বুধবার ২৮ জুলাই ২০২১
Online Edition

উত্থানপতন

শাফায়েত হোসেন রুবেল:

রূপবতী তরুণীর চেম্বারে প্রবেশের পর প্রথম দেখাতেই ডাক্তার সাহেব তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়লেন। যথাসম্ভব নিজেকে সামলে তিনি বললেন, 

হ্যাঁ কী সমস্যা আপনার বলুন।

-কই? আমার তো কোনো সমস্যা নেই!

তরুণীর উত্তর শুনে দুর্বলতার বশে ডাক্তার সাহেব একটু বেশিই ভেবে বসলেন। তাঁর মনে সন্দেহ জাগলো- মেয়েটি বোধহয় প্রপোজ করতে এসেছে। নয়তো অনর্থক চেম্বারে আসবে কেন? তাঁর চোখেমুখে একটা আশার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠলো। হার্টবিটও কিছুটা বেড়ে গেল। তরুণীর চোখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে নিজেকে যথাসম্ভব সামলে মৃদু হেসে বললেন, 

ও আচ্ছা। তাহলে চা দিতে বলি?”

- চা দিতে বলি মানে? আমি কি এখানে চা খেতে এসেছি?

 ব্যাপারটা।

-আগে কথা দিন কাউকে বলবেন না প্লিজ।

ডাক্তার সাহেবের আশা আরও এক ধাপ উপরে উঠলো। 

আপনি একদম নিশ্চিন্ত থাকবেন। আমি কাউকেই বলব না। নিঃসংকোচে বলে ফেলুন।

-আমার বেবিটার তিনদিন ধরে জ্বর আর সর্দি। বিছানা থেকেই উঠতে পারছে না। তাই অগত্যা ওকে ছাড়াই আসতে হলো। প্লিজ এমন প্রেসক্রিপশন দিন যাতে ও দুদিনেই সেরে ওঠে।

ডাক্তার সাহেবের আশা এবার এক ধাক্কায় বিধ্বস্ত বিমানের মতো আকাশের ট্রপোম-ল থেকে নিমিষেই ভূমিতে এসে পড়লো। আশায় বেলুনের মতো ফুলে ওঠা তাঁর বুকে কেউ যেন আলপিন ফোঁটালো। নিজেকে যথাসাধ্য সামলে আশাহত মুখে তিনি বললেন, তা আপনার বেবির বয়স কতো?”-”তেইশ বছর।

ডাক্তার সাহেব ভাবলেন - নির্ঘাত বয়ফ্রেন্ড হবে! তরুণীর বয়ফ্রেন্ডের প্রতি ডাক্তার সাহেবের হিংসা হতে লাগলো। তবে তাঁর আশার প্রদীপও কিছুটা জ্বলে উঠলো। তরুণীর রিলেশনটা একবার ব্রেক-আপ হলেই প্রপোজ করার সুযোগ আছে। 

ডাক্তার সাহেব পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলেন, আপনার বয়ফ্রেন্ড?

-”বয়ফ্রেন্ড হতে যাবে কেন? ও আমার বেস্টফ্রেন্ড। পুরোনাম শারমিন আক্তার বেবি। আর আমার বয়ফ্রেন্ডও নেই।

ডাক্তার সাহেবের আশার প্রদীপের তেজ কিছুটা বেড়ে গেল। মনে মনে ভাবলেন- যাক, লাইন ক্লিয়ার আছে। প্রপোজটা করতে আর কোনো বাধা নাই। 

হঠাৎ-ই তাঁর মনে পড়লো বিয়ের কথাটা তো শোনা হলো না।

মাইন্ড না করলে একটা কথা বলি?

-কথাটা না শুনে কিভাবে বলব মাইন্ড করবো কিনা? আগে বলুন।

ডাক্তার সাহেব কিছুটা সংকোচে বললেন,

বিয়ে করেছেন?

-হ্যাঁ বিয়ে হয়েছে তিন বছর হলো। স্বামী কুয়েতে থাকে।

ডাক্তার সাহেবের আশার প্রদীপ দপ করে নিভে গেল। আশাহত হয়ে তিনি কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।

তরুণী বললো, -কিছু ভাবছেন?

না, তেমন কিছু না। ভাবছি এমন সুন্দরী স্ত্রী রেখে ভদ্রলোক কুয়েতে থাকেন কিভাবে!

-কই? বেবি তো তেমন সুন্দরী না।

ডাক্তার সাহেবের আশা আবার কিছুটা বল ফিরে পেল। তিনি বিস্মিত গলায় বললেন,

তারমানে আপনি বেবির স্বামীর কথা বলছেন! আমি তো জিজ্ঞেস করলাম আপনার বিয়ের কথা। আপনি কি বিয়ে করেছেন?

-হ্যাঁ, আমিও করেছি। বিয়েটা করেই তো পাগল হলাম।

ডাক্তার সাহেবের শেষ আশাটুকুও এবার মাটি হয়ে গেল। আশাহত মুখে তিনি বললেন,

পাগল হয়েছেন মানে? আপনারা দাম্পত্য জীবনে একে অপরকে খুব ভালোবাসেন না?” 

-তা আর কপালে জুটলো কই? বিয়ের পরের দিনই তো উনি রোড-এক্সিডেন্টে মারা গেলেন। ওনার শোকেই তো আমি এখন পাগল।

ডাক্তার সাহেবের আশা আবার জেগে উঠলো। অতি-উৎসাহে মুখ ফসকে আস্তে বের হয়ে গেল,

যাক, ভালোই হয়েছে।

- কী? কিছু বললেন?

না। মানে বলছিলাম ওভাবে একদম বলবেন না। কোনো কিছুতেই এভাবে ভেঙে পড়া ঠিক না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। তিনি চাইলে আপনার স্বামীর শূন্যতা পূরণের জন্য আপনার জীবনে নতুন কাউকে পাঠাতে পারেন। তাই ধৈর্য ধরুন।

ইতোমধ্যে চল্লিশ বছরের মতো বয়স্ক একজন ভদ্রলোক বেশ তাড়াহুড়ো করে চেম্বারে ঢুকতে ঢুকতে বিস্মিত গলায় বললেন,

আরে বাতাসি না? এখানে কী করছিস বাতাস্তি তুই এখানে আর তোকে খুঁজতে খুঁজতে আমরা হয়রান।

তারপর ভদ্রলোক ডাক্তারের দিক তাকিয়ে বললেন, আসলে আমি ওর মামা। ওর স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই ও মানসিক ভারসাম্যহীন। তিন ঘণ্টার মতো হলো ও মেন্টাল হসপিটাল থেকে পালিয়ে এসেছে। ওর পরিবারের সবাই ওকে খোঁজার জন্য দৌড়ের উপর আছে। ভাগ্যিস আমার জ্বরটা দেখাতে আপনার কাছে এসেছিলাম! ও হয়তো এতোক্ষণ আপনাকে অনেক বিরক্ত করেছে। সেজন্য আমি ওর হয়ে ক্ষমা চাচ্ছি।

ভদ্রলোক বাতাসির মাকে ফোন করে জানিয়ে দিলেন যে তাকে পাওয়া গেছে।

এদিকে ডাক্তার সাহেবের আশার ক্রমাগত উত্থানপতনের ফলে তাঁর মাথায় ইতোমধ্যে ঘুরপাক শুরু হয়েছে।  কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তার সাহেব অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। মাথায় পানি ঢালার পর তাঁর জ্ঞান ফিরে এলো ঠিকই, কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর দেখা গেল তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে গেছেন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ