মঙ্গলবার ০৩ আগস্ট ২০২১
Online Edition

জমিদার দর্পণ সমাজবাস্তবতার ধারাভাষ্য

ইনামুল করিম: মীর মোশাররফ হোসেনের ‘জমিদার দর্পণ’ নাটকের আলোচনা করতে গিয়ে বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেন যে, বঙ্গ দর্শনের জন্মাবধি এই পত্র প্রজার হিতৈষী এবং প্রজার হিত কামনা আমরা কখনো ত্যাগ করিব না। কিন্তু আমরা পাবনা জিলার প্রজাদিগের আচরণ শুনিয়া বিরক্ত ও বিষদযুক্ত হইয়াছি। জ¦লন্ত অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেওয়া নিষ্প্রয়োজনীয়। আমরা পরামর্শ দিই যে, গ্রন্থাকারের এসময়ে এ গ্রন্থ বিক্রয় ও বিতরণ বন্ধ করা কর্তব্য। “বঙ্কিম চন্দ্রের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, ‘জমিদার দর্পণ’ নাটকটি ঐ সময়ে সাধারণ প্রজাদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলেছিল। এ প্রভাবের ফলে প্রজারা জমিদারদের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেচিল। প্রজাদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলার কারণ কি? কারণ হলো ‘জমিদার দর্পণ’ এর বক্তব্যে তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রস্ফুটিত হয়েছে। বস্তুত ‘জমিদার দর্পণ’ বৃটিশ শাসক শ্রেণী কর্তৃক প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত তথা জমিদারি ব্যবস্থার বাস্তবতাকে ধারণ করেছে।

একজন সাহিত্যিক তার সৃজনশীল ক্রিয়ায় সমকালীন বাস্তবতাকে এড়িয়ে যেতে পারেন না। সেটা ‘জমিদার দর্পণ’ এ প্রস্ফুটিত। এনাটকের মাধ্যমে মীর মোশাররফ হোসেন তার সমাজ মনস্কতার সবুজ ফসল উৎপাদন করেছে। এখানে তিনি সমকালীন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতক বাস্তবতা পুনঃনির্মাণ তথা এর ভাষ্য নির্মাণ করেছেন।

ভারতীয় উপমহাদেশে

ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসক শ্রেণীর প্রতিনিধি লর্ড কর্ণওয়ালিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফল জমিদারি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার দুটি কেন্দ্রীয় চরিত্র জমিদার ও প্রজা। এ ব্যবস্থা জমিদার যেমন নিজেকে জমিদারীর মালিক মনে করতেন তেমনি প্রজাকেও মনে করতেন তার নিজস্ব সম্পদ। শুধু প্রজা নয়, নারীদেরকেও মনে করা হতো জমিদারের সম্পদ। জমিদার শ্রেণীর প্রজা সাধারণ ও নারীদের উপর শোষণ ও নির্মাতনের বস্তুনিষ্ঠ ধারাভাষ্য ‘জমিদার দর্পণ’। জমিদার শ্রেণীর শোষণ ও নির্যাতনের স্বরূপ উন্মোচনে নিজস্ব অভিজ্ঞতালব্ধ এক সত্য ঘটনার ভিত্তিতে মীর মোশাররফ হোসেন এই নাটক রচনা করেন। নাটকের সূত্র ধরের বক্তব্যে এই সত্য ঘটনার ইঙ্গিত রয়েছে। 

‘জমিদার দর্পণ’ নাটক যে নক্সাটি এঁকেছে তার কিছুই সাজানো নয়, অবিকল ছবি তুলেছে।” কার্যত ‘জমিদার দর্পণ’ উনিশ শতকের কৃষক শ্রেণীর জীবনধারার উপর ভিত্তি করে রচিত ঐ শতাব্দের একটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম।

২. তিন অঙ্কে বিভক্ত ‘জমিদার দর্পণ’ নাটকটি প্রতিটি অঙ্কে রয়েছে তিনটি করে দৃশ্য। নাটকটির সূচনায় প্রস্তাবনা এবং সমাপ্তিতে রয়েছে উপসংহার নামে দুটি দৃশ্য। অর্থাৎ নাটকটি মোট এগারটি দৃশ্যের সমন্বয়ে গঠিত। এর কাহিনী সরল, এক রৈখিক ও উদ্দেশ্যমূলক। জমিদারি প্রথা ও জমিদার শ্রেণীর স্বরূপ উন্মোচনই এ নাটকের মৌল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি সেখানে রয়েছে বৃটিশ শাসনের প্রহসনমূলক বিচার ব্যবস্থার চিত্র। কার্যত বৃটিশ শাসক শ্রেণীর হাতে সৃষ্ট জমিদার শ্রেণীর চরিত্র এ নাটকের প্রস্ফুটিত:- সূত্র (ক্ষণকাল নিস্তব্ধ) আচ্ছা মফস্বলে একরকম জানোয়ার আছে জানেন। তারা কেউ শহরে বাস করে, শহরে কুকুর, কিন্তু মফস্বলে ঠাকুর। শহরে তাদের কেউ চেনেনা। মফস্বলে দোহাই ফেরে। শহরে কেউ কেউ জানে যে, এ জানোয়ার বড় শান্ত, বড় ধীর, বড় ন¤্র, হিংসা নেই, দ্বেষ নেই, মনে দ্বিধা নেই, মাছ মাংস ছোঁয়না কিন্তু মফস্বলে শ্যাল, কুকুর, গরু পর্যন্ত পার পায়না। বলবো কি জানোয়াররা আপন আপন বনে গিয়ে একবারে বাঘ হয়ে বসে।——এর আবার দুই দল

নট- দল আবার কেমন?

সূত্র- যেমন হিন্দু আর মুসলমান।

নট- ঠিক বলেছেন। ঐ দলের এক জানোয়ার যে কি কুকা- করেছিল, সেকথা মনে হলে এখনও পিলে চমকে ওঠে। এখনও চক্ষে জল এসে পড়ে। উ: কি ভয়ানক।” (প্রস্তাবনা) বস্তুত এরকম এক জানোয়ার জমিদার হায়ওয়ান আলীর কার্যকলাপ নিয়ে ‘জমিদার দর্পণ’ গড়ে উঠেছে। কোশলপুর গ্রামের জমিদার হায়ওয়ান আলীর প্রজা নির্যাতন, শোষণ এবং তার লাম্পট্য উচ্ছৃঙ্খলতা এ নাটকের মূল বিষয়বস্তু। হায়ওয়ান আলীর জমিদারির অন্তর্গত নিরীহ দরিদ্র কৃষক আবু মোল্লা। তার যুবতী স্ত্রী নূরুন্নাহারের শরীরের উপর ভোগ করার জন্য প্রথমে কৃষ্ণমনির মাধ্যমে তার নিকট প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু নুরুন্নাহার জমিদারের অনৈতিক ও অবৈধ  প্রস্তাব প্রত্যাখান করে। এত হায়ওয়ান আলী ক্ষিপ্ত হয়ে আবু মোল্লাকে ধরিয়ে আনে ও জমিদার বাড়িতে আটকে রাখে। স্বামীকে মুক্ত করতে গেলে নূরুন্নাহারকে স্বামীর মুক্তির বিনিময়ে জমিদারের শয্যাসঙ্গী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু নূরুন্নাহার তাতে রাজী হয়নি। পলে পেয়াদা দিয়ে নূরুন্নাহারকে ধরিয়ে আনা হয়। নূরুন্নাহারের উপর শুরু হয় কামুক হায়ওয়ান আলীর যৌন নির্যাতন। অন্তঃসত্ত্বা নূরুন্নাহারের উপর জমিদারের মাত্রাতিরিক্ত যৌন নির্যাতনের কারণে মৃত্যু ঘটে। বন্দী থাকারা কারণে আবু মোল্লা তার স্ত্রীর উপর যৌন নির্যাতন ও এর পরিণতি সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ