রবিবার ২৫ জুলাই ২০২১
Online Edition

এটি খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত, আমরা বিশ্বাস করি এটি সরকার গঠনের সুবর্ণ সুযোগ

ভূমিকা ও অনুবাদ : আহমদ মতিউর রহমান

ইসরাইলে নেতানিয়াহু যুগের অবসান হতে যাচ্ছে আর নতুন একটি জোটের ক্ষমতা গ্রহণে কিংমেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন একটি আরব দলের নেতা মনসুর আব্বাস। একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ইসরাইলে অধিকার বঞ্চিত আরব নাগরিকদের অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আমরা আশাবাদী। তিনি বলেন, “যৌথ সরকার গঠনের এই চুক্তির মধ্যদিয়ে লাভবান হবে আরবরা। বিশেষ করে নেগেভ অঞ্চলের বাসিন্দারা। এখানে তাদের জন্য বড় বাজেটও বরাদ্দ হবে। প্রথমবারের মতো ইসরাইল সরকার গঠনে কোনো আরব দল যুক্ত হতে যাচ্ছে, ফলে এটি খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। এ নিয়ে অনেক বিতর্কও হয়েছে। তবে আমরা বিশ্বাস করি যে, সরকার গঠনের জন্য এটি সুবর্ণ সুযোগ।” গত ২ জুন ইসরাইলী বিরোধী দলীয় বিশিষ্ট নেতা ইয়াইর ল্যাপিড ও নাফতালি বেনেটের সাথে আলোচনার পর আব্বাস নেতানিয়াহুবিহীন একটি সরকার গঠনে তার সমর্থনের কথা জানান। পরে এ বিষয়ে চুক্তি হয়। 

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ১২ বছর ধরে। তিনি দেশটির দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তার প্রতি জনরোষ ক্রমবর্ধমান। দুই বছরে চারটি নির্বাচন হয়েছে এই ইহুদী রাষ্ট্রটিতে। এটাই প্রমাণ করে দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলছে। গত ২৩ মার্চ সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছে কিন্তু তিনি প্রেসিডেন্ট কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়েও সরকার গঠনে ব্যর্থ হন। কারণ তাকে অনেক দলই আর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চায়না। তার লিকুদ পার্টি ১২০ আসনের পার্লামেন্টে ৩০ আসন পেয়ে এককভাবে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও সরকার গঠনের ম্যাজিক ফিগার ৬১ জন এমপির সমর্থন তিনি যোগাড়ে ব্যর্থ হন। প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ১৭ আসনে জয়ী ইয়াশ আতিদ দলের নেতা ইয়াইর ল্যাপিড সাফল্য অর্জন করেছেন। ৮টি দল মিলে নতুন একটি জোট সরকার গঠনে সক্ষম বলে দাবিদার তিনি, আর তার দাবি অনুসারে সরকার গঠন করে পার্লামেন্টে দ্রুত আস্থা ভোটে তা প্রমাণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট রিভলিন। আগামী রোববার সেই আস্থা ভোট হওয়ার কথা। আগেই বলেছি, নতুন জোট গঠনে কিংমেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন ইউনাইটেড আরব লিস্ট নামে পরিচিত মুসলমান এমপিদের একটি দলের নেতা মনসুর আব্বাস। হিব্রু ভাষায় যাদের দলের পুরো নাম ‘রেশিমা আরাভি এমেউলেদেত। সংক্ষেপে রাম। দলটির নেসেটে রয়েছে মাত্র ৪টি আসন। তাদের সমর্থনের অভাবে আগাতে পারছিল না ল্যাপিডের জোট। ম্যারাথন আলোচনার পর মনসুর নতুন জোটকে বাইরে থেকে সরকার গঠনে সমর্থন দানে সম্মত হন। জোটের দ্বিতীয় প্রধান নেতা ইয়ামিনা দলের নাফতালি বেনেট চুক্তি মতে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হবেন। পার্লামেন্টে তার দলের আসন সংখ্যা মাত্র ৭টি। এরপর পর ২০২৩ সালে ২৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী হবেন ল্যাপিড। ইয়াশ আটিড নেতা ইয়ার ল্যাপিড ও ইয়ামিনা দলের নেতা নাফতালি বেনেট দুই মেরুর রাজনীতিবিদ। ল্যাপিড মধ্যপন্থী হলেও কিছুটা বাম ঘরানার রাজনীতিবিদ। বেনেট কট্টর ডানপন্থী। নেতানিয়াহুর সরকার পতনের লক্ষ্যে তারা জোট গড়েছেন। ডান, বাম, মধ্যডান, চরমপন্থী ও ইসলামী দলের সমন্বয়ে যে সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাষ্যকাররা অনেকটাই সন্দিহান। তবে দুর্নীতি মামলায় বিচারাধীন নেতানিয়াহুর বিদায় সবাই চায় এটা বোঝা যাচ্ছে। হামাসের সঙ্গে ১১ দিনের যুদ্ধ বাঁধিয়েও মনে হয় তার শেষ রক্ষা হবে না। যদিও তিনিও নতুন জোটকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য কলকাঠি নাড়ছেন। চ্যানেল ১২ ও তুর্কী সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সেীকে দেয়া সাক্ষাৎকারে মনসুর আব্বাস বলেছেন, তার দল নতুন সরকার গঠনে বামপন্থী ও ডানপন্থী সকল দলের সাথে খোলামেলা আলোচনা করে অবশেষে লিখিত চুক্তিতে উপনীত হয়েছে।

ইসরাইলী আরবদের ইসলামপন্থী সংগঠন ইসলামিক মুভমেন্টের রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রাম ১৯৯৬ সালে গঠিত হয়। নির্বাচনে যোগদান নিয়ে মতভেদের কারণে ইসলামিক মুভমেন্ট বিভক্ত হয়ে পড়ে। তার নেতৃত্বাধীন অংশ নির্বাচনের পক্ষে ছিল। ওই সময় থেকে নিয়মিতই দলটি ইসরাইলী নেসেটে আসন পেয়ে আসছে। ২০২০ সালে দলটি আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সংযুক্ত জোট জয়েন্ট লিস্টের সাথে থাকলেও এই বছর নির্বাচনে জোট থেকে বেরিয়ে আলাদাভাবে নির্বাচন করে। নতুন জোট গঠনে সমঝোতা চুক্তিতে শেষ সময়ে যোগ দেয় ইউনাইটেড আরব লিস্ট। আগেই বলেছি এই প্রথম ইসরাইলের ক্ষমতাকেন্দ্রীক কোন জোটে দলটি যুক্ত হলো। মনসুর আব্বাসের জন্ম ১৯৭৪ সালে মাগহার শহরে। ১৭ বছর বয়সে তিনি সেখানে মসজিদে ইমামতি করেছেন, খুতবা দিয়েছেন। তিনি জেরুসালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল অনুষদ থেকে ডেন্টিস্ট ডিগ্রি নিয়েছেন। তিনি সেখানে ইসলামিক মুভমেন্ট নেতা আবদুল্লাহ নিমার দারবিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন। পরে তিনি হাইফা বিশ^বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেন। ২০০৭ সালে তিনি ইউনাইটেড আরব লিস্টের সেক্রেটারি জেনারেল হন এবং ২০১০ সালে ইসলামিক মুভমেন্টে দক্ষিণাঞ্চল শাখার ডেপুটি চেয়ারম্যান হন। ২০১৯ এর নির্বাচনে ইউনাইটেড আরব লিস্ট ও বালাদ দল মিলে জয়েন্ট লিস্ট নামে নির্বাচন করে, তিনিসহ জয়েন্ট লিস্টের ৪ জন জয়ী হন। এরপরেও কয়েক দফা নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন। এখানে তার সাক্ষাৎকারের বিবরণ তুলে ধরা হলো- 

প্রশ্ন : কিভাবে আপনারা সরকার গঠনের আলোচনায় যুক্ত হলেন। 

উত্তর : দেখুন মাত্র দু বছরের মধ্যে দেশে চারটি নির্বাচন হয়েছে। অতীতের সরকারগুলো টেকেনি। আমরা সংকট সমাধানে ডান ও বামপন্থী সব দলের সাথে আলোচনার দরজা উন্মুক্ত করে দিয়েছিলাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল একটি নতুন সরকার গঠনের জন্য কাজ করা।

প্রশ্ন : কোন কোন দলের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে?

উত্তর : আমাদের অপশন ছিল ওপেন। আমরা বাম ডান সবার সাথেই কথা বলেছি। 

প্রশ্ন : আপনারা কোন অবস্থান থেকে নতুন জোটকে সরকার গঠনে সমর্থন দিতে সম্মত হলেন?

উত্তর : সকল আরব নাগরিকের অবস্থার উন্নয়ন ও তাদের প্রতি অন্যায়ের অবসান এবং আরবদেরকে মার্জিনালাইজড করা ও সকল কিছুর বাইরে ঠেলে দেয়ার ধারণার অবসান, এসবের বিনিময়ে আমরা প্রধানমন্ত্রী পদে একজন প্রার্থীকে সমর্থন দানে সম্মত হই। 

প্রশ্ন : কিভাবে সমর্থন দিলেন? আপনারা তো কোন দিকেই ছিলেন না।

উত্তর : এটা ঠিক, সরকার গঠনের দাবিদার দুটি পক্ষের কাছ থেকেই আমরা সমদূরত্ব বজায় রেখে চলছিলাম। কোন জোটকে সমর্থন দেবো এ বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। 

প্রশ্ন : শেষে কি হলো?

উত্তর : ওই যে বললাম, আবর কমিউনিটির উপর সহিংসতা ও কৃত অপরাধমূলক তৎপরতার অবসান ঘটাতে হবে, আরবদের বাড়ি ঘর ধ্বংস করা যাবে না, এসব দাবির বিনিময়ে সরকার গঠনে সমর্থন দিতে রাজি হই। আরেকটা বিষয় ছিল আর সেটা হলো নেগেভে আমাদের লোকদের বিষয়টি, সেখানে এক লাখের মতো লোক বাস করে যদিও সেখানে কোন উন্নয়ন নেই, এলাকাটির প্রতি কোন স্বীকৃতিও কার্যত নেই। আমরা আরব সমাজের কল্যাণে কিছু জিনিস চেয়েছি, আমাদের সঙ্গে কারো বিরোধ নেই আর আমরা কর্তৃত্ব করতেও চাইনা। 

প্রশ্ন : মিস্টার ল্যাপিডের সঙ্গে কি আলোচনা হয়েছে?

উত্তর : এই আলোচনায় আমরা আমাদের আরব নাগরিকদের দাবিগুলো তুলে ধরেছি। আর তা হলো এরা চায় বাসস্থান সমস্যার সমাধান, নেগেভের কোন স্বীকৃতি নেই, আমরা এই এলাকার মিউনিসিপ্যাল এরিয়ার স্ট্যাটাস চেয়েছি। আমরা বলেছি এ বিষয়ে আমরা কোন ছাড় দেবনা আর আমাদের দাবি সবারই জানা, এটার সমাধানও কঠিন নয়। 

প্রশ্ন : ইসরাইলী গণমাধ্যম কেএনকে কি বলেছিলেন?

উত্তর : ইসরাইলী পাবলিক ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনে (কেএন) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আমি বলেছি যৌথ সরকার গঠনের এই চুক্তির মধ্যদিয়ে লাভবান হবে আরবরা। বিশেষ করে নেগেভ অঞ্চলের বাসিন্দারা। এখানে তাদের জন্য বড় বাজেটও বরাদ্দ হবে। প্রথমবারের মতো ইসরাইল সরকারে কোনো আরব দল যুক্ত হতে যাচ্ছে, ফলে এটি খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। এ নিয়ে অনেক বিতর্কও হয়েছে। তবে আমরা বিশ্বাস করি যে, সরকার গঠনের জন্য এটি সুবর্ণ সুযোগ।

প্রশ্ন : নির্বাচন করা প্রশ্নে ইসলামিক মুভমেন্ট ভেঙে যায়। এর উত্তরাঞ্চল নেতা রায়েদ সালাহ নির্বাচন করতে অস্বীকার করেন। আপনারা নির্বাচনে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন কিভাবে?

উত্তর : অন্য আরব নেতাদের মতো আমি মনে করি না যে প্রধান প্রধান ইসরাইলী দলগুলোর সাথে আলোচনাও করা যাবে না। বরং আমি মনে করেছি আলোচনার বিনিময়ে যদি আরব সম্প্রদায় যেসব সমস্যা মোকাবেলা করছে তার সমাধান করা যায়, তাহলে আমি আলোচনায় রাজি। 

আমাদের প্রধান প্রধান দাবি বা নাগরিক অধিকারগুলো আমাদের রেড লাইন, এগুলোর ব্যাপারে কোন আপোসের সুযোগ নেই, আর আমরা এগুলো সব হয়তো আদায় বা অর্জন করতে পারবো না, কিন্তু তাই বলে এগুলো আমরা পরিত্যাগ করতে পারি না।

 

 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ