বুধবার ২৮ জুলাই ২০২১
Online Edition

ফররুখ কাব্যে আধুনিকতা

মুহম্মদ মতিউর রহমান:

প্রকৃত মহৎ কবির ভাব-অনুরাগ, স্বপ্ন-কল্পনার মধ্যে সর্বজনীন মানবিকবোধ, দেশপ্রেম, নিসর্গপ্রীতি, মা-মাতৃভাষা-মাতৃভূমিপ্রীতি, স্বীয় ঐতিহ্যবোধ, ইতিহাস-চেতনা, সর্বোপরি উদার মানবিক চেতনার সমন্বয় ঘটে। আর এসব কিছুর সাথে আবেগের সম্পর্ক বিদ্যমান। কবির আবেগ যখন এর কোন একটি বা একাধিক বিষয় ধারণ করে সৃষ্টিকর্মে অগ্রসর হয়, তখন তাঁর সৃষ্টিকর্ম ব্যক্তিগত হয়েও সর্বজনীন, কালিক হয়েও কালজয়ী রূপ পরিগ্রহ করে। কবির সৃষ্টিকর্মের মধ্যে তখন নৈর্ব্যক্তিকতা, সামষ্টিক চেতনা ও সর্বজনীন, বিশ্বজনীন উদার ভাবের প্রকাশ ঘটে। ফলে তাঁর কাব্যকৃতি হয়ে ওঠে এক মহৎ শিল্পকর্ম যা সর্বজনীন ও সর্বকালীন মানব-মনে গভীর অনুরাগ সৃষ্টি করে।  

ফররুখ আহমদের কাব্যকর্মে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়। ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার চেতনা, দেশপ্রেম ও স্বাজাত্যবোধে উদ্ধুদ্ধ হয়ে ফররুখ আহমদ ঐসময় অধঃপতিত বাঙালি মুসলিম পুনর্জাগরণের চেতনা ধারণ করে কাব্যচর্চায় ব্রতী হন। একারণে তাঁর লেখায় সাধারণ মানুষের স্বপ্ন-কল্পনা, আশা-আকাক্সক্ষার বলিষ্ঠ রূপায়ণ ঘটে। ফলে তিনি অতি সহজেই জননন্দিত, অসামান্য সম্ভাবনাময় এক উজ্জ্বল কবি প্রতিভা হিসাবে চিহ্নিত হন। তাঁর কবিতা পড়ে নিপীড়িত, নির্যাতিত, পরাধীন মানুষের মনে জাগরণের উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তি ও এক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে সাধারণ মানুষ সকল ভয়-ভীতি-শঙ্কা উপেক্ষা করে আন্দোলন-সংগ্রামে অকুতোভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এভাবে কোন কবি বা শিল্পীর সৃষ্টিকর্মের দ্বারা যখন জনমনে ব্যাপক সাড়া জাগে ও গভীর অনুপ্রেরণার সঞ্চার ঘটে, তখন সে কবি বা শিল্পীকে সহজেই জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া চলে।

ফররুখ আহমদের অসাধারণ সৃষ্টিকর্ম সমকালে জাতির মনে এ ধরনের অনুপ্রেরণা সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। জাতিকে তিনি তাঁর বলিষ্ঠ লেখনির দ্বারা উদ্ধুদ্ধ-অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হন। সমকালীন অন্যান্য কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরাও ঐসময় দেশাত্ববোধে উদ্ধুদ্ধ হয়ে জাতীয় জাগরণমূলক সাহিত্য রচনা করেন। এঁদের মধ্যে কবি বেনজির আহমদ, সুফিয়া কামাল, আব্দুল কাদির, বন্দে আলী মিঞা, কাজী কাদের নেওয়াজ, রওশন ইজদানী, তালিম হোসেন প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে উজ্জ্বল সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী এবং আমাদের সাহিত্য-জগতে তাঁদের প্রত্যেকের অবদান স্বমহিমায় পরিকীর্তিত। এঁদের বিশিষ্ট অবদানের কথা স্মরণে রেখেও একথা নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, সমকালে অন্যান্য সকলের সৃষ্টিকর্ম থেকে ফররুখের সৃষ্টি বহুলাংশে স্বতন্ত্র,  অনবদ্য ও সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কারণ ফররুখের দেশাত্মবোধের সাথে তাঁর স্বকীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের নিগূঢ় সম্পর্ক তাঁর কাব্যিক ভাবধারাকে গভীরতর অভিব্যঞ্জনা দান করে ও তাঁর প্রকাশকে সচ্ছল ও প্রাণবন্ত করে তোলে। একারণে সমকালিন সমাজ-মানসে তা গভীরভাবে সাড়া জাগায়,সাধারণ মানুষের  চৈতন্যবোধকে জাগ্রত করে ও জাতির জীবনে নবজাগরণের প্রেরণা সৃষ্টি করে।  ফররুখের কাব্যকর্মে একদিকে যেমন দেশাত্মবোধ, ঐতিহ্যপ্রীতি ও গণমানুষের আশা-আকাঙক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে, তেমনি তাঁর সৃষ্টিকর্মে এক অসাধারণ শৈল্পিক-নৈপুণ্য ও সর্বজনীন আবেদন সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সর্বোপরি, তাঁর স্বকীয় কবি-ভাষা তাঁর সমগ্র কাব্যকর্মকে এক মহত্তম দীপ্তি দান করেছে। এটা তাঁর কবি-প্রতিভার এক অসামান্য বৈশিষ্ট্য ও সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য দিক। 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার ব্যাপারে যে গণআন্দোলন সৃষ্টি হয়, সেক্ষেত্রেও ফররুখ আহমদ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তখন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় গদ্যে ও পদ্যে তিনি মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলে ধরেন। ভাষার উপর একের পর এক গান, কবিতা, ছড়া এবং বাংলা ভাষার বিরোধিতাকারীদের উদ্দেশ্যে ব্যঙ্গ কবিতা রচনা করেন। এরদ্বারা তাঁর মাতৃভাষাপ্রীতির অকৃত্রিম পরিচয় পাওয়া যায়। এসময় বাংলা ভাষার পক্ষে তাঁর মত দ্বিধাহীন অসংকোচ, সাহসী কলম লেখকের সংখ্যা খুব বেশী লক্ষ্য করা যায় না। 

ফররুখ আহমদ তাঁর স্বকীয় আদর্শ ও বিশ্বাসে স্থিতধী থেকে স্বকীয় ঐতিহ্য ধারণ করে মানবিক সংবেদনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কাব্যচর্চায় ব্রতী হন। তাই তাঁর কাব্যে স্বকীয় ধর্ম, সংস্কৃতি, জীবনধারা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ইত্যাদির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত রূপ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরাধীন যুগে আধিপত্যবাদী শাসক-শোষক শ্রেণীর শোষণ-নির্যাতন সহ্য করেও উপমহাদেশের মুসলিমগণ কখনও নিজেদের স্বকীয়তা বিসর্জন দেয়নি। তারা তাদের  ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি নিজস্ব জীবনযাপন পদ্ধতি সর্বদা বজায় রেখে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রেখেছে, স্বকীয় ইতিহাস ঐতিহ্য, ভাষা ও জীবনচেতনার লালন ও বিকাশ অক্ষুণœ রেখেছে। এ সুস্পষ্ট স্বাতন্ত্র্যিক চেতনাই কালক্রমে এক বলিষ্ঠ স্বতন্ত্র জাতিসত্তার রূপ পরিগ্রহ করে। একারণে উপমহাদেশে মুসলিমদের মধ্যে স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা দিন দিন প্রবলতর হয়ে ওঠে। শত বাধা-বিপত্তি-হত্যা-নির্যাতন-দাঙ্গা এবং প্রতিপত্তিশালী ব্রিটিশ সরকার ও প্রতিপক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও দেশ বিভাগ ও স্বতন্ত্র স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করে। উপমহাদেশের  মুসলিমদের এ ঐক্যবদ্ধ দাবি ও আন্দোলনের সপক্ষে ফররুখ আহমদ স্বভাবতই একাত্মতা পোষণ করেন এবং বাঙালি মুসলিমের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সর্বজনীন দাবিকে উচ্চকিত করে তোলেন তাঁর স্বকীয় মহিমময় বলিষ্ঠ কবি-ভাষায়।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের আদর্শ ও মূলনীতি সম্পর্কে যখন নানা তর্ক-বিতর্ক, সংশয় ও দ্বিধা-বিভক্তির সৃষ্টি হয়, তখন তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘সিরাজুম মুনীরা’ কাব্য লিখে জাতিকে অভ্রান্ত লক্ষ্যের সন্ধান দেন। কবির কাজ স্বপ্ন তৈরী করা, জাতির প্রয়োজন ও আশা-আকাক্সক্ষার রূপরেখা তুলে ধরা। এসময় রচিত ফররুখের সব কবিতায় এর বলিষ্ঠ রূপায়ণ ঘটেছে। এরপর পাকিস্তানী শাসক-শোষক, ধনিক-বণিক-আমলা শ্রেণীর মানুষ যখন জনগণের আশা-আকাঙক্ষার বাস্তবায়ন না করে সীমাহীন শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্য, স্বৈরতন্ত্র ইত্যাদি গণবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রাখে, তখন ফররুখ আহমদ তাদের বিরুদ্ধে শাণিত কলম ধারণ করেন। তাঁর এ জাতীয় অধিকাংশ রচনাই ব্যঙ্গ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ও বেনামীতে প্রকাশিত। এসব রচনার মধ্যে ‘রাজ-রাজরা’ নাটক, ‘ঐতিহাসিক অনৈতিহাসিক কাব্য’, ‘অনুস্বর’, ‘বিসর্গ’, ‘হাল্কা লেখা’, ‘তস্বিরনামা’, ‘রসরঙ্গ’, ‘ধোলাইকাব্য’ ইত্যাদি কাব্য-কবিতা রয়েছে। পাকিস্তানী সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানবিক ঔদার্য , মহত্ত্ব ও সাহসিকতার বলিষ্ঠ চেতনা ধারণ করে লেখা এসময়কার কাব্যনাটক ‘নৌফেল ও হাতেম’, মহাকাব্য ‘হাতেম তায়ী’ ও গীতিনাট্য ‘আনারকলি’ ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ফররুখের দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সবসময় তার সকল কাব্যকর্মেই বলিষ্ঠরূপে রূপায়িত হয়েছে। জাতির বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে কখনও তার প্রকাশ অধিকতর প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হয়। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে সংঘটিত পাক-ভারত যুদ্ধের সময় দেশাত্মবোধে উদ্ধুদ্ধ কবির রচনায় আর একবার এধরনের প্রবল, জোরালো প্রকাশ প্রত্যক্ষ করা যায়। ঐসময় আক্রান্ত জাতিকে আত্মরক্ষা, স্বতন্ত্র মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষার প্রত্যয়দৃঢ় অঙ্গীকারে উদ্ধুদ্ধ-অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে তিনি অজস্র গান-কবিতা-কথিকা ইত্যাদি রচনা করেন। জাতির সমূহ দুর্যোগ মুহূর্তে ও চরম ক্রান্তিলগ্নে যে কবি গণমনে আস্থার ভাব সৃষ্টি করে আশা-আশ্বাস ও নির্ভরতার দুর্লভ চেতনা জাগ্রত করে তুলতে সক্ষমসে কবিইতো প্রকৃত গণমানুষের কবি, তাঁর প্রতিভা সময় ও ভুগোলের চৌহদ্দি অতিক্রম করে চিরকালিন অবিনশ্বর জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়। তাঁর এ  দেশাত্ববোধের বলিষ্ঠ প্রতিফলন ঘটে ‘মরণবাঁধ ফারাক্কা বাঁধ’ শীর্ষক কালজয়ী কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে। ১৯৭৪ সালে তাঁর মৃত্যুর মাত্র অল্প কয়েকদিন আগে লেখা তাঁর ‘একটি আলেখ্য-১৯৭৪’ শীর্ষক এক অসাধারণ সনেটেও কবির দেশাত্মবোধ ও মানবিক চেতনার অসামান্য প্রকাশ ঘটে। 

তাই কবি ফররুখ আহমদের সমগ্র কাব্যকৃতি ও রচনাবলীর প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তিনি ছিলেন সময়ের সাহসী কণ্ঠস্বর। তাঁর সমগ্র রচনায় যুগ-চেতনা, কাল-সচেতনতা, সমাজ ও জনগণের আশা-আকাঙক্ষা ও স্বপ্ন-কল্পনার বলিষ্ঠ রূপায়ণ ঘটেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে কবির স্বকীয় বিশ্বাস, আদর্শ, দেশপ্রেম, মাতৃভাষাপ্রীতি, মানবিক উদারতা ও মহত্তম কল্যাণ চিন্তা। নিজস্ব স্বতন্ত্র কবি ভাষায়, নিপুণ কলাবিন্যাস ও শৈল্পিক কুশলতায় তাঁর কাব্যের সুরম্য সৌধ রচিত হয়েছে। তাঁর শিল্প-সচেতন মন ক্রমাগত অনুশীলনের মাধ্যমে তাঁর কাব্যকর্মকে উৎকর্ষমন্ডিত ও শিল্প-সৌকর্যময় করে তোলার প্রয়াস পেয়েছে। 

ফররুখ আহমদের কাব্য-ভাষা বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এ বৈশিষ্ট্য মৌলিকত্বের লক্ষণ। তাঁর যেকোন কবিতা পাঠের সাথে সাথেই বলে দেয়া যায় যে, এটা ফররুখের কবিতা। তাঁর এ ভাষার বিশেষ চারিত্র্য লক্ষণ এই যে, এটা আরবি-ফারসি তথা পুঁথির ভাষার আধুনিক পরিশীলিত রূপ। রূপক-উপমা-প্রতীক-রূপকল্প ও বিভিন্ন শব্দালংকার ব্যবহারের দ্বারা তিনি তাঁর কাব্যভাষাকে সুললিত, ছন্দময়, সুরময় ও ব্যঞ্জণাময় করে তুলেছেন। তবে তাঁর ভাষার বৈচিত্র্য অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। তিনি ভাব-বিষয়-পরিবেশ উপযোগী ভাষা ব্যবহারে বিশেষ সচেতন ছিলেন। তাই দেখা যায়, বাংলার শ্যামল নিসর্গ বর্ণনায় তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, উত্তাল তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ সমুদ্র অথবা মরুভূমির দিগন্ত-বিস্তারী ধূসর প্রকৃতির বর্ণনায় তিনি অন্যরকম ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাই তাঁর বর্ণনা ভাব-বিষয়-পরিবেশ উপযোগী করার জন্য তিনি কখনো অধিক মাত্রায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার করেছেন আবার কোথাও শুধু খাঁটি বাংলা শব্দের ব্যবহার উপযোগী বলে মনে করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, তাঁর রচিত ‘সাত সাগরের মাঝি’, ‘আজাদ করো পাকিস্তান’ অথবা ‘সিরাজাম মুনীরা’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে অধিক। অন্যদিকে, ‘হে বন্য স্বপ্নেরা’, ‘মুহূর্তের কবিতা’, ‘কাফেলা’ ইত্যাদি কাব্যে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার নেই বললেই চলে। বিশেষত, তাঁর রচিত একুশটি শিশুতোষ কাব্য-কবিতার ভাষা সম্পূর্ণ আরবি-ফারসি শব্দ বিবর্জিত। ফররুখের ভাষার এ বৈচিত্র্য যথার্থ বড় কবির লক্ষণ। ভাব-বিষয়ের ক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে যে বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়, ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনুরূপ বৈচিত্র্য ফররুখ আহমদকে এক বৈচিত্রপূর্ণ, অনন্য ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কবির মর্যাদা দান করেছে। 

ফররুখ আহমদ কালিক ভাবনাকে ধারণ করে সাহিত্য রচনা করলেও তা চিরন্তন মানবিক আবেদনে পূর্ণ হয়ে ওঠায় তাঁর মধ্যে কালাতীত আবেদন সৃষ্টি হয়েছে। দেশজ পটভূমিতে রচিত তাঁর সাহিত্য কবি-ভাবনার বিশালত্বের কারণে বিশ্বজনীন আবেদন সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে। ফররুখ আহমদের সাহিত্যের ভাব ও বিষয় এক শাশ্বত আদর্শ ও মহত্তম মানবিক চেতনায় লালিত বলে তা চিরকালিন মানুষের হৃদয়-মনকে গভীরভাবে আপ্লুত করে। এ কারণে ফররুখ আহমদ এক কালজয়ী মহান মানবিক ঔদার্যে অভিসিক্ত মহৎ শিল্পীকবি হিসাবে খ্যাতিমান। তাঁর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মূলবান অবদান বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।

বাংলা সাহিত্যে কবি মাইকেল মধূসুদন দত্তকে আধুনিকতার জনক বলা হয়। তাঁর কাব্যে আধুনিকতার যে লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, সেগুলো মোটামুটি এরূপঃ প্রথমত, ভাষা, বর্ণনা, উপমা-অলংকার ও ছন্দ ব্যবহারে অভিনবত্ব। দ্বিতীয়ত, পাশ্চাত্যের আদর্শে সাহিত্যের আধুনিকতম বিভিন্ন প্রকরণ বা রূপরীতির অনুসরণ। তৃতীয়ত, দেশাত্ববোধ ও ঐতিহ্যপ্রীতি। চতুর্থত, ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য, মানবিক মূল্যবোধ ও সংবেদনশীল মনের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। পঞ্চমত, সংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদী চিন্তাধারার প্রকাশ। মধূসুদনের বিভিন্ন কাব্যকর্মে বিশেষত তাঁর মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ ও শতাধিক সনেটে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। 

কাব্যাদর্শের ক্ষেত্রে ফররুখ আহমদ বহুলাংশে মধূসুদনের অনুসারী ছিলেন। আধুনিক ভাষা, বর্ণনা, উপমা-অলংকার ও ছন্দ ব্যবহারে তিনি তাঁর পূর্বসূরীর মতই অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। সাহিত্যের  আধুনিকতম রূপরীতি অনুসরণের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অতিশয় সচেতন ও সফল। দেশাত্মবোধ ও ঐতিহ্যপ্রীতির সাথে স্বকীয় বিশ্বাসের অপূর্ব সমন্বয় ঘটায় ফররুখের ভাব-বিষয় অধিকতর মহিমোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এছাড়া, ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য ও মানবিক মূল্যবোধের উৎকর্ষিক বিকাশ ঘটেছে ফররুখের কাব্যে। সর্বোপরি, স্বাধীনতা-প্রীতি, জাতীয় জাগরণ ও নিপীড়িত-নির্যাতীত-পরাধীন মানুষের মুক্তির আকাংক্ষা ও উদার মানবিক সংবেদনায় পূর্ণ ফররুখের কাব্য-সম্ভার। তাই ফররুখ সমকালীন অন্যান্য আধুনিক কবিদের জন্য যেমন ছিলেন আদর্শ, তেমনি বর্তমানে এমন কি ভবিষ্যতেও তিনি নিঃসন্দেহে অনেকের আদর্শ হয়ে থাকবেন এবং সাধারণ পাঠকের মনে অন্তহীন প্রেরণা যোগাবেন।

* অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান গত ৮ এপ্রিল ২০২১ ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তিকাল করেন। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে রাখুন। ‘ফররুখ কাব্যে আধুনিকতা’ লেখাটি তিনি মৃত্যুর আগেই সংগ্রাম সাহিত্যের মেইলে পাঠিয়েছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ