বৃহস্পতিবার ০৫ আগস্ট ২০২১
Online Edition

গৃহশিক্ষক 

মোহাম্মদ আবদুর রহমান

রুহুল একজন জনপ্রিয় গৃহশিক্ষক। এলাকার প্রায় সকল মানুষ তাকে এক বাক্যে চিনে। কারণ এলাকার এমন কোন বাড়ি নেই যে বাড়িতে তার ন্যূনতম  একটি ছাত্র নেই। তাই যে কোন সামাজিক অনুষ্ঠান হলে তাকে ডাকে। একজন সরকারি শিক্ষক থেকে বেশি মর্যাদা পায়। আর সেই মর্যাদাকে ধরে রাখার জন্য সব সময় সচেতন থাকে। তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাত জন। বাবা-মা, দুই ছেলে, এক মেয়েসহ তারা স্বামী ও স্ত্রী। ছেলে মেয়েরা সব বেসরকারি স্কুলে পড়াশুনা করে তাতে অনেক খরচ হয়। আর তার বাবা গুরুতর অসুস্থ । প্রতি মাসে তার বাবাকে দুই একবার করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয়। তার যা আয় তা থেকে কোন কোন মাসে সামান্য কিছু সঞ্চয় হলেও আবার কোন কোন মাসে ঘাটতি হয়, তখন সে সব সঞ্চিত অর্থ ব্যবহার করে।

রুহুল কোন দিন কারো কাছে ঋণ করতে ভালোবাসে না। সব সময় বটবৃক্ষের মতো মাথা উঁচু করে থাকে। হাজার ঝড়ও নোয়াতে পারেনি তাকে। কয়েক বছর আগে একটি দুর্ঘটনায় তার বাম হাত ভেঙে গেছিল। তার জন্য দুই মাস ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে পারেনি। তাতে তার অনটন হলেও কাউকে বুঝতে দেয়নি। তার স্ত্রীর কানের দুল বিক্রি করে কোনরকম সংসার চালান। তার স্ত্রীও তার মতো পর্দার অন্তরালে অভাবকে জয় করে এগিয়ে যেতে চায় জীবনের পথ। রুহুল কোন সময় ভেঙে পড়লে স্ত্রী সব সময় পাশে থাকে। বারবার সান্ত¦না দেয় একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। করোনা ভাইরাসের জন্য সারা দেশজুড়ে বন্ধ হয়েছে স্কুল, পড়ানোর কাজ। অর্থাৎ বন্ধ হয়েছে রুহুলের উপার্জন। তার মাথার উপর চেপে বসেছে হতাশার পাহাড়। আর যত দিন যাচ্ছে ততই যেন অভাব আঁকড়ে ধরছে তার পরিবারকে। এভাবে কোন রকম চলে এক মাস। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। তার চোখের সামনের সব কিছু যেন অন্ধকার লাগছে। সে দেখতে পায় না কোন উপায়।

অনেক রাতের প্রায় সময় কেটে যায় নিদ্রাহীন অবস্থায়। আজকের রাত যেন অন্যান্য রাতের থেকে বেশি বড় মনে হয়। মনে হয় ঘড়ির কাটাগুলো বিশ্রাম নিতে শুরু করেছে। রুহুলের বুকের ভেতরে বাজে সেই কথা অভাবের জন্য তার স্ত্রীর সকল অলঙ্কার বিক্রি করে দিয়েছে। পাঁচ মাস আগে ছেলেদের জন্য একটি ঘর তৈরি করার সময় তার স্ত্রীর গলার মালা বিক্রয় করে। তার স্ত্রী বর্তমানে সব কসমেটিক গয়না পড়ে আছে। সব বুঝে হয়ত সোনার। কৃষিজমিও নেই যা বিক্রি করবে। হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আর সে বিড় বিড় করে বলে-জীবনে বেঁচে থেকে লাভ কি? আত্মহত্যা করাই ভালো।

তা শুনে ঘুম ভেঙে যায় তার স্ত্রীর। আর বলে- বিড় বিড় করে কি বলছ?

রুহুল হকচকিয়ে বলে- না কিছু না।

তার স্ত্রী বলে- তুমি এখনও ঘুমাওনি?

রুহুল একটু মৃদু স্বরে বলে- আসলে ঘুম আসছে না। কি করে ঘুম আসবে বলো। এভাবে কিছুদিন চললে তো না খেয়ে মরব। তার থেকে আত্মহত্যা করা উচিত।

তার স্ত্রী হতবাক হয়ে যায়। সে ভাবতে পারেনি রুহুল এরকম কথা বলবে। সে রুহুলের হাত ধরে বলে-তুমি এমনভাবে ভেঙে পড়বে আমি ভাবতে পারিনি। তোমার কিছু হলে আমাদের কি হবে ভেবে দেখেছ একবার । কিছু না কিছু পথ তো আছে।

-তুমিই বলো আমি কি করতে পারি ?

-কিছু ব্যবসা করো ।

-কি আর ব্যবসা করব? ব্যবসা করলে অনেক টাকা লাগবে। 

-এখন সবজির ব্যবসা করলে কেমন হয়?

-আমি একজন মাস্টার হয়ে সবজির ব্যবসা করব। তুমি কি করে একথা বলতে পারলে?

-যারা ব্যবসা করে তারা কি মানুষ নয়? তাহলে ভিক্ষা করো।

-ঠিক আছে ভাবা যাবে। এখন ঘুমাও, অনেক রাত হয়েছে। রুহুল অনেক ভাবার পর স্থির করল অন্যের কাছে হাত পাতার থেকে ব্যবসা করা অনেক ভালো। এ সময় সবজি চড়া দামে বিক্রি হয়। তাই সে স্ত্রীর কথাকে সঠিক মনে করল। কারণ সবজি ব্যবসা করার জন্য বেশি টাকা দরকার হয় না। আর লকডাউনে এই ব্যবসা ছাড়া অন্য কোন ব্যবসা বেশি চলে না। পরের দিন সকালে  মুখে মাস্ক পরে চলে যায় বাজারে। তাকে বাজারে সবজি বিক্রি করতে দেখে অনেকে আশ্চর্য হলো। কিন্তু তার ছাত্ররা ঠিক বুঝেছে স্যার কারও কাছে হাত পাততে পারে না। তাদের পড়াবার সময় সে বারবার বলত, ভিখারির মতো কারও কাছে হাত পাতার চেয়ে ডোমের কাজ করা অনেক ভালো। সব ছাত্ররা জানে তাঁর জীবনের পথ চলা এক   আপসহীন সংগ্রাম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ