শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

নৃশংসতা চরমে

দেশে হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়ে যাওযার খবর নতুন নয়। কিন্তু যে খবরে সম্প্রতি জনমনে প্রবলভাবে ভীতি-আতংক ছড়িয়ে পড়েছে সেটা নৃশংসতা সম্পর্কিত। অপরাধ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে মানুষ ক্রমাগত নিষ্ঠুরতার চরমে পৌঁছে যাচ্ছে। এ বিষয়ে ধারণা পাওয়ার জন্য গত মঙ্গলবারের গণমাধ্যমে প্রকাশিত তিনটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়।
প্রথম ঘটনায় রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় নিজের বাসায় কাজী সাবিরা রহমান নামের একজন চিকিৎসকের লাশ পাওয়া গেছে। তার বয়স ৪৭ বছর এবং প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিনি দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে সংসার করছিলেন। প্রথম স্বামীর ঘরের ২১ বছর বয়সী এক ছেলে এবং দ্বিতীয় স্বামীর ঘরের ১০ বছর বয়সী এক মেয়ে রয়েছে তার। নিজের কর্মস্থল গ্রিন লাইফ হাসপাতাল কাছাকাছি হওয়ায় ডাক্তার সাবিরা কলাবাগানের এক ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। অন্যদিকে বর্তমান তথা দ্বিতীয় স্বামী থাকতেন শান্তিনগর এলাকায়।
হত্যাকান্ডের রাতে ডাক্তার সাবিরা ফ্ল্যাটে একাই ছিলেন। সকালের দিকে তার ফ্ল্যাট থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখা গেলে প্রতিবেশিরা দরোজা ভেঙে প্রবেশ করেন। তারা রক্তাক্ত অবস্থায় ডাক্তার সাবিরাকে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখতে পান। পুলিশ এসে তার শরীরের বিভিন্নস্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখে জানিয়েছে, তিনি হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। ঘাতকরা তার লাশ পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল বলেই ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত দ্বিতীয় ঘটনায় রাজধানীর মহাখালী এলাকায় সিলেটের ময়না মিয়া নামের একজনের ছয় টুকরো করা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাই বলে এক সঙ্গে বা একই স্থানে নয়, উদ্ধার করা হয়েছে তিনটি পৃথক স্থান থেকে। রোববার রাতে প্রথমে মহাখালীর আমতলা এলাকা থেকে মাথা ও হাত-পা বিহীন লাশ উদ্ধার করার পর সোমবার বিকেলে ওয়ারলেস এলাকার টিএন্ডটি মাঠ সংলগ্ন ঝিল থেকে নিহতের মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এই হত্যাকান্ডের জন্য নিহত ময়না মিয়ার প্রথম স্ত্রীকে সন্দেহ করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গক্রমে অন্য দুটি হত্যাকান্ডের খবর নিয়েও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। এ দুটির মধ্যে ১৯ মে প্রথম ঘটনায় রাজধানীর দক্ষিণখানে পরকীয়ার জের ধরে নিহত হয়েছে একজন গার্মেন্ট শ্রমিক। তার দেহকে ছয় টুকরো করেছে ঘাতকের দল। অন্য এক ঘটনায় গাজীপুরের কাশিমপুরে পরকীয়ায় বাধা দেয়ায় স্বামীকে হত্যা করেছে আরিফা বেগম এবং তার প্রেমিক তনয় সরকার। এই দু’জনের বয়স ২৪ এবং ৩১ বছর।  
এদিকে রোববারই ফতুল্লার এক মার্কেট থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় লালপুরের বাড়িতে যাওয়ার পথে ঝগড়া ও হাতাহাতির এক পর্যায়ে এস এম দুলাল নামের স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে তার স্ত্রী। সে সময়ই একটি কাভার্ড ভ্যান এসে চাপা দেয়ায় মৃত্যু ঘটেছে স্বামী দুলালের। অটোরিকশাচালক জানিয়েছে, স্বামী কেন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেÑ এই নিয়ে শুরু থেকেই দু’জনের মধ্যে তর্ক এবং হাতাহাতি হচ্ছিল। এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত স্ত্রী ধাক্কা দিলে স্বামী দুলাল পড়ে যায় এবং অন্য একটি চলন্ত গাড়ির চাপায় তার মৃত্যু ঘটে। স্ত্রী পালিয়ে যাওয়ায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি।   
বলার অপেক্ষা রাখে না, একের পর এক খুন এবং লাশকে ছয় টুকরো পর্যন্ত করে বিভিন্নস্থানে ফেলে রাখার মতো কর্মকান্ড সকল মূল্যায়নেই অত্যন্ত ভীতিকর। এসবের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে সমাজের পচন ও অধঃপতনের দিকই প্রাধান্যে এসেছে। আমরা উদ্বিগ্ন এজন্য যে, এতদিন প্রধানত টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, গুম-খুন এবং মদ-জুয়া ও নারী ব্যবসাকেন্দ্রিক খবর জানা যেতো। কিছুদিন আগে ক্যাসিনো সম্পর্কেও জানা গেছে। এসবের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়েছে, সম্ভাব্য সকল পন্থাতেই জাতিকে সর্বনাশের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। ঘটানো হচ্ছে নৈতিক অধঃপতন। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আসলেও পচন শুরু হয়েছে এবং সে পচন এরই মধ্যে যথেষ্ট অপূরণীয় ক্ষতিও ঘটিয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক রিপোর্টে ভীতিকর আরো অনেক তথ্যও রয়েছে, যেসবের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দেশে খুন ও সহিংসতার ঘটনা আশংকাজনক হারে বেড়ে চলেছে। প্রতিটি রিপোর্টেই বলা হয়েছে, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই এভাবে খুন, ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধ বেড়ে চলেছে। সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীরা বলেছেন, এমন অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে ধর্ষণ বা হত্যাকান্ডের কোনো ঘটনা জানাজানি হওয়া মাত্র মামলা দায়ের ও অপরাধীকে গ্রেফতার করার পাশাপাশি সুষ্ঠু তদন্ত করে স্বল্প সময়ের মধ্যে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশিষ্টজনদের এই অভিমতের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। বস্তুত কোনো অপরাধের জন্য বিচার ও শাস্তি হচ্ছে না বলেই খুনের মতো নৃশংসতা সকল সীমা অতিক্রম করে চলেছে। এজন্যই ঘটনাক্রমে শুধু অপরাধীকে গ্রেফতার করাকেই আমরা যথেষ্ট মনে করি না। এ ধরনের নৃশংস অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো শাস্তি দেয়া যায় কি না সে ব্যাপারে আইন বিশারদদের সঙ্গে পরামর্শ করা যেতে পারে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই আইনের ফাঁক গলিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। তাদের কোনো শাস্তিই হয় না। একই কারণে অপরাধও বন্ধ বা নির্মূল হয় না।
আমরা চাই, এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা হোক- যার ফলে কেউই আর হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধের কথা চিন্তা পর্যন্ত করার সাহস পাবে না। একই কথা অন্য সব অপরাধের ক্ষেত্রেও চিন্তা করা দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ