বৃহস্পতিবার ০৫ আগস্ট ২০২১
Online Edition

শাহ আবদুল হান্নান ছিলেন বাংলাদেশে অর্থনীতির মুক্তিসূর্য 

সাঈদ চৌধুরী: বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ শাহ আবদুল হান্নান ছিলেন বাংলাদেশে অর্থনীতির মুক্তিসূর্য। যুগন্ধর প্রতিভার এই মানুষ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের অন্যতম উদ্যোক্তা ও সাবেক চেয়ারম্যান, দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের চেয়ারম্যান, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম উদ্যোক্তা-প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ছিলেন। 

১৯৮৯ সালে প্রথম তাঁর মুখোমুখি হই। দিনটা যতদূর মনে পড়ে ১ আগস্ট। আমার অন্তরে এই মানুষটি সেদিনই জায়গা করে নিয়েছিলেন। প্রথম দিনের কথাগুলো আজও মনে রয়ে গিয়েছে। আল ফালাহ ভবনের তৃতীয় তলায় ইসলামী স্কলারদের সাথে অর্থনীতি বিষয়ে এক বিশেষ আলোচনা ছিল। ইসলামী ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান মরহুম মুহাম্মদ ইউনুছ আমাকে সেখানে নিয়েছিলেন। 

সেদিনের প্রায় প্রতিটি কথা বার বার মনে পড়ে। এরপর যতবার দেখা হয়েছে, কী আপন হৃদয়তা দিয়ে তিনি কাছে টানতেন। খুব সহজে সবাইকে আপন করে নিতেন তিনি। সেই মমতাভরা চেহারা আজ বাক্সময় হয়ে উঠেছে হৃদয় কোণে।

আশির দশকে পারিবারিক ব্যবসায় যখন সাউদী আরব ছিলাম তখন মুহাম্মদ ইউনুছের সাথে আমার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। ’৮৫ সালের এক ঐতিহাসিক ক্ষণে আবহা থেকে পবিত্র মক্কা হয়ে মদীনায় এসে পৌছি। আমাদের জন্য অপেক্ষমান ছিলেন ভাইজান মাওলানা রশীদ আহমদ চৌধুরী। তিনি মদীনায় ব্যবসা পরিচালনা করেন। তখন আমাদের পারিবারিক মূল ব্যবসা খামিস মতির মাহাইল আল আবহা।

বড় ভাইজান ডা. শাব্বির আহমদ চৌধুরী ১৯৭২ সাল থেকে সাউদী আরবে বসবাস করেন। প্রায় এক যুগ ছিলেন মক্কা মুকাররমায়। তারপর চলে যান মদীনা মুনাওয়ারায়। খামিস মতির বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে, খুব বেশি দিন হয়নি। সেখানে তিনি আমাদের কন্সট্রাকশন ব্যবসা তদারকি করেন। মেঝো ভাইজান হাফেজ মাসউদ আহমদ চৌধুরী ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও গাওয়া দেখাশোনা করেন। সেঝো ভাইজান মাওলানা ফায়্যাজ আহমদ চৌধুরী ওয়েল্ডিং এবং আমি ওয়ার্কশপ এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট পরিচালনা করি।

বাদশাহ ফাহাদ আসবেন মদীনা মুনাওয়ারায়। তিনি আসছেন খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন উপাধি ধারণ করে অর্থাৎ কাস্টোডিয়ান অফ টু হলি মস্কস বা দুই পবিত্র মসজিদের অভিভাবক হিসেবে। হিজ ম্যাজেস্টি উপাধি বাদ দিয়ে নতুন উপাধি গ্রহণের পর এটি তাঁর প্রথম মদীনায় আগমন। বাদশাহ ফাহাদকে কাছ থেকে দেখা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স পরিদর্শন এবং মক্কা-মদীনা জিয়ারত ও সরেজমিন ফিচার তৈরী করাই ছিল আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। 

বিশ্বব্যাপী পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ চর্চা ও অনুশীলন ছড়িয়ে দেয়ার ব্রত নিয়ে সে বছর (১৯৮৫ সালে) ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে মদীনায় এ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেছেন বাদশাহ ফাহাদ। যেখান থেকে অনুবাদ ও অনুবাদ ছাড়া দু’ধরনের কুরআন মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়। অন্ধজনও যাতে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারেন সেজন্য রয়েছে ব্রেইল পদ্ধতির সংস্করণ। এ প্রকল্পে বিশুদ্ধ তেলাওয়াতের অডিও ও ভিডিও ফর্মে কুরআনের সিডি, ডিভিডি তৈরি ও সরবরাহ করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৭ কোটি কুরআন ছেপে বিশ্বব্যাপী বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে সাউদি আরবের সাবেক রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আব্দুল হামিদ আল খতীব কর্তৃক আমন্ত্রণের সুযোগ পেয়ে নিজেকে খুব প্রসন্ন মনে হল। এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে মুহাম্মদ ইউনুছও ছিলেন। খতীবের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে মন। ইসলামী ব্যাংক, ইবনেসিনা হাসপাতালসহ বাংলাদেশে তার অনেক সৃষ্টিশীল কর্মকান্ড ইতিহাস হয়ে আছে। তারপরও একজন রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাকে যেভাবে জেনেছি, সেদিন মনে হল তিনি তার চেয়ে অনেক বড় মাপের মানুষ।

ইসলামী ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইউনুছ ছিলেন শাহ আবদুল হান্নানের খুবই আপনজন। ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সফল সংগঠক ছিলেন। তিনি যখন সেক্রেটারি জেনারেল তখন থেকেই পরস্পরে ঘনিষ্ঠ। ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় তাঁরা আরো কাছে এসেছিলেন। দু’জনেই ইন্টেলেকচুয়াল পর্যায়ে কাজ করেছেন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্যে। তখন ইসলামিক ইকোনোমিকস রিসার্চ ব্যুরোর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিং ভাবনার ভিত্তি রচনা হয়। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের অন্যতম পথিকৃত এম আজিজুল হক ছিলেন একাজের অন্যতম নিয়ামক। 

মূলত মুহাম্মদ ইউনুছ প্রায়ই শাহ আবদুল হান্নান সম্পর্কে কথা বলতেন। আর তাঁর মাধ্যমেই এই ক্ষণজন্মা পুরুষের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। শাহ আবদুল হান্নানকে যারা কাছে থেকে দেখেছেন, কেবল তারাই বলতে পারবেন তিনি কেমন মানুষ ছিলেন। স্বভাবের মৌলিক কাঠামো ও রকম অন্য আর দশজনের মত নয়। একবারে নির্মোহ, নির্লোভ ও নিরহংকারী বলতে যা বুঝায়। শিক্ষাবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি মুসলিম বিশ্বে ব্যাপকতা লাভ করেছিলেন। লেখক হিসেবে দেশকালের সীমানা ছাড়িয়ে গেছেন। যেখানে ঋদ্ধ হতে হয় ভিন্ন এক পাঠ-অভিজ্ঞতায়। 

ইস্কাটন গার্ডেন রোডের তাঁর সরকারি কোয়াটারে এবং গোড়ানের বাসায় বহুবার গিয়েছি। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন-যাপন করতেন। পরিচয়ের পর থেকে প্রায়ই শাহ আবদুল হান্নানকে ঘিরে এক ধরনের আলোর বিকিরণ অনুভব করতাম। ২০০০ সালে লন্ডন আসার পরও যোগাযোগ রক্ষার চেষ্টা করেছি। ২০০১ সালে সাপ্তাহিক ইউরো বাংলা প্রতিষ্ঠার খবর পেয়ে তিনি খুব খুশী হয়েছেন এবং নিয়মিত তাঁর লেখা আমরা প্রকাশ করেছি।

শাহ আবদুল হান্নান অর্থনীতি ও সমাজ সংস্কার বিষয়ে আশ্চর্যময় দিক নির্দেশক। প্রতিটি বিষয়ে বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত যৌক্তিকতা দিয়ে লিখেছেন একের পর এক প্রবন্ধ ও নিবন্ধ। তাঁর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের ধারালো রচনাশৈলী পাঠকের হৃদয় ছুঁয়েছে। এতে প্রচারের আতিশয্য নেই, বরং আছে নিখাদ অনুভবের আলপনা। বহুবার তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছি। গভীর বিশ্লেষণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাও বর্ণনা করেছেন। মননশীল আলোচক হিসেবে তাঁর কথা বলার ধরন খুবই আকর্ষণীয়। আলোচনার মাঝে জীবন থেকে নেয়া রসালো গল্প বলার ক্ষমতা আজও মনে পড়ে। 

শাহ আবদুল হান্নান ছিলেন সৃজনশীল মানুষ। প্রভাব বিস্তারকারী লেখক। তাঁর গ্রন্থসমূহ এবং আত্মজীবনী ‘আমার কাল, আমার চিন্তা’ পড়লে তাকে কিছুটা উপলব্ধি করা যাবে। অন্তরের তাগিদে লেখা। যে ইন্সপাইরেশন বহু মানুষের জীবনে প্রভাবক হয়ে উঠেছিল। লেখাগুলো টেনে নেয় শিকড়ের কাছাকাছি। তরুণ প্রজন্ম আত্মপ্রত্যয়ী হয় এই লেখা থেকে। বর্তমানের সাথে অতীতকে মিলিয়ে দেখার সুযোগ করে দেয় এ লেখাগুলো। বহুদিন পরেও তাঁর বইয়ের পাতা ওল্টালে লেখাগুলোকে হয়তো অন্য রঙে আবিষ্কার করবেন পাঠক। 

২০১৪ সালে বিশ্বসেরা ১০০০ ব্যাংকের তালিকায় মনোনীত হয় বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’। বৃটেনের শতাব্দী প্রাচীন আর্থিক ম্যাগাজিন ‘দি ব্যাংকার’ বিশ্বের এক হাজার শীর্ষ ব্যাংকের তালিকায় প্রথম বারের মতো বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের নাম অন্তর্ভুক্ত করে। এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় জড়িতের মধ্যে তখন শাহ আবদুল হান্নানের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তিনি বলেছিলেন, ১৯৭৪ সালে সেনেগালের রাজধানী ডাকারে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) চার্টারে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশসহ ২৮টি মুসলিম দেশ। পর্যায়ক্রমে নিজেদের দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ইসলামী মডেলে ঢেলে সাজাবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয় সে চার্টারে। আর তখন থেকেই ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন জাগে তাঁদের মনে। 

ইসলামী ব্যাংকের কর্ণধারদের কথা স্মরণ করে শাহ আবদুল হান্নান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর এবং পূবালী ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর এম খালেদ ছিলেন প্রথম উপদেষ্টা। শিল্প ব্যাংক এবং রূপালী ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর এম এ করিম ছিলেন প্রথম এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট। সোনালী ব্যাংক থেকে এসে যোগ দেন আযীযুল হক ও এএফএম গোলাম মোস্তফা। অগ্রণী ব্যাংক থেকে ইউসুফ চৌধুরী। তাদের নিয়ে প্রথম ব্যবস্থাপনা টীম কাজ শুরু করে। এছাড়া শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে কাজ করেছেন সোনালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর লুৎফর রহমান সরকার, অগ্রণী ব্যাংক থেকে এসে যোগদানকারী কামাল উদ্দীন চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আবদুর রকিব প্রমুখ।

শাহ আবদুল হান্নান বাংলাদেশে ইসলামী অর্থনীতিকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। কল্যাণমুখী কার্যক্রমের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮৩ সালে যাত্রা শুরু করে ইসলামী ব্যাংক। এই ব্যাংক সফল হওয়ায় অনেক ব্যাংকই এখন ইসলামী পদ্ধতির ব্যাংকিংয়ে এসেছে। দুটি ব্যাংক প্রচলিত ধারা থেকে ইসলামী পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সারা দুনিয়াতে এ ধারার ব্যাংকিং চালু হচ্ছে। বিভিন্ন বহুজাতিক ব্যাংকও এখন ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে।

অভিনব জীবনবোধের অধিকারী শাহ আবদুল হান্নান তাঁর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় অমর হয়ে থাকবেন। জীবনকে অনুভবের জন্য তাঁর এক অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা ছিল। সমাজ গঠনে আত্মপ্রত্যয়ী এই মানুষটি ছিলেন সফল সাধক। তাঁর চিরায়ত সৃজন-কর্মগুলোকে সমাজ সংস্কারকসহ মানবতাবাদী মানুষ বহুকাল মনে রাখবেন। আমাদের ইতিহাসে ও সংস্কৃতি-ঐতিহ্যে এই বাস্তবতা প্রখরভাবে উজ্জ্বল। 

 

২ জুন ২০২১ বুধবার সকাল ১০টা ৩৭ মিনিটে রাজধানী ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি ইন্তিকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন। মরহুমের রূহের মাগফেরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ