রবিবার ২৫ জুলাই ২০২১
Online Edition

দূষণে ঢাকার অবনতি

বায়ুদূষণসহ রাজধানী ঢাকার পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। এসব আলোচনার মূলকথায় একদিকে ঢাকাকে একটি প্রধান দূষিত নগরী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে। এর পেছনে অবশ্য বিশেষ কারণ রয়েছে। বিগত কয়েক বছরে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীগুলোর মধ্যে অন্যতম একটির অবস্থান অর্জন করেছে। যেমন ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর। কোনো শহরের বায়ু দূষণের মাত্রা ৫০ পর্যন্ত হলেই শহরটিকে অস্বাস্থ্যকর ও বিপদজনক হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে সেদিন ঢাকার দূষণের মাত্রা ছিল ১৯৪। 

এ ধরনের একটি আশংকাজনক রিপোর্টের পর আশা ও ধারণা করা হয়েছিল, সরকার নিশ্চয়ই পরিবেশ স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে উদ্যোগী হয়ে উঠবে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। ফলাফল যা হওয়ার ঠিক তা-ই হয়েছে। রাজধানীর বায়ুদূষণের মাত্রা বরং অনেক বেড়ে গেছে এবং এখনও বেড়েই চলেছে। এ বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য জানা গেছে ইংল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক রিপোর্টে। গত বুধবার প্রতিষ্ঠানটি ‘বিশ্ব বাসযোগ্যতার সূচক-২০২১’ শিরোনামে ১৪০টি দেশকে নিয়ে যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে সে রিপোর্টে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৩৭-এ। অর্থাৎ নিচের দিক থেকে ঢাকা রয়েছে চার নম্বরে। এক নস্বরে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। এর পর রয়েছে নাইজেরিয়ার লাগোস এবং পাপুয়া নিউগিনির পোর্ট মোরেসবি। এ তিনটি নগরীর পরই চতুর্থ স্থানটি পেয়েছে ঢাকা। অন্যদিকে বাসযোগ্যতার দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষস্থানে রয়েছে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড, জাপানের ওসাকা, অস্ট্রেলিয়ার অ্যডিলেড, নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন এবং জাপানের টোকিও। লক্ষণীয় যে, বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি নগরীর মধ্যে নিউজিল্যান্ড ও জাপানেরই রয়েছে চারটি।

ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এই রিপোর্টে বাসযোগ্যতার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং অবকাঠামো বিষয়ক পাঁচটি উপসূচকেও বাংলাদেশের নম্বর কমে গেছে। উল্লেখ্য, একই সংস্থার ২০১৯ সালের রিপোর্টে স্বাস্থ্যে বাংলাদেশের নম্বর ছিল ২৯-এর বেশি, কিন্তু এবার সেটা ১৭-এর নিচে নেমে এসেছে। স্মরণ করা দরকার, ২০১৯ সালে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে ঢাকার স্কোর ২১০-এ পৌঁছেছিল। এর অর্থ, রাজধানীর বাতাসের মান অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। এ সময় ৩০০ স্কোর নিয়ে পাকিস্তানের লাহোর প্রথম স্থানে এবং ২০৮ স্কোর নিয়ে আফগানিস্তানের কাবুল ছিল তৃতীয় স্থানে। 

বলা দরকার, এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের মাধ্যমে প্রতিদিন বিভিন্ন শহরের বাতাসের মান তৈরি করে বাতাস কতটা স্বাস্থ্যসম্মত এবং দূষিত বাতাসের কারণে ওই শহরের মানুষেরা কি পরিমাণ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেÑ এসব বিষয়ে জানিয়ে দেয়া হয়। এটা একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং সব দেশই এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিকারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয়। ইনডেক্সের মান ২০১ থেকে ৩০০ পর্যন্ত হলে তার অশুভ প্রভাব পড়ে জনস্বাস্থ্যের ওপর। তেমন অবস্থায় বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষদের বাড়ির ভেতরে থাকার এবং বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। 

অন্যদিকে ইনডেক্সের স্কোর ৫০ হলে তাকে স্বাস্থ্যের জন্য মানসম্মত এবং স্কোর  ৫১ থেকে ১০০-র মধ্যে থাকলে তাকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়। আর স্কোর যদি ১০১ ছাড়িয়ে ১৫০ পর্যন্ত হয় তাহলেই তাকে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিপদজনক মনে করা হয়। সেদিক থেকে ২১০-এ উঠে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকার বাতাসের মান যে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও বিপদজনক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল সে কথা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভীতি ও উদ্বেগের কারণ হলো, সরকারের পক্ষ থেকে দূষণ প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা তো নেয়া হচ্ছেই না, উল্টো ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেল ধরনের নির্মাণ কাজের মাধ্যমে পরিবেশকে আরো বিপদজনক করে তোলা হচ্ছে। ফলে দূষণের সূচকও ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বায়ুদূষণের পরিণতিতে জটিল ও দুরারোগ্য নানা অসুখ-বিসুখই কেবল ছড়িয়ে পড়ছে না, দেশে মৃত্যুর হারও বেড়ে চলেছে। এ সংক্রান্ত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। সে কারণে দুরারোগ্য নানা অসুখ-বিসুখ তো বাড়ছেই, মানুষের আয়ুও অনেক কমে যাচ্ছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, উন্নয়নের নামে চলমান নির্মাণ কাজের পাশাপাশি ইটের ভাটাগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ কালো ধোঁয়া ঢাকার বাতাসে মিশছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যানবাহনের কালো ধোঁয়া। এ দুটির সঙ্গে বিগত কয়েক বছরে যুক্ত হয়েছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ছড়িয়ে পড়া ধূলোবালি। ফ্লাইওভার এবং বিশেষ করে মেট্রোরেল লাইনের নির্মাণ উপলক্ষে বছরের পর বছর ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চলতে থাকায় বাতাসে ধূলোবালির পরিমাণও আশংকাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। ফলে রাজধানীতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ ফুসফুসের সংক্রমণ, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, চোখের সমস্যা, ডায়াবেটিস এবং নিউমোনিয়ার মতো বিভিন্ন রোগবালাই বেড়ে চলেছে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, সব মিলিয়েই রাজধানী ঢাকার দূষিত বায়ু ও পরিবেশ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতো আমরাও মনে করি, সরকারের উচিত বায়ুদূষণ প্রতিরোধের জন্য জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া। মেট্রোরেল লাইনসহ সকল চলমান নির্মাণ কাজ দ্রুত সমাপ্ত করতে হবে এবং কাজ চলাকালীন সময়ে পানি ছেটানোর মতো এমন কিছু ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক রাখতে হবে, যার ফলে বাতাসে ধূলোবালি ছড়িয়ে পড়তে না পারে। দ্বিতীয় একটি পদক্ষেপ হিসেবে রাজধানীর ভেতরে ও আশপাশ থেকে সকল ইটের ভাটা সরিয়ে দিতে হবে। আমরা চাই, রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশ বায়ুদূষণের কবলমুক্ত হোক এবং নিরাপদ হোক মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ