শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

যে ফরমানে প্রশ্ন জাগে

ভারত পৃথিবীর একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। তবে এমন ভাবমর্যাদা অটুট রাখার জন্য প্রয়োজন হয় আইন পরিষদ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের যথামর্যাদা এবং যথাঅবস্থান। এক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটলে দেখা দেয় প্রশ্ন। আর প্রশ্নের সঙ্গত সমাধান না হলে সংকটের মাত্রা বেড়ে যায় এবং এর পরিণতি তেমন সুখকর হয় না। ভারতে কি এখন তেমন কোনো সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে? নয়তো মুখ বন্ধে নয়া ফরমান জারি করা হবে কেন?
ক্ষমতায় আরোহনের অষ্টম বছরে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি আমলাদের কাছ থেকে কোনো রকম বিপদের আশংকা করছেন? এক সরকারি ফরমান সৃষ্টি করেছে এমন প্রশ্ন। দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা কিংবা অখন্ডতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে জারি করা সেই ফরমানে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তাঁরা কেউ নিজেদের অভিজ্ঞতা বা অভিমতের কথা লিখতে বা বলতে পারবেন না। এই নির্দেশের অন্যথা হলে তাঁদের অবসরকালীন পেনশন অনিশ্চিত হয়ে যাবে। উল্লেখ্য যে, গত ৩১ মে সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর অধীন কেন্দ্রীয় কর্মী ও প্রশিক্ষণ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে ওই ফরমানের কথা জানা যায়। ফরমানের আওতায় সরাসরি পড়ছেন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী; দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সংহতি ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলারা। অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক স্বার্থ এবং কৌশলগত বিষয়ের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত ছিলেন, তাঁরাও ওই নির্দেশের আওতাভুক্ত হচ্ছেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই নির্দেশিকার পরিধি সরকার তার ইচ্ছামত বাড়াতে পারবে। ফলে দেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও স্বার্থের ব্যাখ্যা দিয়ে প্রকারান্তরে গোটা আমলাশাহিকেই সরকার ওই বিজ্ঞপ্তির আওতাভুক্ত করে নিতে পারবে। আর জেল-জরিমানার পাশাপাশি পেনশন পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টি এর সঙ্গে জুড়ে দেয়ার মধ্যদিয়ে সরকার সব আমলার মুখ বন্ধ করার পথ প্রশস্ত করলো বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
সরকারবিরোধী সাবেক আমলাদের সংস্থা ‘কনস্টিটিউশনাল কনডাক্ট গ্রুপ’-এর এক পদাধিকারী এই প্রসঙ্গে গত বুধবার বলেন, ‘আমরা শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের অভিমত জানাবো। তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, নানা কারণে সরকার ভয় পেয়েছে। অনিষ্ট আশংকা করছে। সেই জন্য আমলাশাহিকে চাপে রাখতে চাইছে, যাতে স্পর্শকাতর তথ্য, প্রকাশিত না হয়। সরকারের সমালোচনা না হয়।’
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, সদ্য অবসর নেয়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব আলাপন বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের যে ‘লড়াই’ শুরু হয়েছে, সেই প্রেক্ষিতে আলোচ্য নির্দেশিকা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, আলাপনকে ‘শোকজ’ করার চিঠি ও নতুন নির্দেশিকা একই দিনে জারি করা হয়। সাবেক আমলারা বলছেন, সরকার ও দেশ সমার্থক নয়। কিন্তু সরকার মনে করছে, তার বিরোধিতা দেশ-বিরোধিতারই নামান্তর। উল্লেখ্য যে, নতুন নির্দেশিকা জারির ঠিক আগেই দেশদ্রোহ নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সারাদেশে যেভাবে তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে দেশদ্রোহের অভিযোগ দাখিল হচ্ছে, তাতে বিরক্তি প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, দেশদ্রোহের সংজ্ঞা নতুনভাবে তৈরি করতে হবে। আমরা জানি, কোনো দেশের সরকারের জন্য নতুন নতুন ফরমান জারি কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে সব ফরমান দেশের জনগণ কিংবা সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে যৌক্তিক বা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয় কিনা সেটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আলোচ্য ফরমানটি আমলাদের মুখ বন্ধের ফরমান কিনা সেই প্রশ্ন উঠে এসেছে। আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসনের ক্ষেত্রে আলোচ্য ফরমানটি কতটা প্রাসঙ্গিক সেটাও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ