শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

দুধের উৎপাদন বাড়াতে হবে

দুধ মানুষের অতি প্রিয় পানীয়। এটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়িয়ে শরীরকে রোগমুক্ত রাখে। দুধের অপরিহার্য উপাদান ল্যাকটোজ, যা দৈহিক গঠন, বিকাশ ও মেধা বৃদ্ধিতে সহায়ক। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ক্যানসার ও হৃদরোগ প্রতিরোধে দুধের শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে। তাই সুস্থ থাকার জন্য প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজনীয় পরিমাণ দুধ পান করা দরকার। কিন্তু জনসংখ্যা অনুসারে আমাদের দেশে দুধের প্রাপ্যতা পর্যাপ্ত নয়। যা আমাদের জনস্বাস্থ্যের নেতিবাচক দিক।
আমাদের দেশে যে পরিমাণ দুধ উৎপাদন হয় জনসংখ্যা অনুপাতে তা বেশ কম। তাই জনস্বার্থে ও জাতীয় স্বাস্থ্য রক্ষায় দুধের প্রাপ্যতা বাড়ানো দরকার বলেই মনে করেন পুষ্টিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও ডেইরি সংশ্লিষ্টরা। এজন্য দেশে দুধের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। যা খুবই প্রয়োজনীয় ও যুক্তিযুক্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতে, সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষকে গড়ে দৈনিক ২৫০ মিলিলিটার দুধ পান করা দরকার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশের দুধের উৎপাদন বেড়েছে চার গুণের বেশি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব মতে, দেশে বার্ষিক দুধের চাহিদা ১৫২ লাখ মেট্রিক টনেরও অধিক। কিন্তু দেশে উৎপাদন হয় ১০৬ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পরিমাণ দুধ।
প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, দেশে মাথাপিছু প্রাপ্য দুধের পরিমাণ ১৭৫ মিলিলিটারের বেশি। অধিদপ্তরের এই হিসাব অনুযায়ী ২৫০ মিলিলিটার দুধ খাওয়ার মানদণ্ডের সঙ্গে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে ৭৫ মিলিলিটার। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবের সাথে এই হিসাবের যথেষ্ট গরমিল রয়েছে। বিবিএসের ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, মাথাপিছু দৈনিক দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য গ্রহণের পরিমাণ ২৭ গ্রামের কিছু বেশি। যা আরও কম।
আমাদের দেশে মাথাপিছু দুধপানের হার যেমন কম, তেমনি উৎপাদনও পর্যাপ্ত নয়। আইডিআরএন ও আইএফসিএন-ডেইরি রিসার্চ নেটওয়ার্কের তথ্য অনুসারে, বৈশ্বিকভাবে খামারপ্রতি দুধের উৎপাদন সাত টন। বাংলাদেশে এ হার দুই টন। ঘাটতি ৭১ শতাংশ। আমাদের দেশে গাভিপ্রতি বার্ষিক দুধ উৎপাদিত হয় ১ দশমিক ১ টন। আর বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ উৎপাদন ২ দশমিক ৩ টন। বিশ্বে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের বার্ষিক ব্যবহার ১১৬ কেজি ৫০০ গ্রাম। সেখানে বাংলাদেশে এ হার ৪৯ কেজি। আর এই পরিসংখ্যান আমাদের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়।
আমাদের দেশে নানা কারণেই দুধের উৎপাদন কাক্সিক্ষত পর্যায়ের নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গোখাদ্যে বিপুল ব্যয়ের কারণেই উৎপাদন খরচ অনেক বেশি হয়। দেশে প্রতি কেজি গমের দাম ২২ থেকে ২৬ টাকার বেশি হয় না। কিন্তু এই গমের উপজাত ভুসির দাম কেজিতে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। গোখাদ্যের আমদানি হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে। বাংলাদেশে গোখাদ্যের দাম বৈশ্বিক মানদণ্ডে ৭০% বেশি। যা দুগ্ধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায়।
দেশে দুধের প্রায় ৬৫ শতাংশের সরবরাহকারী খামারিরা। তারা সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করেন। আবার তাঁদের কাছ থেকে দুধ নিয়ে সরবরাহ করে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান। এরা মোট চাহিদার ৫ শতাংশের মতো মেটাতে পারে। এমতাবস্থায় দেশ-জতির বৃহত্তর স্বার্থে ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় জাতীয় প্রয়োজনের আলোকে দুধের উৎপাদন বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। আর এক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সবার আগে সেসব দূর করতে হবে।
আর দুধের মূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য গোখাদ্যের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা দরকার। উৎপাদন বৃদ্ধি ও খামারিদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার জন্য সহজশর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় ভর্তূকী দেয়ার কথাও ভাবতে হবে। অন্যথায় দেশের বিশাল দুধের চাহিদা কোনভাবেই পূরুণ করা সম্ভব হবে না; ঝুঁকিমুক্তও হবে না আমাদের জনস্বাস্থ্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ