সোমবার ১৮ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

ক্ষমতাসীন আ’লীগের সমস্ত কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্যই লুটপাট

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিএনপি আয়োজিত বৈশ্বিক দুর্যোগ : ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও করণীয় শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইললাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমস্ত কর্মকান্ডের মূল লক্ষটাই হচ্ছে লুটপাট করা। লুট করা ছাড়া তাদের কোনো কর্ম আমি কিন্তু দেখতে পাইনা। বাজেটের মেগা প্রকল্পগুলোতে অর্থ বরাদ্দের সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই মেগা প্রজেক্টগুলো কেনো? হাজার হাজার কোটি টাকা সরকার প্রজেক্টে ব্যয় করছে, এই মেগা প্রজেক্টের জন্য এবারো দিয়েছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। যেটা এই মুহুর্তে প্রয়োজন নেই, সেটাই তারা করছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার দুপুরে এক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব এসব মন্তব্য করেন।
জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বিএনপির উদ্যোগে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে ‘বৈশ্বিক দুযোর্গ: ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও করণীয়’ শীর্ষক এই আলোচনা সভা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান এবং পরিবেশের ওপর তথ্য চিত্র উপস্থাপন করেন রাজশাহী প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ আক্তার হোসেন।
পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় বিশ্ব নেতৃবন্দ এবং রাজনীতিবিদের অঙ্গীকার প্রয়োজন মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজকের বাস্তবতা হচ্ছে পৃথিবী ধবংস হচ্ছে, ধবংসের দিকে যাচ্ছে। কারণটা হচ্ছে যে, আমরা আমরাই উন্নত দেশগুলো তারা তাদের স্বার্থে যে ইন্ডস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করেছে, কার্বন অমিশন করেছে, সেই কার্বন অমিশনের ফলে অলরেডি ওজ্ােন লেয়ারে ফুটো হয়ে গেছে। ফলে যে উষ্ণতা সৃষ্টি হচ্ছে পৃথিবীতে, সেই উষ্ণতার কারণে কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত ইকোলজিক্যাল সিষ্টেম, ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স যেটা, সেটা নষ্ট হয়ে গেছে। এখান এখানে যেটা দরকার হচ্ছে বিশ্বনেতাদের একটা কমিটমেন্ট। সেই কমিটমেন্ট নিয়ে বিশ্বনেতাদের পৃথিবীকে বাঁচানোর চেষ্টা করা। যেটা ইতিপূর্বে প্যারিস চুক্তিতে হয়েছিলো। ঠিক একইভাবে আমাদের দেশে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের বিশেষ করে সরকারে যারা থাকেন, তাদের কমিটমেন্টটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
বাজেটে পরিবেশ রক্ষায় বরাদ্ধ কত প্রশ্ন রেখে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকার জনগনের দ্বারা নির্বাচিত নয়, জনগনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই, জনগনের প্রতি তাদের কোনো দায়িত্ববোধও নেই। গত দুইদিন আাগে যে বাজেট দিয়েছে সেই বাজেটে আপনারা দেখেন তো কোথায় পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় কত টাকা বরাদ্ধ করা হয়েছে। বরাদ্ধ কি আছে?
তিনি বলেন, মজার ব্যাপার হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বব্যাংকের একটা ফান্ড আছে, সেই ফান্ড থেকে ওরা (সরকার) টাকাও পেয়েছিলো গত কয়েকবছর ধরে ৭শ কোটি টাকা। সেই টাকার অর্ধেক খেয়ে ফেলেছে, অর্ধেক ফেরত দিয়েছে। কাজ করতে পারে নাই। তাদের সমস্ত কর্মকান্ডের মূল লক্ষটা হচ্ছে-লুট করা। লুট করা ছাড়া তাদের কিন্তু কোনো কর্ম আমি কিন্তু দেখতে পাইনা।
বাজেটের মেগা প্রকল্পগুলোতে অর্থ বরাদ্ধের সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই মুহুর্তে আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষকে বাঁচানো। আমরা বার বার করে বলছি যে, কোবিডে মানুষকে বাঁচানোর জন্যে এই সময়ে দিন আনে দিন খায়-আমরা হিসাব করেছি যে, ৬ কোটি মানুষ দরিদ্র হয়ে গেছে। তাদেরকে যদি বাঁচাতে হয় তাহলে তাদের কাছে ক্যাশ ট্রান্সফার করতে হবে, তাদের কাছে টাকা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সেইদিকে কোনো লক্ষ্য নেই তাদের। তারা একটা হিসাব দিয়েছেন যে তারা ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ রেখেছেন।
নেতা-কর্মীদের সচেতন হবার আহবান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, পরিবেশ-প্রকৃতিকে রক্ষা মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দলের বন ও পরিবেশ বিষয়ক কমিটিকে পরামর্শ দিয়েছেন যে, প্রতিটি জেলায় ৫ হাজার করে নিম গাছ লাগাতে হবে। এটা একটা অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে আমরা মনে করি। আপনারা জানেন যে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সৌদি আরবে নিম গাছ নিয়ে গিয়েছিলেন। সৌদিআরবে এখনো সবাই নিমগাছকে ‘জিয়া ট্রি’ বলে জানে এবং জিয়াউর রহমানকেই তারা স্মরণ করেন। একটা কথা আমি আপনাদেরকে পরিস্কার করে বলতে চাই- কেউ হতাশ হবেন না। আমরা অনেক নেতারা হতাশার কথা বলি।। হতাশার কথা বললে বাঁচার কোনো পথ থাকবে না। সংগ্রাম-লড়াই কিন্তু চিরন্তন লড়াই। আপনাকে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
তিনি বলেন, আজকে একটা দুর্বত্ত সরকার, একটা দানব সরকার আমাদের সব অর্জনকে তচনচ করে দিচ্ছে, আমাদের স্বপ্নকে তচনচ করে দিচ্ছে। সেইখান থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে। সেজন্য আমাদেরকে একা একা হাত-পা ছুঁড়লে হবে না, পরিকল্পিতভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করতে হবে। হতাশাকে বাদ দিয়ে আশার আলো দিকে, সামনের দিকে এগুতে হবে। আমরা আশাবাদী, আমি বিশ্বাস করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা অবশ্যই এই সংগ্রামে জয়ী হবো। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অতি দ্রুত সুস্থ হবেন এবং তিনি সেই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, পরিবেশ দুষনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান যে কয়টি কারণ দেখায় তার একটা হলো দারিদ্র্যতা আরেকটি হলো অশিক্ষা। আমাদের দেশে অশিক্ষার কারণে কিন্তু পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে না, দারিদ্র্যতার কারণেও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে না। আমাদের দেশে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে দুর্নীতি পরায়ন পলিসির কারণে। অর্থাৎ পরিবেশকে সামনে রেখে লুটপাটের মধ্য দিয়ে স্বল্প সময়ে অর্থ এবং বিত্ত করায়াত্ত করা সেই কারণে।
তিনি বলেন, আজকে বলা হয়েছে এখানে যে, ফারাক্কা দিয়ে ৪০ কিউসেক পানি পাওয়া যায়নি। এর কারণ আছে। ফারাক্কা চুক্তিটাই শুভংকরের ফাঁকি। ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে পানি ৪০ কিউসেক দেবে। কিন্তু যেখান থেকে পানির উৎস থেকে ফারাক্কার পয়েন্ট পর্যন্ত কয়েক‘শ মাইলে কয়েক‘শ নদী আছে। সেই নদীর উৎস্যমুখ গুলোতে তারা ড্রেজিং করে প্রিজারভ পানিগুলোর গতি প্রবাহ পরিবর্তন করে দিচ্ছে। ফলে ফারাক্কা পয়েন্টে অটোমেটিক্যালি পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে, সেখানে পানি রিজার্ভ হচ্ছে না। ভারত তো চুক্তি অনুযায়ী মিথ্যা কথা বলেনি। তারা ফারাক্কা পয়েন্টের পানি হিসাব করে ৪০ শতাংশ দেবে। ফারাক্কায় তো কোনো পানিই আসে না, পানি আসবে না। এটাই হলো ভারতের চানকো বুদ্ধি। আমরা রাষ্ট্রের পরিবেশ যদি সংহত না হয়, আজকে যদি জনগণের অধিকার ফিরে না আসে, আর যদি জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা না করতে পারেন তাহলে প্রকৃতি বা পরিবেশ রক্ষা পাবে কিভাবে? খালেদা জিয়ার শাসনামলে পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক বনায়ন, নগর বনায়ন ও বাগান চর্চার বিভিন্ন কর্মসূচি তুলে ধরেন তিনি।
দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক পানি সম্পদ মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে নদী আছে ৫৫টা, ৫৪টা ভারতের মধ্য দিয়ে আসে। এই যে ভারতের মধ্য দিয়ে আসা প্রত্যেকটা নদীর ওপর ভারত অসংখ্য বাঁধ নির্মাণ করেছে। যার ফলে আমাদের পানির প্রাপ্যতা কমেই যাচ্ছে, কমেই যাচ্ছে, পানির প্রাচ্যতার কমে গেলে বঙ্গোপসাগরের লবনাক্ত পানি দেশের অভ্যন্তরে এসে কৃষিজমি নষ্ট করে ফেলে। ভারত যে নদীতে বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে আমাদের প্রাপ্য পানি বন্ধ করে রেখেছে এটা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনে বেআইনি। কিন্তু তারা করেই যাচ্ছে। এটা নিয়ে অন্য সরকার সবাই প্রতিবাদ করেছে, আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম প্রত্যেকদিনই প্রতিবাদ করতাম। এখন যে ভারত পানি আটকিয়ে রেখেছে এই সরকার কী কোনো প্রতিবাদ করেছে কোনোদিন? করে নাই। বাংলাদেশে কোনো পানি সম্পদ মন্ত্রী আছে বলে মনে হয়, কেউ নাম শুনেছেন? তার কোনো অ্যাকটিভিই নাই।
সোহরাওয়ার্দি উদ্যানকে ঢাকার ‘ফুসফুস’ অভিহিত করে তিনি বলেন, ভালো সরকার না থাকলে কি হয়। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের গাছগুলো কাটা হচ্ছে। এটা হলে ফুসফুস ঢাকা শহরেরে। আমি রমনা পার্কের পাশ দিয়ে যখন যাই তাঁকিয়ে দেখি- রমনা পার্কের গাছ কাটা শুরু হলো কিনা? সোহরাওয়ার্দি উদ্যান তো নিয়ে নিয়েছে তারা। আমি ৪০ বছর পর ভারতে গেছি। গড়ের মাঠের একটা গাছ কাউকে কাটতে দেখিনি। ওই একাত্তর সালে যেরকম দেখেছি সেইরকম আছে। কেউ হাতও দিতে পারে না। গণতান্ত্রিক সরকার থাকলে তারা নিজের দেশের সম্পদ ঠিকঠাক রাখে। আর লুটেরার  সরকার হলে তারা সব কিছু দিয়ে দেয়। কারণ তারা তো এদেশের থাকবে না, কয়েকদিন পরে চলে যাবে। পরিবার-পরিজন বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে তারা চলে যাবে। আমরা যারা গরীব গো-বেচারা আমরা সাফার করবো।
বিএনপির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের সভাপতিত্বে ও সহ সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় দলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, অধ্যাপক জামাল উদ্দিন রুনু এবং সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. ফরিদুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানের শেষে বিভিন্ন ব্যক্তিদের মাঝে নিম গাছের চারা বিতরণ করেন বিএনপি মহাসচিব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ