শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

ওরা পাথুরে মানুষ

শিশুরা পবিত্র, শিশুরা উদার। শিশুদের পবিত্র মুখের দিকে তাকালে পাষাণ হৃদয়ও নাকি গলে যায়। কিন্তু বর্তমান সভ্যতায় এমন দেশ আছে, মানুষ আছে- যাদের হৃদয় আসলেই পাথর হয়ে গেছে। শিশুদের চরম ক্ষতিতেও যাদের মন গলে না। সেই দেশটির নাম ইসরাইল, আর মানুষগুলো হলো ইহুদি। আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, অবরুদ্ধ গাজায় সম্প্রতি ইসরাইলের ১১ দিনের বিমান হামলায় মানসিক বৈকল্যের শিকার হয়েছে হাজার হাজার ফিলিস্তিনী শিশু।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার পর গাজার  অধিবাসীরা ইসরাইলের নির্বিচারে বোমা হামলার দুঃস্বপ্ন ও ধকল কাটিয়ে উঠে বিধ্বস্ত বাড়িঘরে ওঠার চেষ্টা করছেন। সেই সঙ্গে গাজার মায়েরা ও স্বাস্থ্য কর্মীরা এমন উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, ইসরাইলের সহিংসতার ফলাফর হিসেবে গাজার শিশুদের দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ক্ষতি বয়ে বেড়াতে হতে পারে। গাজার উত্তরাঞ্চলীয় বেইত হানুন এলাকার বাসিন্দা হালা সেহাদা ২৮ বছর বয়সী একজন মা। তিনি বলেন, ‘গাজায় সাম্প্রতিকতম হামলা আমাকে ছয় বছর আগের ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ওই বছর আমার স্বামী নিহত হন। কিন্তু এবার আমার অবস্থা আরও খারাপ। আমার ছয় বছর বয়সী মেয়ে টোলেন ওর বাবা নিহত হওয়ার পাঁচ মাস পর জন্মগ্রহণ করে। এবারের বোমা হামলায় ছোট্ট মেয়েটা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।’
উল্লেখ্য যে, অবরুদ্ধ এ উপত্যকায় এবারের বোমা হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিশু ও কিশোররা। ইসরাইলের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছে ২৫৩ জন ফিলিস্তিনী। এদের মধ্যে শিশুই ৬৬। হামলায় আহত হয়েছে অনেক শিশু। ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গত ২১ মে ইসরাইল হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে উপনীত হয়েছে। কিন্তু গাজাবাসীর দুর্দশা ঘোচেনি। আগ্রাসী ও সন্ত্রাসী ইসরাইলী বাহিনীর দমন-পীড়ন ও দাম্ভিক আচরণ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
আসলে ফিলিস্তিনে এমন অন্যায়-অবিচার, পীড়ন, আগ্রাসন ও উৎখাত অভিযান চলতে পারছে ভ্রষ্ট বিশ্বব্যবস্থার কারণে। যার মূলে রয়েছে বর্ণবাদী দাম্ভিক রাজনীতি। এমন ভ্রান্ত দর্শনের সাথে মহান স্রষ্টার বিশ্বব্যবস্থার কোনো মিল নেই। স্রষ্টা মানববান্ধব করে পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু ক্ষমতাবান দাম্ভিক মানুষরা পৃথিবীর কিংবা মানবের বান্ধব হতে পারেনি। এটাই বর্তমান সময়ের বড় ট্র্যাজেডি।
আমরা পৃথিবীতে বসবাস করছি। আকাশ ও আঙ্গিনা নিয়ে আমাদের জীবন। সৃষ্টিজগতের চারিপাশে কত বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্য আমাদের আনন্দ দেয়, সৃষ্টিশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। মানুষের মধ্যেও বৈচিত্র্য কম নয়। কত আকৃতি, কত রঙ, কত ভাষা। মানুষের ভাবনাজগতে, বিশ্বাসের জগতেও আছে বৈচিত্র্য। কত ধর্ম, কত দর্শন। সৃষ্টি জগতের রহস্য উপলব্ধিতে সমর্থ হলে মানুষ নিজেদের বৈচিত্র্যের মধ্যেও গড়ে তুলতে পারে ঐক্য। বৈচিত্র্যের ঐক্যকে মেনে নিলে সমাজ ও রাষ্ট্র শান্তি ও প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে পারে। এ নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে  আলোচনা হয়েছে, চর্চাও হয়েছে।
আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত পৃথিবীর বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের স্থপতিরা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছেন, বলেছেন বৈচিত্র্যের ঐক্যের কথাও। কত ধর্ম, কত বর্ণ, কত ভাষা, কত সংস্কৃতি বিরাজ করছে ভারতে। ফলে ভারতের দূরদর্শী নেতারা জাতীয় ঐক্য, উন্নতি, প্রগতি ও শান্তির লক্ষ্যে সবসময় গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈচিত্র্যের ঐক্যের পক্ষে আওয়াজ তুলেছেন। যদিও এসব বিষয়ে ভারতের রাজনীতিতে ব্যর্থতা লক্ষ্য করা গেছে, লক্ষ্য করা গেছে নানা দূষণ ও বৈপরীত্যও। তবে এর সাথে বর্তমান সময়ে যুক্ত হয়ে গেছে ধর্মান্ধতা এবং উগ্রতা। এমন বাতাবরণে ধর্মের নামে প্রোপাগাান্ডা লক্ষ্য করা গেলেও ধর্মের সৌরভ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না।
উত্তর-পূর্ব ভারতের আসামে নির্বাচনের পরেই ওই রাজ্যের ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার বলছে, গরু সুরক্ষায় নতুন আইন আনা হবে আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, হিন্দুদের জন্য নির্দিষ্ট ধর্মীয় স্থানের কাছাকাছি গরু খাওয়া তিনি সমর্থন করেন না।
এখন এই কাছাকাছি বিষয়টা কে নির্ধারণ করবেন, কীভাবে নির্ধারণ করবেন? ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গরু সুরক্ষা নিয়ে, গরু খাওয়া নিয়ে যেভাবে জীবনহানি হয়েছে, উগ্রতা প্রশ্রয় পেয়েছে তা লক্ষ্য করেছে বিশ্ববাসী। এতে লজ্জিত হয়েছেন ভারতের বিদগ্ধ নাগরিকরা। উল্লেখ্য যে, মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পরেই হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছিলেন, বেআইনি নাগরিক চিহ্নিত করণের তালিকা ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এন আর সি) আবার খতিয়ে দেখতে সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করবেন তারা। এছাড়া আসামে নির্বচনের আগেই সরকারি মাদরাসাগুলোর অনুমোদন বাতিল করে সেগুলোকে সাধারণ স্কুলে রূপান্তরিত করার কথা বলেছিলেন তিনি। অর্থাৎ মুসলমান সম্প্রদায়ের জীবিকা, নাগরিকত্ব ও শিক্ষা- এই তিন বিষয়কেই ঢেলে সাজাতে চাইছে এই রাজ্যের বিজেপি সরকার।
উল্লেখ্য যে, হিমন্ত বিশ্বশর্মা তার নির্বাচনী প্রচারে লাগাতর মুসলিম ও অন্যান্য আঞ্চলিক জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। এ কারণে নির্বাচন কমিশন তার প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। তার প্রচার-প্রোপাগান্ডা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, বিজেপি জিতলে যে পরিবর্তন আনা হবে, তা সেখানকার বাঙালি মুসলমানদের জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এখন সেই বাস্তবতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। করোনা মহামারির চাপে না পড়লে ভারতে বিজেপির উগ্র ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মাত্রা হয়তো আরও বেড়ে যেত। এখন প্রশ্ন হলো, ভারত রাষ্ট্রের স্থপতিরা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈচিত্র্যের ঐক্যের যে কথা বলেছিলেন- তার বিপরীতে বিজেপির যে রাজনীতি, তা বহু ধর্ম-বর্ণ-ভাষার দেশটির জন্য কাল্যাণকর হবে কী? আর এর প্রভাবটা এই অঞ্চলে কেমন হবে? বিষয়টি আসলেই ভেবে দেখার মতো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ