শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

হেফাজতের ৩৩ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা

# গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি ও কওমী মাদরাসা খুলে দেয়ার দাবি
স্টাফ রিপোর্টার : কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এবারের কমিটিতে দলটির সাবেক আমীর শাহ আহমদ শফীর বড় ছেলে মো. ইউসুফ মাদানিকে সহকারী মহাসচিব করা হয়েছে। বাদ দেয়া হয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হকসহ গ্রেফতারকৃত নেতাদের। আগের কমিটি প্রায় দেড়শ সদস্য বিশিষ্ট হলেও নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে মাত্র ৩৩ সদস্য নিয়ে। তবে ভবিষ্যতে প্রত্যেক জেলা কমিটির সভাপতি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হবেন বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন। নতুন কমিটি অরাজনৈতিক দাবি করলেও অবশ্য দু’একজন রাজনৈতিক পদধারী নেতা রয়েছেন।
গতকাল রাজধানীর খিলগাঁও মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় মহাসচিবের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন এ কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন কমিটির নাম ঘোষণা করে মহাসচিব হাফেজ নুরুল ইসলাম জিহাদী বলেন, এটি বর্তমানে পূর্নাঙ্গ কমিটি। তবে আগামীতে এ কমিটির পরিধি আরো বাড়তে পারে। এছাড়া সংবাদ সম্মেলন পরবর্তী কমিটির প্রথম সভায় গ্রেফতারকৃত সকল নিরপরাধ আলেম-উলামার মুক্তি ও দেশের সকল কওমী মাদরাসা খুলে দেয়ার দাবি জানান হয়।
হেফাজতের নতুন আমির হিসেবে আগের আমির আল্লাম জুনাইদ বাবুনগরী এবং মহাসচিব হিসেবে হাফেজ নুরুল ইসলাম জিহাদীই রয়েছেন। এছাড়া কমিটির অন্য সদস্যরাও আগের কমিটিতে ছিলেন। কমিটিতে ৯ জন নায়েবে আমির, ৫ জন যুগ্ম-মহাসচিব, ২ জন সহকারী মহাসচিব, ১ জন করে সাংগঠনিক, অর্থ, প্রচার ও দাওয়াহ বিষয়ক সম্পাদক রয়েছেন। এছাড়া ১ জন করে সহ অর্থ, প্রচার ও দাওয়াহ বিষয়ক সম্পাদক রয়েছেন। বাকি ৮ জন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য রয়েছেন।  হেফাজতের নতুন কমিটির পাশাপাশি ১৬ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি এবং ৯ সদস্যের খাস কমিটি তথা মজলিসে শূরা গঠন করা হয়েছে। খাস কমিটি হেফাজতের মূল পরিকল্পনাকারী ও তাতক্ষণিক প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
নতুন কমিটির নায়েবে আমিররা হলেন, মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী, মাওলানা আবদুল হক মোমেন শাহী, মাওলানা সালাহ উদ্দীন নানুপুরী, অধ্যক্ষ মীযানুর রহমান চৌধুরী (পীর সাহেব দেওনা), মাওলানা মুহিব্বুল হক (গাছবাড়ী, সিলেট), মাওলানা ইয়াহইয়া (হাটহাজারী মাদ্রাসা), মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস (ফরিদাবাদ মাদ্রাসা), মাওলানা তাজুল ইসলাম (পীর সাহেব ফিরোজশাহ্) ও মাওলানা মুফতী জসিমুদ্দীন (হাটহাজারী মাদ্রাসা)।
যুগ্ম মহাসচিবরা হলেন, মাওলানা সাজেদুর রহমান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), মাওলানা আব্দুল আউয়াল (নারায়ণগঞ্জ), মাওলানা লোকমান হাকীম (চট্টগ্রাম), মাওলানা আনোয়ারুল করীম (যশোর) ও মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী।
সহকারী মহাসচিব মাওলানা জহুরুল ইসলাম (মাখজান) ও মাওলানা ইউসুফ মাদানী (সাহেবজাদা, আল্লামা শাহ আহমদ শফি)।
সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস (চট্টগ্রাম), অর্থ সম্পাদক মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ আলী (মেখল), সহ-অর্থ সম্পাদক মাওলানা মুফতী হাবিবুর রহমান কাসেমী (নাজিরহাট), প্রচার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন রব্বানী (সাভার, ঢাকা), সহ-প্রচার সম্পাদক মাওলানা জামাল উদ্দীন (কুড়িগ্রাম)। দাওয়া বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সোবহানী (উত্তরা, ঢাকা), সহকারী দাওয়া বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা ওমর ফারুক (নোয়াখালী)। এছাড়া কেন্দ্রীয় সদস্যরা হলেন, মাওলানা মোবারাকুল্লাহ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), মাওলানা ফয়জুল্লাহ (পীর সাহেব, মাদানীনগর), মাওলানা ফোরকানুল্লাহ খলিল (দারুল মায়ারেফ, চট্টগ্রাম), মাওলানা মোশতাক আহমদ (খুলনা দারুল উলূম), মাওলানা রশিদ আহমদ (কিশোরগঞ্জ), মাওলানা আনাস (ভোলা), মাওলানা মাহমুদল হাসান (ফতেহপুরী) ও মাওলানা মাহমুদুল আলম (পঞ্চগড়)।
১৬ সদস্য বিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটি: প্রধান উপদেষ্টা মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, উপদেষ্টা মাওলানা মুফতী আব্দুস সালাম (চাটগামী), মাওলানা সুলতান যওক নদভী, মাওলানা আব্দুল হালীম বোখারী (পটিয়া), মাওলানা নুরুল ইসলাম আদীব (ফেনী), মাওলানা আব্দুল মালেক হালীম, মাওলানা আব্দুর রহমান হাফেজ্জী (মোমেনশাহী), মাওলানা রশিদুর রহমান ফারুক বর্ণভী, মাওলানা নূরুল হক (বটগ্রাম, কুমিল্লা), মাওলানা আবুল কালাম (মুহাম্মদপুর), মাওলানা শিব্বির আহমাদ (নোয়াখালী), মাওলানা জালাল আহমাদ (ভূজপুর), মাওলানা আশেক এলাহী (উজানী), মাওলানা হাবিবুল্লাহ বাবুনগরী, মাওলানা আব্দুর বাছীর (সুনামগঞ্জ) ও  মাওলানা আফজালুর রহমান (ফেনী)।
৯ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় খাস কমিটি: মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, মাওলানা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী, মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী, মাওলানা হাফেজ নূরুল ইসলাম (ঢাকা), অধ্যক্ষ মিযানুর রহমান চৌধুরী (পীর সাহেব দেওনা), মাওলানা সাজেদুর রহমান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), মাওলানা মুহিব্বুল হক (গাছবাড়ী, সিলেট), মাওলানা আব্দুল আউয়াল (নারায়ণগঞ্জ) ও মাওলানা মুহিউদ্দীন রব্বানী (সাভার, ঢাকা)।
কেন গত কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে- সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল ইসলাম জিহাদী বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমির বাবুনগরী সাহেব ওলামায়ে কেরামদের সঙ্গে আলোচনা করে কমিটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। যারা কারাগারে আছেন, তাদের অপরাধী মনে করে বাদ দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে, নবনির্বাচিত কমিটির মহাসচিব বলেন, কাউকে অপরাধী মনে করার ক্ষমতা আমাদের নেই। অপরাধী মনে করতে পারেন আদালত। হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির আহমদ শফীর বড় ছেলে ইউসুফ মাদানী আপনাদের কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের সাথে আলাপে জানিয়েছেন, এ কমিটি মানেন না। এ বিষয়ে কী বলবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের সাথে তার যে কথা হয়েছে, তিনি কমিটিতে থাকার কথা জানিয়েছেন। তিনি কমিটি মানেন না বলে যদি কোনো কথা বলে থাকেন, সেটা সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন। আমাদের এ রকম কিছু বলেননি। হেফাজতের শফীপন্থিদের সাথে বিভাজন দূর হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল ইসলাম বলেন, হেফাজতে ইসলাম একটি। অন্য কোনো হেফাজত নেই। আর বিদ্রোহের কোনো খবর আমাদের কাছে নেই।  কমিটি গঠন করে কতটা খুশি? জানতে চাইলে নুরুল ইসলাম বলেন, কমিটি গঠন করে আমরা খুশি। তবে শঙ্কা হলো, যে দায়িত্ব আমাদের ওপর এসেছে তা কতটুকু পালন করতে পারব, সেটা নিয়ে।
কমিটির প্রথম বৈঠক: নতুন কমিটি ঘোষণা উপলক্ষে প্রেস ব্রিফিংয়ের পর খিলগাঁও মহাসচিবের কার্যালয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক থেকে নেতারা গ্রেফতারকৃত সব নিরপরাধ আলেম-উলামাকে মুক্তি ও দেশের সব কওমী মাদরাসা খুলে দেয়ার দাবি জানান হেফাজত নেতারা। বৈঠক থেকে হেফাজত নেতৃবৃন্দ দাবি করেন, অনতিবিলম্বে আটককৃত সকল আলেম-উলামা ও তৌহিদী জনতাদের মুক্তি দিতে হবে। অনেক নির্দোষ আলেম-উলামা ও সাধারণ মানুষ গ্রেপ্তার হয়ে আছেন। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি তাদের মুক্তি দিন। আলেম-উলামাদের বয়ানের মিম্বার ও হাদিসের মসনদে ফেরার ব্যবস্থা করুন। এছাড়াও আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি অনতিবিলম্বে দেশের সকল কওমী মাদরাসা খুলে দেয়া হোক। কওমী মাদরাসাগুলো দ্বীনি প্রতিষ্ঠান। কওমী মাদরাসাগুলোর কারণে আমাদের দেশে আল্লাহর রহম বর্ষিত হয়। সরকার এর আগেও কওমী মাদরাসাগুলো খুলে দিয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ, কোনো মাদরাসায় করোনা সংক্রমিত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ আগমনের বিরোধিতা করে সংগঠনের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত মার্চের ২৫, ২৬ ও ২৭ তারিখ দেশজুড়ে হরতাল-বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করে হেফাজত। সে সময়ে সরকারি অফিস, স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অন্তত ১৭ জনের প্রাণহানি হয়। এরপর ঢাকা মহানগর হেফাজতের সাধারণ সম্পাদক মামুনুল হকের ঘটনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ১১ এপ্রিল থেকে বিভিন্ন মামলায় হেফাজতের নেতাদের গ্রেফতার শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আলোচিত হেফাজত নেতাদের মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ড. আহমদ আবদুল কাদের, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হক, সহকারী মহাসচিব মাওলানা মনঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক হারুন ইজহার, সহকারী সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, মাওলানা আতাউল্লাহ আমেনী, কেন্দ্রীয় কমিটির সহ অর্থ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগরী কমিটির সহসভাপতি মুফতি ইলিয়াস, কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার সম্পাদক মুফতি শরীফ উল্লাহ, ঢাকা মহানগর হেফাজতের সহ-সভাপতি মাওলানা কোরবান আলী, ঢাকা মহানগরীর সহ-সভাপতি মাওলানা জুবায়ের আহমেদ প্রমুখ।
এমন পরিস্থিতিতে ২৫ এপ্রিল রাতে জুনাইদ বাবুনগরী হেফাজতের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। আর তার কয়েক ঘণ্টা পর জুনাইদ বাবুনগরীকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা আসে। তখন থেকেই হেফাজত নেতারা বলে আসছিলেন শিগগির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে। সবশেষ গতকাল সোমবার নতুন কমিটি ঘোষণা করলো হেফাজত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ