রবিবার ২৫ জুলাই ২০২১
Online Edition

টিকা নিয়ে তেলেসমাতি

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী: স্বাস্থ্যখাতে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এখন কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। রথি-মহারথিরা থেকে শুরু করে চুনোপুটিরাও এখন দুর্নীতির ভাগিদার। টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটিতে। সুতরাং সবাই ইট ফেলতে চাইছে। একটা ইট ফেলতে পারলেই জায়গা হয়ে গেল। টাকা। শুধু নগদের পথেই নয়, দেশের স্বার্থ বিক্রি করে দিয়েও সম্ভবত পাওয়া যায় কোটি কোটি টাকা। তার কিছু উদাহরণও আমরা দেখেছি। দেশের স্বার্থ বিরোধী এসব ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সরকার নিতান্তই অসহায়, সেটাও আমরা দেখলাম।

প্রথমেই ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউটের এক্সটাজেনেকা টিকার প্রসঙ্গে আসা যাক। তাদের কাছ থেকে প্রায় দুই কোটি ডোজ টিকা আনার জন্য সরকার বেক্সিমকোকে দায়িত্ব দেয় অর্থাৎ ঠিকাদারি দেয়। তাতে বেক্সিমকোর ২৭১ কোটি টাকা বাণিজ্য হয়েছে বটে, বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতির  এক-চতুর্থাংশ টিকাও পায়নি। এর মধ্যে নানা কথাবার্তা শেষে সিরাম জানিয়ে দেয় যে, তারা বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুতির টিকা সরবরাহ করতে পারবে না। কারণ ততদিনে ভারতেই করোনা পরিস্থিতি ভযাবহ রূপ নিয়েছে এবং সিরামে উৎপাদিত সমুদয় টিকা ভারতেরই লাগবে।

তখনই সরকারের দেউলিয়াপনা তুমুলভাবে ফুটে ওঠে। সরকার  বেক্সিমকোকে বলে, তারা সিরাম থেকে চুক্তি অনুযায়ী টিকা এনে দিক। বেক্সিমকো বলে, সরকার ভারত সরকারকে চাপ দিক। সরকার বলে, এটা বেক্সিমকোর দায়িত্ব, বেক্সিমকো বলে এটা সরকারের দায়িত্ব। এই নিয়ে দড়ি টানাটানি হতে থাকে। এক সময় বেক্সিমকো টাকা খেয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে সরকারের ওপর সকল দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে চুপ হয়ে যায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী বলতে থাকেন, আমরা টিকা না পাই, টাকা ফেরত পাব। যদিও সেটা সুদূরপরাহত। কিন্তু টাকা দিয়ে আমরা কী করব, আমাদের তো টিকা চাই। সিরামের টিকার আপাতত কোনো সম্ভাবনা নেই। তারপর বেশ কিছুদিন ভারতের স্বার্থের পক্ষে ওকালতিমূলক কথাবার্তা বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে। তাতে তিনি ভারতের দালাল সাব্যস্ত হয়েছেন, বাংলাদেশের জনগণের স্বাস্থ্য সমস্যার কোনো সুরাহা হয়নি। এক পর্যায়ে ভারত সরকার জানিয়ে দিয়েছে আপাতত বাংলাদেশকে আর এক ডোজ টিকা দেয়াও সম্ভব হবে না। খেল খতম, পয়সা হজম। যারা একস্ট্রাজেনেকার এক ডোজ টিকা নিয়ে দ্বিতীয় ডোজের জন্য অপেক্ষায় আছেন, তাদের কী হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বললেন, ভিখ মানি মহাশয়। অন্তত আরও ১৬ লাখ টিকা উপহার হিসেবে দেন। ভারত সে ভিক্ষাপাত্রে লাথি মেরে দিয়েছে। টিকা হবে না। পয়সা দিয়ে এমন অপমান কেনা বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীদের এমন বদ স্বভাবে পরিণত হয়েছে। 

প্রচলিত কথা আছে, সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখতে নেই। ভারতের সেবাদাসগিরি করতে গিয়ে পাঁচশ কোটি টাকার টিকা এক ঝুড়িতে রেখেছিল বাংলাদেশ। ভারত সে ঝুড়ি লাথি মেরে ভেঙে দিয়েছে। এখানে বন্ধুত্ব-টন্ধুত্ব কোনো কাজে আসেনি। মধ্যস্বত্বভোগী বেক্সিমকো পাঁচশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পগার পার। তাদের কথাই এখন আর শোনা যায় না।

ভারতের সেবাদাস সরকার সম্পূর্ণ দূরদৃষ্টিহীন অন্ধ। তা না হলে এই বিপদের দিনে চীন যখন প্রস্তাব করেছিল যে, বাংলাদেশে তাদের টিকার যৌথ ট্রায়াল তারা করতে চায়। সে ট্রায়াল সফল হলে সিনোভ্যাক্স টিকার যৌথ অংশীদার হবে বাংলাদেশ। এতো বড় সুযোগ খুব কম দেশই পেয়েছে। কিন্তু ভারতীয় সেবাদাসদের ষড়যন্ত্র ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফলে সে সুযোগ বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়ে যায়। যথাসময়ে সরকার চীনকে জানাতে পারে না যে, তারা এই প্রস্তাব গ্রহণ বা বর্জন করেছে। ফলে চীন এই প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। তখন দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক বিশেষজ্ঞরা  বলেছিলেন, এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা সঠিক নয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় কিংবা ভারতীয় দালাল মনস্ক সরকার এই কথায় কর্ণপাত করেনি। নির্ধারিত ডেড লাইন পার হয়ে যাওয়ার পর চীন জানিয়ে দেয় যে, যে ফান্ড দিয়ে তারা বাংলাদেশে হিউমেন ট্রায়াল করতে চেয়েছিল সরকার যথাসময়ে সারা না দেয়ায় চীন সে ফান্ড অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। এখন হিউমেন ট্রায়াল করতে হলে তার অর্থের জোগান বাংলাদেশ সরকারকেই করতে হবে। সরকার যদি গণবান্ধব হতো তাহলে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে যেত। কিন্তু সরকার কোনো অবস্থাতেই গণবান্ধব নয়। ফলে তখন থেকেই টিকা নিয়ে এক লেজে গোবরে অবস্থার তৈরি হলো।

এসব এখন পুরনো ঘটনা। নতুন ঘটনা চীন থেকে দেড় কোটি ডোজ সিনোভ্যাক টিকা ক্রয়ে দেশের সকল নাগরিক আশান্বিত হয়ে উঠেছিল। এ ব্যাপারে নাকি একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কথা ছিল চুক্তির সমস্ত কিছু গোপনীয় থাকবে। কিন্তু না বাংলাদেশের জনগণের এক স্বার্থবিরোধী সেবাদাস এক অতিরিক্ত সচিব সাহিদা আক্তার চীন কি দামে বাংলাদেশকে টিকা সরবরাহ করছে, চুক্তির বরখেলাপ করছে, তিনি তা মিডিয়ায় প্রকাশ করে দেন। বন্ধুত্বের মাত্রা অনুযায়ী নানা হিসাব নিকাশ শেষে এক এক দেশে এক এক দামে টিকা সরবরাহ করে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে সস্তায় টিকা সরবরাহ করেছে চীন। শ্রীলঙ্কা বা ইন্দোনেশিয়াও চীনের বন্ধু। পরিস্থিতি বিবেচনায় সেখানে ভিন্ন দামে টিকা সরবরাহ করেছে চীন। ফলে বাংলাদেশে চীনের টিকা সরবরাহ নিয়ে নতুন সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

চীন এখন বলছে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের টিকা সরবরাহের কোনো চুক্তিই হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, দাম প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় টিকা সরবরাহের জন্য চীন এখন নতুন শর্ত আরোপ করছে। সে শর্ত দামের নয়, অন্য কিছু। ভারতীয় সেবাদাসমন্ত্রীরা এই ‘অন্য কিছুর’ ঠেলা সম্ভবত শিগগিরই বুঝবেন।

চীনা টিকার সঙ্গে রাশিয়ান টিকা নিয়েও আলোচনা চলছিল। সে আলোচনা অগ্রসর হচ্ছে না। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আপাতত চীনা টিকাই ভরসা। তাই যদি হয়, তবে সততার সঙ্গে চীনের সঙ্গে সমঝোতা করুন। অন্যথায় জনগণের জন্য যে মহাবিপদ। টিকা পাব কোথায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ