রবিবার ২৫ জুলাই ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

 

সাজজাদ হোসাইন খান

॥ তেতাল্লিশ ॥

শান্তিবাগে ছোটখাটো একটা বাজার। আমাদের বাসার পেছন দিকটায়। সে বাজারে দুখানা মুদি দোকান, একটি রেশন দোকান। বাঁশ বেড়ার দোকান এক পাশে। লম্বা মতো টিনের ঘর। স্কুল বসতো এ ঘরে। নাম শান্তিবাগ প্রাইমারি স্কুল। স্কুলের পেছনে একটি পুকুর। টলটলে পানি। এর পাশ ঘেঁষে রাস্তা। শাজাহানপুর, খিলগাঁও ছুঁই ছুঁই। স্কুলের বিপরীতে একটি টিনের ঘর। লম্বায় আট-দশ হাত হবে। লোকজন বলতো শান্তিবাগ ক্লাব। ঘরের ভিতর একখানা টেবিল দু’চারখান চেয়ার। পাশে একটি আলমারি। বইটই আছে। একখানা দৈনিক প্রত্রিকা টেবিলে। পাড়ার বড়রা আসতো পত্রিকা পড়তো। বইও নিতো কেউ কেউ নাম ঠিকানা লিখে। আমিও দু’একখানা বই ধার নিয়ে পড়েছি। দোকান-স্কুল-ক্লাবের মাঝখানটা ফাঁকা। একটা মাঠ, কাঠা দু’এক হবে হয়তো। মাঠের কিনার কিনার গাছে গাছে ছাওয়া। দিনের অনেক দুপুরই এসব গাছের ডালে ডালে কাটতো। যখন স্কুলের কপাট থাকতো বন্ধ। আর মুদি দোকানের মুড়ালি পকেট ভর্তি। দু’পয়সার মুড়ালিই যথেষ্ট মনে হতো। বন্ধুবান্ধব নিয়ে হৈ চৈ। মাথার তালু বরাবর যখন সূর্য এসে দাঁড়িয়ে যেত, তখনই হুটহাট ভাঙতো আড্ডার মেলা। 

আবার স্কুল, ক্লাস। হৈ হৈ রৈ রৈ সময় উড়ছে বাতাসে। নওয়াব স্টোরের নারকেলি বিস্কুট পকেট ভর্তি। কলোনির দালানগুলোতে রংটং হচ্ছে। মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে সব দেখি। হলুদ হলুদ রং। হলুদ কেন? আরো কত সুন্দর সুন্দর রং আছে। এ লোকগুলো বোকা নাকি। রেজাউল বললো ওদের পছন্দের ঘরে আগুন লেগেছে। লাল নীল সবুজ রেখে বেটারা পছন্দ করেছে হলুদ! তৌফিক জানালো আরে ওদের কি দোষ। ওরাতো রঙমিস্ত্রি। ওদের কাজ শুধু রঙ লাগানো। পছন্দ অপছন্দ নিয়ে মিস্ত্রিদের কোনো মাথাব্যথা নাই। আসল হলো দালানের মালিক। ওদের কোনো পছন্দ  নেই। ওরা ভেবেছে হলুদ খুব চমৎকার রঙ। বুরবুক বুদ্ধ আর ককে বলা যায়। ঘণ্টার শব্দ কানে আসতেই দৌড়, ক্লাসে। ঘণ্টা বাজলে কামরায় ঢোকো। আবার ঘণ্টা দিলে বাইরে আসো। ঘণ্টার সাথেই যেনো ক্লাসের জীবন। দফরির হাতেই শুরু, দফতরির হাতেই শেষ। স্কুল-ক্লাসের। তাহলে কি দফতরিই হর্তা-কর্তা। এমন ভাবনা মগজে টোকা দেয়। মাঝেমধ্যে।

সূর্য যখন কাহিল কাহিল হয়ে আসে তখনই ঘরে ফেরা। প্রায় হররোজ এই রুটিন। কেবল বিষ্যুদবার বাদে। আধবেলা ক্লাস। শুক্রবারতো এমনিতে বন্ধ। দু’তিন বাড়ি টপকাতেই মাঠ। মাঠ অর্থ খালি জায়গা। এখনো বাড়ি-ঘর  তোলেনি কেউ। দুটি কাঁঠালগাছ মাঝ বরবার, কিনার ঘেঁষে। এই কাঁঠালগাছের ডালে ডালে লাফালাফি হয়। বন্ধুবান্ধব মিলে। দুপুর, কোনো কোনো দিন সকালেও। খেলাটা জমে উঠতো সূর্য যখন নামতো পশ্চিমে। লাল হলুদে ছাওয়া আসমান। একটা অন্যরকম সুন্দর আটকে যেতো চোখে। খেলাও চলতো সমান তালে। শান্তিবাগের মাঠটি ছিলো পুব-পশ্চিমে লম্বালম্বি। আসলে এটি কোনো মাঠ নয়। পতিত জমি। বাড়িঘর তুলেনি কেউ। এই সুযোগে খেলা দৌড়ঝাঁপ। মাঠের তিন ভাগ। এই ভাগও চোখের আন্দাজে। পুব মাথায় ছোটরা অর্থাৎ আমরা। মধ্যভাগে হাইস্কুলে পড়–য়াদের। পশ্চিম ভাগে খেলতো বড়রা। অর্থাৎ কলেজ পড়–য়াদের। প্রতি বিকালই জমজমাট থাকতো তামাম মাঠ। শীত মওসুমে মধ্যমাঠে চলতো ভলিবল আর ব্যাডমিন্টন। আমরা ক্রিকেট-ট্রিকেট খেলতাম। ফেরদৌস আর প্যারট দুই ভাই। দুই ভাইই ভালো খেলতো! কি ফুটবল কি ক্রিকেট। প্যারট আমার সমবয়সী। তার সাথে গলায় গলায় ভাব। মাঝেমধ্যে ওদের বাড়িতে যেতাম। শান্তিবাগ স্কুলের পাশ দিয়ে একটু গেলেই বাম পাশে তাদের বাড়ি। খুব সুন্দর। পরিপাটি। একপাশে বাগান। আড্ডা ফাড্ডা চলতো। প্যারটের আব্বা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। তাদের বাড়ির সরাফতিটা ছিলো অন্যরকম। চলতে ফিরতে পথিকের নজর আটকে যেতো। প্যারট ফুটবলও ভালো খেলতো। ক্রিকেটেও। 

ফেরদৌসও মন্দ খেলতো না। বিশেষ করে ফুটবল। দুই ভাইই সমানে সমান। প্রায় সময়ই আমরা ম্যাচ খেলতাম। এপাড়া ওপাড়ায়। একবার খিলগাঁও না বাসাবোর সাথে শান্তিবাগের খেলা। আমাদের বিপক্ষ দল খুবই কড়া। ওদের সাথে কেউই পেরে উঠতো না। বিশেষ করে ওদের গোলকিপার। খুবই সরস। ঈগল যেমন শিকার ধরে মাঝআকাশে, গোলকিপারও যেন সেই চিল। উড়ন্ত ঈগল। বল জালে লাগানো এক প্রকার অসম্ভব। গোলকিপারের দুর্দান্ত খেলার কারণে চ্যাম্পিয়ন হলো ওরাই। তাদের ক্লাবের নাম শুকতারা ক্লাব। আর আমরা যে মাঠটিতে খেলতাম সে মাঠের এলাকাটির নাম ছিলো মদন বাবুর বাগিচা। বিশাল জমি জুড়ে শুধু আমগাছ। এর কিছুটা অংশ পড়েছে শাহজানপুর এলাকায়। মদন বাবুর বাড়িঘর যে কোথায় কে জানে! জমিদার টমিদার হবে হয়তো। পরে এই বাগিচায়ই গড়ে উঠেছে রেল কলোনি।   

(চলবে)

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ