সোমবার ১৮ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

বড় বাজেটে বড় চাপ পড়বে মধ্যবিত্তের জীবন-জীবিকায়

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : প্রতি বছর বাজেটের আকারের পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে না সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যের। এ কারণে আর বাজেট নিয়ে উচ্ছ্বাস নেই সাধারণ মানুষের মধ্যে। জীনব-মানের উন্নয়ন হয় না দেখে অনেকে খোঁজও রাখেন না কি রকম বাজেট হলো। একটু সচেতন যারা তারা শুধু বাজেটের পর বাজারে গিয়ে জানতে চান কোন কোন জিনিসের দাম বেড়েছে। তারা ধরেই নিয়েছেন বাজেট মানেই জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। অতিরিক্ত খরচ বাড়বে। কিন্তু আয় না বাড়ায় কম খেয়ে খরচ কমাতে হবে। নতুন অর্থবছরে জাতীয় সংসদে পেশ করা বাজেটেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য কোনো সুখবর আসেনি। এতে তাদের আশঙ্কা বাজেটের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যাবে। এই বাড়তি মূল্য প্রকারন্তরে সবাইকে দিতে হবে। প্রত্যেক বাজেটেই ধনীরা উপকৃত হয় এবারও তাই হবে। সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় যেসব গরিব আছেন তারা ভাতা পাবেন। এর আওতা এবার বেড়েছে। তবে নতুন করে দরিদ্র হওয়া আড়াই কোটি মানুষের ব্যাপারে বাজেটে কিছু বলা হয়নি। একইসাথে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষদের জন্য কিছু কিছু দিক নির্দেশনা থাকলেও বাজেটে মধ্যবিত্তের জন্য কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে নতুন করে চাপ বাড়বে মধ্যবিত্তের জীবন-জীবিকায়।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৩ জুন) মহামারিকালের দ্বিতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার এই বাজেট অনেকটা গতানুগতিক হলেও ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে বাজেটে। আবার দরিদ্র ও অতিদরিদ্রের জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। এটি এখন লাখ কোটি টাকার ঘরে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিষয়ে বাজেটে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, এই শ্রেণিই মূলত দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কারোনার আগে থেকেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি চাপের মধ্যে রয়েছে। নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, শিক্ষা-চিকিৎসাসহ নানা খরচের চাপে তাদের ত্রাহি অবস্থা। এ অবস্থায় করোনা এক বড় অভিশাপ হয়ে আসে এই শ্রেণির মানুষের জন্য। বিশেষ করে মহামারির সময়ে সরকারি ও সামাজিক নানা উদ্যোগে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষ কিছুটা হলেও সহায়তা পাচ্ছেন। তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ না পারছেন চলতে, না পারছেন হাত পাততে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম জানান, যে বাজেট পেশ করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন এক বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেটে মিশ্রভাবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য দিকনির্দেশনা রয়েছে। তবে মধ্যবিত্তের জন্য কোনো নির্দেশনা নেই। বাজেটের পর এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ পণ্যের দাম ও সেবার মূল্য বাড়লে সবাইকে তা পরিশোধ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাজেটের পর ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে করোনাকালের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বরং বলা হচ্ছে ব্যবসা ও শিল্পের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোয় কর্মসংস্থান বাড়বে। এই সুবিধা সবাই পাবে। কিন্তু করোনকালে বন্ধ থাকা সরকারি চাকরিতে নিয়োগসহ অন্যান্য স্বায়ত্তশায়িত প্রতিষ্ঠানের শূন্য থাকা পদে নিয়োগ ও নিয়মিত জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি প্রস্তাবিত বাজেটে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যবসা ও শিল্প বিনিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষিত জনবলকে কাজে লাগাতে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াও সচল রাখতে হবে। এতে অন্তত কিছু পরিবারের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। ওদিকে করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি নিয়মিত আদায় করে যাচ্ছে। সন্তানদের নিয়ে হতাশায় থাকা অভিভাবকরা এই বেতন-ভাতা দিতে গিয়ে বাড়তি চাপ অনুভব করছেন। সরকারের তরফে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন ফি সমন্বয়ের কথা আগেই বলা হয়েছিল। কিন্তু এতো দিনেও তা কার্যকর হয়নি।
এ দিকে বাজেটের পর বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ক্রেতারা তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই পণ্যে দাম বেড়ে যায়। এতে প্রতিবারই লাভবান হয় একটা শ্রেণী। সরকার বড় অর্থের বাজেট দিলেও সাধারণ দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আসে না। গরিব আরো গরিব হচ্ছে, ধনীরা এই বাজেটকে কাজে লাগিয়ে নিজেরা সুবিধা নিচ্ছে। করোনার সময়ে আয় বাড়ছে না। বরং কমেছে। এই অবস্থায় নতুন বাজেট আসায় কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়বে। এতে বাড়তি চাপ আসবে। হাসিব নামের এক ক্রেতা বলেন, দেশে করোনার মহামারি চলছে। এই সময়ে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতেও সরকার দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট উপস্থাপন করেছে। বাজেট নিয়ে দেশের মানুষ অনেক বড় স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু গরিব ও নিম্নবিত্ত এবং কৃষকদের এসব নিয়ে ভাবনা নেই। তারা বাজেট থেকে কিছুই পান না। সাধারণ মানুষের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার মতো বাজেট বাস্তবায়ন হলে দেশে উন্নয়ন ঘটবে। সরকারকে এই বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আজিবার নামের আরেক ক্রেতা জানান, প্রতি বছর বড় বড় বাজেট ঘোষণা হয়। আর এই বাজেটের চাপে পড়েন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। বাজেট ঘোষণা হলে প্রতিটি পণ্যে দাম বাড়ে। বাড়ে ট্যাক্স। কিন্তু গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয় বাড়ছে না।
জানা গেছে, নতুন বাজেটের বাজেটের আকার প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এরমধ্যে ঘাটতি রয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৭ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা বাজেটের ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। এর আগে, ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় খাতে বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা, যা ২০২০-২০২১ অর্থবছরে প্রায় ৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। নতুন বাজেটে তা লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর মোট বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ ভাতা হিসেবে পাবেন বয়োবৃদ্ধ, বিধবা, শারীরিকভাবে অক্ষম ও সহায়সম্বলহীন জনগোষ্ঠী। এক্ষেত্রে সুবিধাপ্রাপ্তদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের স্বতন্ত্র ভাতার পরিমাণ বাড়েনি। বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকাদের সঙ্গে অতিরিক্ত আরও আট লাখ বয়োবৃদ্ধ, ৪.২৫ লাখ বিধবা ও সহায়সম্বলহীন নারী এবং ২.০২ লাখ শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি এই কর্মসূচির আওতায় আসছেন। শ্রেণি বিভাজন অনুসারে তারা মাসিক ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা ভাতা পাবেন। বর্তমানে মোট ৯৮ লাখ জন এসব ভাতা পাচ্ছেন। তবে সিংহভাগ অর্থ যাবে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর ভাতা প্রদান, সঞ্চয়পত্রের সুদ এবং এমনকি প্রণোদনার জন্য দেয়া ঋণের সুদ সমন্বয়ে। এসব প্রণোদনা ঋণ পেয়েছিলেন বড় বড় ব্যবসায়ীরাই। সামাজিক সুরক্ষা জালের আওতায় থাকা দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা অবশ্য বেড়েছে। আগে তারা ১২ হাজার টাকা করে পেলেও প্রস্তাবিত বাজেটে জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে, এজন্য বাড়তি ২,০০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।
এদিকে মহামারি করোনাভাইরাসের প্রভাবে একরকম অচল হয়ে পড়েছে পুরো দেশ। সংক্রমণ এড়াতে একদিকে যেমন দেয়া হচ্ছে লকডাউন, তেমনি এ লকডাউনে উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে অগণিত মানুষের। তাই বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। সেই সূত্র ধরেই একটি ভয়ঙ্কর তথ্য উঠে এসেছে সম্প্রতি শেষ হওয়া একটি সমীক্ষা থেকে। করোনার প্রভাবে এবার নতুন করে আড়াই কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বি আইজিডি) এক যৌথ সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত এপ্রিলে ভার্চুয়াল সাংবাদিক সম্মেলনে প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, কোভিডের আঘাতে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। জরিপে যারা সাধারণত দারিদ্র্যসীমার উপরেই বসবাস করেন, কিন্তু যে কোনো অভিঘাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন, তাদের ‘নতুন দরিদ্র’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ সংজ্ঞামতে, ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে এই ‘নতুন দরিদ্র’ শ্রেণির সংখ্যা জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়েছে, ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত যা আগে ছিল ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে ‘নতুন দরিদ্র’ মানুষের সংখ্যা বেশি। এ বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে ‘নতুন দরিদ্র’ মানুষের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ৪৪ শতাংশ।
নতুন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১৩ শতাংশ বা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, নতুন করে এর আওতায় আসছেন ১৪ লাখ নাগরিক। কিন্তু, নতুন করে দরিদ্র হওয়া বাকি আড়াই কোটি নাগরিককে সাহায্যের ব্যাপারে বাজেটে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।   
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও প্রকট করে তুলতে পারে। গত বছর সাধারণ ছুটির সময় মানুষকে মানবিক সহায়তা দিতে বেসরকারি সংস্থাগুলো নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। সেসব উদ্যোগ এখন আর তেমন দেখা যায় না। হোসেন জিল্লুরের মতে, নতুন দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ঢেলে সাজানো দরকার। কভিডকালে সামাজিক সুরক্ষা নামমাত্র ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু এটিকে এখন অগ্রাধিকার দেয়া দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ