রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি আর কতকাল?

উসমান বিন আ. আলিম : বর্তমান সময়ে এক আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। গত একবছর থেকে এই শব্দটা বেশ পরিচিত হয়েছে আমাদের দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। পত্রিকার সূত্রমতে, ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে করোনায় মৃতের সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। রয়টার্সের এক হিসাবে, বিশ্বে করোনাজনিত মৃত্যু ২০ লাখ ছাড়াতে সময় লেগেছিল এক বছরেরও বেশি। সেখানে পরের ১০ লাখ প্রাণহানি হয়েছে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে।আর বিবিসির তথ্যমতে, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১০হাজার ছাড়ালো।যার কারণে এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের মতো বাংলাদেশের সরকারও করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা বা যাতে এই ভাইরাসটি না ছড়িয়ে পড়ে সেজন্য লকডাউন দিয়েছিলো। এখনও দেশে লকডাউন কার্যকরী হচ্ছে। যদিও আমাদের দেশের লকডাউন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বাংলাদেশের লকডাউনের কারণে আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনায় লকডাউনের কারণে ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল এ এক মাসে অর্থনীতিতে ১ লক্ষাধিক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আর ওই সময় কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে দেশে ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রতিদিন ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
বি আইডিএসের অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এ করোনার কারণে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা এখন আর অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, করোনার শেষ সম্পর্কে আমরা এখনও ধারণা করতে পারছি না। ক্ষতির পরিমাণ, জিডিপির ক্ষতি এখন যা বলা হচ্ছে তা প্রজেকশনের ভিত্তিতে। বাস্তবতা হতে পারে আরও ভয়াবহ। কিন্তু এর থেকেও ভয়াবহ অবস্থা বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের। লকডাউনে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ও চলাফেরায় খুবই ঘাটতি হয়েছে। ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে করোনা মহামারিজনিত কারণে সারা দেশের স্কুল-কলেজগুলোর সরাসরি শ্রেণি পাঠদান বন্ধ রয়েছে। ভার্সিটির হল গুলো বন্ধ রয়েছে। যার ফলে শিক্ষার্থীরা যারযার বাড়িতেই অবস্থান করছে। একসাথে অনেকটা সময় বাড়িতে থাকায় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অপকর্ম বা জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেকে আবার বিভিন্ন অসামাজিক কাজ ও পর্নোগ্রাফিতেও আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে শিক্ষার্থীদের চলাচল ও চরিত্রে ফাটল ধরেছে।
শুধু তাই নয়, করোনায় শিক্ষার্থীরা বইবিমুখ হয়ে পড়েছে অধিকাংশে। আশেপাশের ও বিভিন্ন জায়গায় বা মিডিয়া থেকে খোঁজ খবর নিয়ে যা দেখা ও শোনা যাচ্ছে, তাতে শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। উদাহরণ হিসেবে যদি বলি তাহলে আমাদের এলাকার ইন্টার পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীকে দেখেছি খেলার সামগ্রী কেনার জন্য নিজ ঘর থেকে দেড় হাজার টাকা চুরি করেছে। আরেক শিক্ষার্থী নেশা করার জন্য একজনের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। এক বড়ো ভাই বলেছে যে, তার অনেক ফ্রেন্ড বা পরিচিত শিক্ষার্থী ডিপ্রেশন সইতে না পেরে মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেকে আত্মহত্যা করতে গিয়েও ফিরে আসতেছে। কেউবা আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে।কিছুদিন আগে দেখা গেছে যে, এক শিক্ষার্থীকে মোবাইল কিনে দেয়নি দেখে তার বাবা-মার সাথে অভিমান করে ফ্যানের সাথে ওড়না ঝুলিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন এসব হচ্ছে শিক্ষার্থীরা বাসায় অনেকটা সময় থাকার কারণে। স্টুডেন্টরা একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে,আর যতো আজেবাজে চিন্তাভাবনা তাদের মাথায় আসছে। আর সেটাই তারা করছে। এই লকডাউনে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীরা। কারণ, এসব ভার্সিটি পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা সাধারণত টিউশনি বা টুকটাক কাজ করে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। ঢাকার শহরে এরকম অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে যারা টিউশনি বা ছোটখাটো কাজ করে নিজ পড়ার খরচ ও ছোট ভাই-বোনদের পড়ার খরচ চালাতো। কিন্তু এই করোনাভাইরাসের কারণে অভিভাবকরা টিউশনির শিক্ষককে পড়াতে না বলে দিয়েছে। অনেক প্রাইভেট কোম্পানি বন্ধ হয়েছে বিধায় হাজারো শিক্ষার্থী চাকরিচ্যুত হয়েছে। এর ফলে সেসব শিক্ষার্থী যারযার বাড়িতে এসে বসে আছে অনেকটা মাস ধরে। এদিকে তাদের সামনে ফ্যামিলির আর্থিক সমস্যা, নিজের পড়াশোনা, অনেকটা সময় একজায়গায় থাকা, পকেট খরচ না থাকা সবমিলিয়ে এরা মানুষিক ভারসাম্যে ভুগছে। এই ডিপ্রেশনের কারণে বিভিন্নজন  বিভিন্ন কাজ বেছে নিচ্ছে। যারা বাবা-মায়ের তদারকিতে আছে তারা ঠিক থাকলেও অনেকেই সঠিক রাস্তা থেকে সরে যাচ্ছে। কেউ নেশা করা শুরু করে দিয়েছে, কেউ খারাপ লোকদের সাথে আড্ডা দিয়ে বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে, বাসায় অনেকটা সময় থাকার কারণে অনেকে আবার পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক শিক্ষার্থী এই ডিপ্রেশনে ভুগছে যে, তাদের পড়াশোনার বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেই অনার্স প্রথম বছরের ছেলেটা তিন বছর হচ্ছে এখনো প্রথম বছরেই রয়ে গেলো। কারোর সরকারি চাকরির বয়স চলে যাচ্ছে বিধায় পেরেশানিতে আছে। সবমিলিয়ে শিক্ষার্থীদের এখন নিত্য সঙ্গী হতাশা। যা একজন শিক্ষার্থীর জন্য অনেক অনেক ক্ষতিকর। অনেক শিক্ষার্থীদের ভালো কাজও করতেও দেখা যাচ্ছে, আবার দেখা যায় এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেকে নিজ নিজ ধর্মের শিক্ষাও নিয়ে ফেলছে। অনেকে নিজ বাবা-মায়ের সাথে কাজে সহোযোগিতা করছে।
সুতরাং ফ্যামিলিদের তাদের সন্তানদের  নিয়ে ভাবতে হবে। তাদেরকে তদারকি করতে হবে, নজরদারিতে রাখতে হবে। যাতে করে তারা সঠিক রাস্তা রেখে ভুল পথে না যায়। দেশের সরকারকেও শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাবতে হবে, বিশেষজ্ঞদের ভাবতে হবে। কীভাবে কী করলে এসব শিক্ষার্থীদের সঠিক পরিচালনা হবে তা নিয়ে ভাবতে হবে। এভাবে মাসকে মাস কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকলে হাজারো শিক্ষার্থী ভুল পথে চলে যাবে। ডিপ্রেশনে বা হতাশায় থেকে থেকে তারা নেশা বা আত্মহত্যার পথ বেছে নিবে। এদের নিয়ে ভেবে সুষ্ঠ সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। স্কুল, কলেজ ও ভার্সিটিগুলো সচেতনতার সাথে খুলে দেওয়া যায় কিনা তা নিয়ে ভাবতে হবে। শিক্ষার্থীরা এভাবে থাকলে শিক্ষাঙ্গন ধ্বংসের মুখে পড়ে যাবে।আর এর প্রভাব আমাদের দেশের উপর পড়বে। আদর্শ সমাজ গড়তে সঠিক শিক্ষার্থীদের বিকল্প নেই। এখন শিক্ষার্থীরা যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে সমাজ ও দেশ ধ্বংসের মুখে পড়ে যাবে। তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার, শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাবার। কারণ এর ভয়াবহতা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। কাজেই আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ