রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

পশ্চিম তীরে ২ ফিলিস্তিনী কর্মকর্তাকে হত্যা ইসরাইলী বাহিনীর

১০ জুন, আল জাজিরা: রয়টার্স : ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে তাদের দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে ইসরাইলের স্পেশাল ফোর্সেস। ফেরারি বন্দুকধারীদের লক্ষ্য করে অভিযানের সময় সম্ভাব্য ভুল পরিচয়ের কারণে গতকাল বৃহস্পতিবারের এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ইসরাইলি একটি সূত্র, জানিয়েছে বার্তা সংস্থা।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক সংলাপ দীর্ঘদিন ধরে থমকে থাকলেও আন্তর্জাতিক সমর্থনপুষ্ট ফিলিস্তিন অথরিটি (পিএ) পশ্চিম তীরে ইসরাইলের সঙ্গে সমন্বয় করেই নিরাপত্তা বিধান করে। পিএর নিরাপত্তা কর্মকর্তারা খুব কমই ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, সাধারণত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অভিযানের সময় দূরত্ব বজায় রাখে তারা। 

পশ্চিম তীরের জেনিনে ঘটা এ ঘটনার বিষয়ে ইসরাইলি কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। এ ঘটনায় তৃতীয় আরেকজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

একজন ফিলিস্তিনি বন্দুকধারী নিহত হয়েছেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন ইসরাইলের নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্র। তিনি জানান, একজন বন্দুকধারীকে আটক করতে গোপনে ইসরাইলি স্পেশাল ফোর্সেসের একটি ইউনিট জেনিন শহরে গিয়ে হাজির হয়। ওই বন্দুকধারী ফিলিস্তিনি সম্প্রতি ইসরাইলের সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। 

অভিযানের সময় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলিতে এক বন্দুকধারী নিহত ও অপর একজন আহত হন, তাকে আটক করা হয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে। তিনি আরও জানান, গোলাগুলির শব্দ শুনে নিকটবর্তী কম্পাউন্ড থেকে ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এগিয়ে এসে ইসরাইলিদের দিকে গুলি ছোড়ে।

সূত্রটি বলেন, “তখন সম্ভবত তারা বুঝতে পারে যাদের দিকে গুলি ছুড়েছে তারা গোপনে আসা ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। কিন্তু আমাদের বাহিনী পাল্টা গুলি ছুড়ে, তারা মনে করেছিল ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা সদস্যরা ওই ফেরারি সন্ত্রাসীদেরই অংশ, তাই তারা গুলি ছুড়ছে।”

এ সময় ইসরাইলিদের পাল্টা গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হন বলে জানিয়েছেন জেনিনের ডেপুটি গভর্নর জামাল আবু এল-রাব।

তিনি জানান, ফিলিস্তিনি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সদরদপ্তরের সামনে একটি গাড়িতে বসে থাকা এক ব্যক্তিকে হত্যা ও আরেকজনকে আহত করে ছদ্মবেশে আসা ইসরাইলি সেনারা। নিহত ব্যক্তিকে নিজেদের সদস্য দাবি করেছে ইসলামিক জিহাদ। 

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের মুখপাত্র নাবিল আবু রুদেইনেহ বলেছেন, এই ঘটনা একটি ‘বিপজ্জনক উস্কানি’ এবং এর ফলাফলের জন্য ইসরাইলকেই দায়ী ধরবে পিএ।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইসরাইলী বোমা নিষ্ক্রিয় করছে ফিলিস্তিনীরা : গাজা উপত্যকায় সাম্প্রতিক ইসরাইলী আগ্রাসনের দগদগে ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে ফিলিস্তিনীরা। দখলদার বাহিনীর টানা ১১ দিনের ওই তা-বের আপাত পরিসমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু শেষ হয়নি ফিলিস্তিনীদের দুর্দশা। গাজায় এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বহু বিপজ্জনক অবিস্ফোরিত ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র। আর শক্তিশালী এসব ক্ষেপণাস্ত্রের ওপরই খেলায় মেতেছে কোমলমতি শিশুরা। ঝুঁকি এড়াতে ক্ষেপণাস্ত্র অপসারণে জীবন বাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছে স্থানীয় বোমা নিষ্ক্রিয়কারী টিম। কোনও হতাহত ছাড়াই এ পর্যন্ত ১২শ’ বোমা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে তারা।

১৯-মে, মধ্যরাত। অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার রাফার বাসিন্দা মুহারেবের পরিবার যে বাড়িটিতে থাকেন ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সেটি কেঁপে উঠে। এর দুই মিনিটের মাথায় আরেকটি দোতলা বাড়িকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে দখলদার বাহিনী। তবে কোনও কারণে দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটি বিস্ফোরিত হয়নি।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার কাছে সেদিনের ইসরাইলি বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেছেন ওয়াসিম মুহারেব। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই এবং তার পরিবার দ্বিতীয় তলায় থাকতাম। ইসরাইলি বোমা হামলায় সেদিন আমরা সবাই গুরুতর আহত হয়েছিলাম। আমার চার মাসের সন্তান দুই দিনের জন্য কোমায় চলে গিয়েছিল। আট বছর বয়সী আমার ভাগ্নি লেয়ান টানা ১০ দিন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছে। শরীরের বেশিরভাগ জায়গা পুড়ে যায়।’

ওয়াসিম জানান, ‘ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভবন পুরোপুরি মিশে গেছে। কোনও ধরনের সতর্ক সংকেত না দিয়েই বিমান থেকে বোমা পড়ছিল। তিন মিনিটের ব্যবধানে সব কিছুই শেষ হয়ে যায়।’ সবকিছু হারিয়ে এখন ভাড়া বাড়িতে উঠেছেন ওয়াসিম।

গত রমজান মাসের শেষ শুক্রবার জুমাতুল বিদা উপলক্ষে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল আকসা মসজিদে জড়ো হলে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসরাইলি পুলিশ। পরদিন পবিত্র লাইলাতুল কদরের রাতেও থেমে ছিল না দখলদার বাহিনীর তা-ব। এতে শত শত ফিলিস্তিনি আহত হয়। ইসরাইলি আগ্রাসনের জবাবে মুক্তিকামী ফিলিস্তিনিরা রকেট হামলা চালিয়েছে; এমন অভিযোগে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বিমান হামলা শুরু করে দখলদার বাহিনী। জবাবে রকেট হামলা চালিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ১১ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ৬৬ শিশুসহ ২৬০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে দখলদার বাহিনী। হামাসের পাল্টা প্রতিরোধে ইসরাইলে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের চাপে মিসরের মধ্যস্থতায় গত ২১ মে থেকে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছায় ইসরাইল। ভয়াবহ ঝুঁকি গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায় কাজ করা এজন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মিকাদ। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, অত্যাবশকীয় প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাব সত্ত্বেও গত ১০ মে থেকে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের ৭০ জন্য সদস্য কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

তিনি জানান, ‘বোমা অপসারণের জন্য আমাদের কাছে তেমন কোনও সুরক্ষা সরঞ্জাম নেই বললেই চলে। সাধারণ সরঞ্জাম রয়েছে যেমন, একটি টুল বক্স যা প্রতিটি ঘরেই পাওয়া যায়।’ ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মিকাদ বলেন, ‘গাজায় গত ১৩ বছর ধরে ইসরাইল অবরোধে দিয়ে রেখেছে। আর এতে আমাদের অনেক বিধি-নিষেধের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। ফলে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী যন্ত্র আমাদানিও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এখন সবচেয়ে চিন্তার বিষয় আমাদের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ তারা পরবর্তীতে ইসরাইলি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

মিকাদের দাবি, অবরুদ্ধ গাজা উপত্যাকায় এবার নতুন ধরনের বিপজ্জনক অস্ত্র প্রথমবারের মতো প্রয়োগ করে ইসরাইয়েলি বাহিনী। এর মধ্যে জিবিইউ-৩১ এবং জয়েন্ট ডিরেক্ট অ্যাটাক মিউনটিউশন-জেডিএএম-এর মতো বিস্ফোরক রয়েছে। দুই টন ওজনের বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছিল বহুতল ভবন, আবাসিক ভবন ছাড়াও সংবাদমাধ্যমের অফিসে।

১১ দিনের ইসরাইলী তা-বে বোমার আঘাতে গাজার বহু অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। ১৮শ’ হাউজিং ইউনিট, ৭৪টি সরকারি ভবন এবং ৫৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ৩৩টি মিডিয়া হাউস গুঁড়িয়ে দিয়েছে দখলদার বাহিনী। একটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট ধ্বংস করে দেওয়া সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আড়াই লাখ মানুষ।

প্রশিক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ১৯৯৬ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গাজা শাসনকালে বোমা নিষ্ক্রিয় ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। প্রথম দলটি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পায়। পরে ২০০৬ সালে আরও ইঞ্জনিয়ার ও টেকনিশিয়ান যুক্ত করে দলটিকে অধিক শক্তিশালী হতে সাহায্য করে। প্রকৌশলী মিকাদ বলেন, এখন দলটি নিজস্ব পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। কারণ গত ১০-১১ বছর ধরে গাজার বাইরে থেকে দলটি কোনও ধরনের সহায়তা পায়নি। গত আট বছর ধরে এই দলের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন আসাদ আল-আলওয়াল। তার ভাষায়, ‘প্রতিদিনই আপনি মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখছেন, কিন্তু সৃষ্টিকর্তাই রক্ষা করবেন। সাধারণ মানুষকে বাচাঁতে গিয়ে যদি প্রাণও যায় তবে তা হবে সম্মানের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ