রবিবার ২৫ জুলাই ২০২১
Online Edition

বাল্যবিয়ে নামক অভিশাপ

 জাফরুল ইসলাম:

বিবাহ মানবজাতির জন্য অতি প্রয়োজনীয়, কারণ মানুষ তার জৈবিক চাহিদা পূরণ করার জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এছাড়াও মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ও বিবাহ অপরিহার্য। এই অপরিহার্য বিষয়টি যখন অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় তখন দেশ ও জাতির জন্য অমঙ্গল বয়ে আনে। বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে বিবাহের ক্ষেত্রে বয়স নির্ধারণমূলক আইন পাস করে। যেখানে বলা হয় বিবাহের ক্ষেত্রে মেয়েদের বয়স ১৮ বছর, এবং ছেলেদের ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়। এই নির্ধারিত বয়সের নিচে যদি কোন বিবাহ সংঘটিত হয় তাহলে সেটা বাল্যবিবাহ হিসেবে পরিগণিত হবে। একজন মানুষের পুরো জীবন কাঠামোকে ভাগ করলে চারটি অংশ পাওয়া যায়। শিশুকাল, কৈশোর, বা বাল্যকাল, যুবক এবং বৃদ্ধকাল। ৬ বা ৭ বছর থেকে শুরু করে ১৮ বছরের আগের সময়টা হল বাল্যকাল। এখন প্রশ্ন হলো বাল্যবিবাহ কিভাবে সংঘটিত হয়, বা কেন সংঘটিত হয়? একটা গবেষণায় বলা হয়েছে বাল্যবিবাহ সংঘটিত হয় অজ্ঞতা এবং কুসংস্কারের কারণে কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় সমাজে যেসব বাল্যবিবাহ হচ্ছে সেগুলোর কারণ হলো, দারিদ্র্য, যৌতুক, এবং চারদিকের প্রেম-ভালোবাসার ছড়াছড়ির। একজন দরিদ্র পিতা তার মেয়েকে নিয়ে চিন্তা করে তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবাহ দিতে হবে। কারণ চারিদিকে যেভাবে ভালোবাসা নামক প্রতারণার ফাঁদ, তাতে করে তার মেয়েটি এই প্রতারণার শিকার হয়ে সমাজে তার অসম্মান ডেকে আনবে। তাই এই অসম্মানের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাড়াতাড়ি বিবাহ দিয়ে দিলেই তার চিন্তার শেষ। যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে ছিল সেখান থেকেও মুক্তি পাবে। ভালবাসা বা প্রেম খারাপ কোন বিষয় নয় যদি তা প্রাপ্তবয়স্কে এবং প্রতারণামূলক না হয়। বাল্যবিবাহ বাংলাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই বিরাজমান। একটা পরিসংখ্যান থেকে বিষয়টা পরিষ্কার হওয়া যাবে, ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহের হার ছিল ৭৪ শতাংশ। ২০১৫ সালে (১৮ বছরের নিচে) ৫২ শতাংশ। ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহের হার (১৫ বছরের নিচে) ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। তার মানে এই বাল্যবিবাহ কিছুটা কমে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায় করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে এই বাল্যবিবাহ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। কারণ এই সময় ছেলেমেয়ে বাড়িতে বসে আছে। যার ফলে অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদেরকে বিবাহ দিয়ে দিচ্ছে। তারা ধরে নিয়েছে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আর খুলবে না, যার ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীরা অকালে ঝরে পড়ছে। এই বাল্যবিবাহের কারণে একজন বালিকা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্তান সম্ভাবা হয়। যার ফলে সন্তান প্রসব করার সময় অকালে মৃত্যুবরণ করে যাকে বলা হয় মাতৃমৃত্যু। এই মৃত্যুকে সাধারণ মৃত্যু মনে না করে আমার মনে হয় হত্যা বললেও বেশি বলা হবে না। কারণ অভিভাবকরাই তো তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এছাড়াও অল্প বয়সে সন্তান জন্ম দেয়ার কারণে বালিকার স্বাস্থ্যের অনেক পরিবর্তন হয়। অতি অল্প বয়সে বুড়ি হয়ে যায় যার ফলে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয় কারণ তার স্বামী অন্য মহিলার প্রতি আকৃষ্ট হয়। বাংলাদেশে যে বর্তমানে প্রতিদিন ৩৭টি বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে তার পরোক্ষ কারণ হিসেবে এ বাল্যবিবাহকে দায়ী করা যায়। যদিও বাংলাদেশ সরকার বাল্যবিবাহ রোধ করার জন্য আইন পাশ করেছে। যেখানে বলা হয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক কেউ বাল্যবিবাহ করলে দুই বছরের কারাদ- ও এক লক্ষ টাকা জরিমানা। অপ্রাপ্তবয়স্ক কেউ বাল্যবিবাহ করলে একমাসের আটকাদেশ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। আর এই বিবাহের সাথে পিতা-মাতার জড়িত থাকলে ৬ থেকে ১ বছরের কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, এবং নিবন্ধকের নিবন্ধন বাতিল। 

এছাড়াও বাংলাদেশ সরকার নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিরোধ করার জন্য ১০৯ নম্বরে কল ও এসএমএস করে অভিযোগ গ্রহণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচের বিবাহের পরিমাণ শূন্য, এবং ১৫-২১ বছরের মধ্য বিবাহের হার এক তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনতে চেষ্টা করছে। ২০৪১ সালের মধ্য বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

 

 

 

এছাড়াও ৬৪টি জেলায় প্রায় ৮ হাজার কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন করা হচ্ছে। যেখানে তথ্য আপা প্রকল্পের মাধ্যমে এক কোটি মহিলাকে তথ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এর পাশাপাশি ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতন করার জন্য দরকার গ্রামে গ্রামে বা মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন সেমিনারের ব্যবস্থা করা। এছাড়াও ইলেকট্রিক মিডিয়া এবং গণমাধ্যমের কুফল ফলাও করে প্রচার করতে হবে। কারণ ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতন না হলে আইনের কোনো বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ