বৃহস্পতিবার ০৫ আগস্ট ২০২১
Online Edition

জমিদার দর্পণ সমাজবাস্তবতার ধারাভাষ্য

ইনামুল করিম:

(গত সংখ্যার পর)

বস্তুত জমিদাররা তাদের জমিদারী এ স্টেটকে নিজস্ব সম্পত্তি মনে করতো। অপরদিকে অনেক জমিদারও জমিদার সন্তানরা ছিলেন লম্পট। প্রজাদের সুন্দরী যুবতীদেরকে ধরে এনে তাদের যৌন লালসা চরিতার্থ করতো। কোনো যুবতী তাদের প্রস্তাবে রাজী না হলে তার উপর চালানো হতো নির্যাতন। কার্যত জমিদার বা জমিদার সন্তানদের যৌন ক্ষুধা মিটানোর জন্য প্রজাদের যুবতী কন্যাদের বা স্ত্রীদের বাধ্য করা হতো। তারা নারীদেরকে পণ্য মনে করতো। তদের ধারণা করতো তাদের জমিদারীর বৃত্তে বসবাসরত নারীরা হলো তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এটা হলো সামন্তবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ। ‘জমিদার দর্পণ’ নাটকে হায়ওয়ান আলীর কার্যকলাপে যে সেই সামন্ত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে।

হায়ওয়ান আলী তার সমস্ত কার্যকলাপ খুবই চাতুর্য ও ধূর্ততার সঙ্গে করতো। এসব অনৈতিক কাজের জন্য তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা বা পাপবোধের সৃষ্টি হতো না। তার চরিত্রের অধঃপতন এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, সে ন্যূনতম মানবিক বোধশক্তি হরিয়ে ফেলেছিল। সে কারণে দেখা যায়, তার পাশবিক অত্যাচারে আবু মোল্লার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নূরুন্নাহার মৃত্যুবরণ করলে সে মূঢ় হয়নি। বরং সে এঘটনা ধামাচাপ দেয়ার জন্য নানান কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। কার্যসিদ্ধির সে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গকে অর্থ দিয়ে বশে রেখেছিল। নূরুন্নাহারের মৃত্যুর ঘটনা সে এভাবেই চাপা দেয় বা মামলা থেকে বেকসুর খালাস পায়। কারণ অর্থ বলে কথা।

হায়ওয়ান আলীর অত্যাচারে প্রজাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। আবু মোল্লার সাথে তার আচরণ তারই বহিঃপ্রকশ। আবু মোল্লাকে ধরে আনার পর হায়ওয়ান আলীর উক্তি- তুই জানিস আমি তোর সব কর্ত্তে পারি। তোর ভিটা তোর ভিটায় ঘুঘু চরাতে পারি।......তুই ভেবেছিস কি? আমি তোকে মোজা কর্ব্বই কোর্ব্বো। .....হারামজাদা। আমি তোর ঘর বেচবো। তুই যেখান থেকে পারিস টাকা এনে দে। (সর্দ্দারগণের প্রতি) আরে তোরা এখনও ওর মাথায় ইট দিলিনি।” (প্রথম অঙ্ক: তৃতীয় গর্ভাঙ্ক)

শুধু হায়ওয়ান আলীর চরিত্রই প্রস্ফুটিত হয়নি। পাশর্^ চরিত্র হিসেবে উকিল, ডাক্তার, স্থানীয় আদালত প্রভৃতির প্রতিচিত্রও প্রস্ফুটিত। আবু মোল্লার স্ত্রী নূরুন্নাহার হত্যামামলা আদালতে শুরু হলে হায়ওয়ান সম্পর্কে উকিল সাফাই গেয়ে বলছে-” তিনি অতি ধনবান, বিশেষত বিচক্ষণ, ধর্মপরায়ণ, বয়স এ পর্যন্ত ৪০ বৎসর হয় নাই। তারা দ্বারা এমন কাজ হওয়া কখনই সম্ভব হয়না। কেবল মনোবাদ সাধন জন্য এই মিথ্যা নালিশ উপস্থিত হয়েছে। কোন সাক্ষীতেই এমন স্পষ্ট প্রমাণ দেয় নাই, যে আমার মক্কেল নূরুন্নাহার আওরতকে জবরান বলৎকার করেছেন; আর সেই বলৎকারে তার প্রাণ বিয়োগ হয়েছে। ফরিয়াদী আবু মোল্লাহ বড় ফেরেরবাজ।” (তৃতীয় অঙ্ক: দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক)   (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ