রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

মুহাদ্দিস আবু সাঈদ : স্মৃতিতে অম্লান

হেলাল আনওয়ার : ৩০ মে, ২০২০। দেখতে দেখতে একটি বছর পার হয়ে গেলো! ফিরে এলো সেই মে মাস। যে মাস আমার হৃদয় নদীতে তুলে কষ্টের ঢেউ আর ব্যথার তুফান।
 আমার মাথার ওপর সাহসের যে দু’টি ছাদ তার একটি হলেন সাবেক এমপি আমার মিয়াভাইজান মুহাদ্দিস আবু সাঈদ (রহ), আর অপরটি হলেন মেঝভাইজান কবি মোশাররফ হোসেন খান।
মেঝভাইজান দূরে, এখন ঢাকায় থাকার কারণে সব সময় একসাথে থাকার সুযোগ হয় কম। কিন্তু মিয়া ভাইজানের সাথে হর হামেশা মেলামেশার সুযোগ ছিল বেশি।
সুখে দুখে সব সময় এক জায়গায় বসে কথা হতো। অনেক গল্প অনেক বিষয়ে আলোচনা হতো আমাদের। অথচ এই একটি বছর পেরিয়ে গেল তিনি চলে গেলেন। তিনি চলে গেলেন আল্লাহর হেফাজতে।
নিখুঁত আদর্শবান মানুষ ছিলেন তিনি। অন্যের সমালোচনা না করে যিনি আত্মসমালোচনা করতে পছন্দ করতেন। জান্নাত ছিলো যাঁর চাওয়া- পাওয়ার আশা। তিনি বিশ্বাস করতেন এবং বলতেন দুনিয়া নয়, আখেরাতই আমার উদ্দেশ্য। আমৃত্যু তিনি আখেরাতের জন্যে কাজ করেছেন।
 দ্বীনের পথে থেকে তিনি দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ কামনা করতেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর এই দোয়া কবুল করেছেন। তিনি দুনিয়ায় এমন কল্যাণ লাভ করেছেন যা রীতিমতো একটি জীবন্ত ইতিহাসের মতো। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন তিনি। তাঁকে মন্দ বলার মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহজ সরল। অনাড়ম্বর, বিলাসিতাহীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত। অপচয় পছন্দ করতেন না। সততা ও আমানতদারিতা ছিল তাঁর একান্ত ভূষণ।
সারাদিন কর্মচাঞ্চল্যতা ছিলো তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী। প্রতিটি মুহূর্ত ছিল রুটিন বাঁধা। একজন যন্ত্রচালিত মানুষের মতো। তাঁর সামগ্রিক জীবনে ও রাজনৈতিক জীবনে সফলতার পেছনে এটা বড় ভূমিকা রেখেছিলো।
ক্লান্তিহীন মানুষ বলতে যা বোঝায়, তিনি ছিলেন সেইরকম।একটু অবসর পেলেই বই হাতে বসে যেতেন। শুয়ে বই পড়া উনার অভ্যাস ছিলো। আর পড়তে পড়তে ঘুমানো এটা ছিলো সহজাত। জীবনে কতো বই যে উনি পড়েছেন তার হিসেব নেই। একবার যা পড়তেন তা যেন ভুলতেন না। মেঝ ভাইজানও ঠিক এমনই। আব্বাজানের কাছ থেকেই তাঁরা এ অভ্যাস রপ্ত করেছিলেন।
আমরা সাত ভাই- বোন আব্বাজানের সামনে বসলে আব্বাজান বাংলা সাহিত্যের নানা বিষয় আশয় নিয়ে আলোচনা করতেন। বিশেষ করে আব্বাজান বাংলা জানা পন্ডিত লোক হিসেবে অত্যন্ত সুপরিচিত ছিলেন। একটা শব্দকে তিনি যে কিভাবে বিশ্লেষণ করতেন ত তে রীতিমতো আমরা অবাক হয়ে যেতাম। আব্বাজান বলতেন, “বাংলা ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। আমার দাদাজান, প্রপিতারা বাংলা ও সংস্কৃতি ভাষার পন্ডিত ছিলেন।”
আব্বাজান সেই ধারাবাহিকতার একটা অংশ। তিনি কবিতা, গানসহ গদ্যও লিখতেন। এজন্য পারিবারিকভাবে বাংলা চর্চা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা চলতো ক্রমাগত। আমাদের প্রাত্যহিক ওঠা বসাতেও।
 মিয়াভাইজানও প্রথম দিকে কবিতা, প্রবন্ধ লিখতেন। তারপর জীবনের স্বপ্ন ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি কবিতাকে বিদায় জানিয়ে মানুষের পাশাপাশি থেকে মানব সেবায় নিজেকে তিনি লীন করে দেন। তবে প্রবন্ধ, কুরআন-হাদীসের গবেষণামূলক লেখা তিনি লিখতেন।
আব্বাজান মিয়া ভাইজানকে “আব্বাজান” বলে ডাকতেন। মিয়া ভাইয়ের ভেতর নাকি আমার দাদাজান রহিম বকস কবিরাজের অনেক গুণ আছে। দাদাজানের সব গুণের কথা আমরা বলতে পারবো না। কারণ, আমরা পৃথিবীতে আসার অনেক আগেই তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন। তবে একটা বিষয়ে আমরা অবগত ছিলাম যে, তিনি ছিলেন একজন অতি সম্মানিত ব্যক্তি এবং সমাজের মাতব্বর। গ্রাম্য শালিশ নিজ এলাকায় তাঁর ছাড়া হতো না। তাছাড়া লেখাপড়া জানা লোক বলতে কেবল তিনিই। তিনি ছিলেন ভেষজ চিকিৎসক। এলাকায় তাঁর সুনাম সুযশের কোনো অভাব ছিলো না। এলাকার চেয়ারম্যানকে তখন বলা হতো প্রেসিডেন্ট। আমার দাদাজান সেই সব প্রেসিডেন্টদের খাস দরবারে বসে বিচার শালিশ করতেন। এতো নাম ডাকের পেছনে কারণও ছিলো। দাদাজান ছিলেন পন্ডিত আবদুল্লাহ কবিরাজের একমাত্র যোগ্য উত্তরসূরী। আবদুল্লাহও  ছিলেন পন্ডিত ইদ্রিস কবিরাজের একমাত্র ছেলে। এই ধারাবাহিক সামাজিক ঐতিহ্য রক্ষায় আব্বাজানের বিশেষ আস্থা ছিলো মিয়াভাইজানের ওপর।
  সত্যিই একদিন সেই আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। আমাদের পারিবারিক সম্মান আর ঐতিহ্যকে তিনি সমুন্নত করেছেন। সেই সাথে দেশ এবং জাতিকে করেছেন গর্বিত। হয়েছেন মানুষের কাছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক ভালোবাসার পাত্র।
ছোটোবেলা থেকে তিনি ছিলেন একটু তেজী, রাগী আর জেদী স্বভাবের। একবার যেটা করার ইচ্ছে পোষণ করতেন সেটা না করা পর্যন্ত তিনি ক্ষ্যান্ত হতেন না। এতে করে মাকে অনেক সময় দুর্ভোগও পোহাতে হয়েছে। তবু মা কখনো মনের ভুলেও কটু বাক্য ব্যবহার করতেন না। আর আব্বাজান ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষè দৃষ্টিসম্পন্ন। শান্ত স্বভাবের। তিনি সহসা পাঠ করতে পারতেন মানুষের মনের ভাষাটা। মিয়া ভাইজানের ক্ষেত্রে কিংবা আমাদের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। আব্বাজানের হৃদয়ের পাঠের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম আমরা।
মিয়া ভাইজানের ঐ জিদ একদিন তাকে অনেক বড়ো করে তোলে।
আব্বাজানের  খুব সাধ ছিলো তাঁর সন্তানদের তিনি দ্বীনি ইলম শিক্ষা দিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। কুরআন হাদীস থেকে তারা মানুষের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেবে।
একবার এক ওয়াজ শুনে বাড়ি ফিরছিলেন। সাথে ছিলেন আমাদের শুকরো চাচা। দু’জনে মিলে পরামর্শ করলেন একটা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার।
যে কথা সেই কাজ। পরের দিন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডাকা হলো। তারপর এলাকাবাসীর পরামর্শ নিয়ে  ঘেরা বেড়া করে মাদরাসার কার্যক্রম চালু হয়ে গেল।
জননেতা মুহাদ্দিস আবু সাঈদ (রহ.) ছিলেন ঐ মাদরাসারই ছাত্র। এমনকি আমরা সকল ভাই -বোনও। এখন সেটি এমপিওভুক্ত সিনিয়র মাদরাসা হিসাবে আরো বড়ো পরিসরে রূপ নিয়েছে। প্রতিবছর সেখান থেকে অনেক  দ্বীনি আলেম তৈরি হচ্ছেন।
ছোটকালে মিয়া ভাইজান ও মেঝভাই জানকে ঐ সময়ে যারা খুব শিক্ষিত, জ্ঞানী, গুণী, আলেম, তাঁদের কাছে আব্বাজান নিয়ে যেতেন। সারাক্ষণ তিনি আমাদের সাথে দ্বীনের কথা বলতেন। নিজের অভ্যাসের পরিবর্তন আনেন সন্তানদের গড়ে তোলার জন্যে।
আব্বাজানর গড়া মাদরাসা থেকে মিয়া ভাইজান এবার চলে এলেন গাজীর দরগাহ মাদরাসাতে। ইংরেজী হাতের লেখা খুব ভালো না হওয়ায় স্যার বললেন, “নো হোপ নো চান্স”। ব্যাস, এটুকুতেই তাঁর জিদ চাপলো। হাতের লেখা ভালো করতেই হবে। সত্যি সত্যি তিনি হাতের লেখা সবার চেয়ে ভালো করে ফেলেন। বাংলা, ইংরেজি, আরবি, উর্দু — যেকোনো ভাষার তার হাতের লেখা ছিল এক অসাধারণ এবং অতুলনীয়। অনুকরণীয় তো বটেই।
তিনি প্রতিটি বোর্ড পরীক্ষায় স্কলারশীপ লাভ করেন। এসময় থেকেই তাঁর সুনাম চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি চেয়ারম্যান, এম পি হিসেবে খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন।
একজন সুবক্তা হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য। মানুষ তাঁর মুখের কথা শোনার জন্য মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থাকতো।
প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন রাসূল (সা) ও আসহাবে কেরামের (রা) আদর্শের এক উজ্জ্বল মডেল। পারোলৌকিক পরিপূর্ণতার জন্য তিনি নিজেকে আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিয়েছিলেন।
মিয়া ভাইজান একটি সিনিয়র মাদরাসার  প্রিন্সিপাল ছিলেন।
মিয়াভাইজানের শেষ স্মৃতি, শেষ কথা ছিলো এরকম—” দাদু, আমার অবসরের সময় এসে গেলো। আমি অবসর নিয়েই তোমার সাথে বাকী জীবনটা কাটাবো। আমি বুড়ো হয়ে গেলে আমার দেখাশুনার দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে।”
আমি মাথা নেড়ে অতি সন্তুষ্টচিত্তে হাসি মুখে মেনে নিলাম। উনি বড় খুশি হলেন। তারপর উনি চলে যাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। আমি বিনয়ের সাথে অনুরোধ করলাম— আজ ঈদের দিন। কিছু না খেলে আমার এবং মা’র খুব কষ্ট হবে। বললেন—”ঝাল জাতীয় কিছু আছে?”
তাঁকে নুডলস  এনে দিলাম। অল্প খেলেন। তারপর রওয়ানা দিলেন ঝিকর গাছায়। বাসার উদ্দেশে।
এর পর ৩০ মে, ২০২০ দুপুর বেলা, হঠাৎ ফোন পেলাম। কান্নাজড়িত কন্ঠে ছোটবোন বললো, ছোটোভাই এখনই চলে এসো। দাদার শরীর খুব খারাপ। কালবিলম্ব না করে ছুটে গেলাম। ততক্ষণে তিনি সকলকে ছেড়ে চলে গেছেন পরম প্রভুর সান্নিধ্যে।
মিয়াভাইজান সত্যিই আমার কাছে চলে এসেছেন। তাঁকে দেখভালের দায়িত্ব পালনও করে যাচ্ছি।
তিনি চলে গেছেন সকলকে কাঁদিয়ে। তিনি চলে গেছেন হাসতে হাসতে। এই দেশ, এই জাতি একজন নেককার আল্লাহর ওলীকে হারিয়ে হতবিহ্বল এবং বিমূঢ়।
আল্লাহ তাঁর এই নেককার গোলামকে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করুক। একজন দ্বীনের দাঈ হিসেবে জাযা দান করুন। সেই সাথে আমাদেরকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ