বৃহস্পতিবার ০৫ আগস্ট ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

 

সাজজাদ হোসাইন খান

॥ চুয়াল্লিশ ॥

শান্তিবাগে কিশোর সংঘ নামে একটি ক্লাব ছিলো। বেশ কজন ভালো খেলোয়াড় ছিলো সেইে ক্লাবে। রাজা ভাই মনির ভাইয়ের চেহারা এখনো চোখে ভাসে। রাজাভাই খেলতেন ব্যাকে আর মনির ভাই মধ্যমাঠে। শান্তিবাগ কিশোর সংঘ থেকে রাজাভাই গিয়ে উঠলেন ভিক্টোরিয়া ক্লাবে, আর মনির ভাই নাকি ওয়ান্ডার্স ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন। রাজাভাই বেটেখাটো, বেশ বলবান। পর্বতের মতো আটকে রাখতো গোলপোস্ট। বল যখন কিক করতেন মনে হতো কামান ফুটছে। আর মনির ভাই মাঝ মাঠে ছুটতেন যেনো দাঁড়াস সাপ। ছিপছিপে গড়নের এক তরুণ।

শান্তিবাগের দিনগুলো ছিলো আনন্দ ফুর্তিতে টইটম্বুর। বিখ্যাত গায়ক ওস্তাদ ওসমান খাঁ থাকতেন আমাদের বাসার একটু তফাতে। প্রতি সকালে তিনি রেওয়াজ করতেন। গান করতেন। শুয়ে শুয়েই সে গান শুনতাম। বেশ লম্বা চওড়া লোক ছিলেন ওস্তাদ ওসমান খাঁ। বিখ্যাত গায়ক নাকি তিনি। রেডিওতে গান করেন। কলকাতায়ও নাকি তিনি গান করতেন। সেখানেও তার খুব নামডাক। সকাল বিকাল তিনি হেঁটে যেতেন মাঠের পাশ দিয়ে। দূর থেকে দেখতাম আর ভাবতাম আমার বাসার পাশেই তিনি থাকেন। কি আনন্দ। মাঝেমধ্যে গর্বও হতো এ জন্যে। একবার শান্তিবাগের এক অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন। তখনি অনেক কাছ থেকে তাকে দেখি। কত সরল কত বিনয়ী। গুণিরা বুঝি এমনই হয়। 

ডেংগু হাজি আর মগা হাজি দুই ভাই। শান্তিবাগের আদিবাসিন্দা। এক সময় মান্যগণ্য লোক ছিলেন। এলাকার বিচার শালিসি করতেন। কথা বলতেন ঢাকার স্থানীয় ভাষায়। এখানকার বেশির ভাগ জমি জিড়াতই ছিলো তাদের। তাই ফখর অন্যরকম। এই ফখরের লেজ দোলাতেন সময় অসময়ে। বাইরের লোকজন এসে জমা হতে লাগলো শান্তিবাগে। দেখতে দেখতে কোণঠাসা হয়ে পড়লো স্থানীয়রা। মগা আর ডেঙ্গু হাজিরা। তাদের দাপট কমতে লাগলো। মান সম্মানে ভাটার টান। এজন্যে রাগ আর গোস্সায় চোখজোড়ায় দুপুরে সূর্য দাউ দাউ। কানের লতিতে লেপটে থাকে আগুনে বাতাস। প্রায়ই চোটপাট দেখাতেন। নতুন বাড়িওয়ালারা ফু দিয়ে উড়িয়ে দিতো। মুখ থুবড়ে পড়তো মাটিতে মগা হাজিদের হম্বিতম্বি। ইজ্জতের ব্যাপার। আলাদা ক্লাবঘর তুললেন।

মণ্ডা মিঠাই বিলিটিলি করলেন। এতো কিছুর পরও ইজ্জতের নদীতে জোয়ার উঠলো না। তীরেই আটকে থাকলো। দিন যাচ্ছে মাস যাচ্ছে। টুপটাপ করে ঝরছে গোস্সা-রাগ। একসময় সব ঠিকঠাক। দুই পাড়াতেই খুশির খুশবু। মগা হাজি ডেঙ্গু হাজির মনের উঠানে বকুল ফুল ঝুরঝুর। বিষয়টা ছিলো শিক্ষা আর অশিক্ষার লড়াই। মগা হাজিরা অ আ লিখতে কলম ভাংতো দু’চারখানা। একবার গান-বাজনার আয়োজন করলো মগা হাজিরা ওপাড়ায়। আনন্দের বাতাস তামাম শান্তিবাগে। গানটান গাইল অনেকে। ওস্তাদ ওসমান খাঁও গাইলেন। হাসির গান। হাসতে হাসতে পেটে নাড়িভুড়ি প্যাঁচ লাগে এমন। সাবিনা নামের এক শিশুশিল্পীও গাইল। খুব সুন্দর গলা। তার গানে হাততালি পড়লো অনেক। সাবিনারা শান্তিবাগেই থাকতো। আলমগীর আর জাহাঙ্গীর ওরা দু’ভাই। আমাদের সাথেই খেলতো। জাহাঙ্গীর ছোট। ওর সাথেই আমার দুস্তি। কোনো কোনো দনি ওদের ঘরে যেতাম। পাশের বাড়িতেই সাবিনারা। চার বোন, সবাই নাকি গানবাজনা করে। নাটক ফাটক করে। আলমগীর জানিয়ে ছিলো। নামও বলেছিল ফটাফট। ফৌজিয়া ইয়াসমিন, নিলুফার ইয়াসমিন, ফরিদা ইয়াসমিন সবশেষে সাবিনা ইয়াসমিন। আলমগীরদের বারান্দায় দাঁড়ালেই সাবিনাদের ঘরসংসার নজরে আসতো।  সাবিনার তো গান গেয়েই পরিচয়। তার নাম তখন শান্তিবাগের বাতাসে ডানা ঝাপটায়। দিনের পৃষ্ঠা ওলোট পালোট হচ্ছে। এদিকে সাবিনার গলাও ঢুকে যাচ্ছে ঘরে ঘরে। যেনো গানের প্রজাপতি। টুকটাক করে হাঁটছে দিন, মাস। ঘি-চপচপ শান্তিবাগের চেহারা। ঘরবাড়ি উঠছে নতুন নতুন। দূরদেশ থেকে আসছে মানুষজন। খেলার মাঠও জমজমাট। নতুন মুখ নতুন ধরন। আনন্দ আর খুশির ঝুনঝুনি। কানে এসে লাফিয়ে পড়ে ঝুনঝুনির আওয়াজ। স্কুলের ঘণ্টার মতো। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ