি সব পেশাতেই থাকে।
সোসাইটি ফর নার্সেস সেইফটি অ্যান্ড রাইটস জানায়, বাংলাদেশে ৬৬ হাজার ৯৭৩ জন নার্স প্রায় ১৭ কোটি মানুষকে সেবা দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী ১ জন চিকিৎসকের সঙ্গে তিনজন রেজিস্ট্রার্ড নার্স থাকা দরকার। সে হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় আড়াই লাখ নার্সের ঘাটতি রয়েছে। নার্স কম থাকায় অসুস্থ রোগীরা যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
কেবল করোনা নয়, গেল বছর দেশে ডেঙ্গু মোকাবেলায় নার্সরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। করোনাকালীন নানা সীমাবদ্ধতা আর সঙ্কটের মধ্যেই নার্সরা বিরামহীন ডিউটি করে যাচ্ছে। সারাদেশে করোনা ভ্যাক্সিন কার্যক্রম সম্পূর্ণ নার্সদের উপর নির্ভরশীল। এরপরও নার্সদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করে সংগঠনটির নেতারা বলেন, জরুরি ভিত্তিতে সরকারিভাবে নার্স নিয়োগ, নার্সদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক ক্ষমতায়নে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আলাপকালে স্বাধীনতা নার্সেস এসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. ইকবাল হোসেন সবুজ জানান, সরকারী হাসপাতালগুলোতে অনেকেই প্রণোদনা পাননি। খুব শিগগরিই তারা পাবেন বলে প্রত্যাশা করছি। জুন মাসেই পাওয়া যাবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, বেসরকারী হাসপাতালে যারা চাকুরী করেন তাদের প্রণোদনা নেই। সরকারের উচিত তাদের জন্যও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। এই কঠিন সময়ে সরকারী-বেসরকারী নার্সরা সাহসের সাথে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রনোদনা একেবারেই কম। অথচ ভারতে করোনা শুরু হওয়ার পর থেকেই ডাক্তারসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের ডাবল বেতন। সারা বিশ্বজুড়েই স্বাস্থ্যবিভাগের লোকজনের জন্য সুযোগ সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। আমাদের জন্য যা দেয়া হয়েছে তা খুবই কম।
করোনাকালে মা বাবা আত্মীয়স্বজন ফ্যামেলির লোকজন পালিয়েছে। কিন্তু আমরা জীবন বিপন্ন করেও সেবা দিয়ে গেলাম। নার্সরা যেন ন্যায্য পাওনাটুকু পায় সেই চাওয়া আমাদের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ