রবিবার ২৫ জুলাই ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

 

সাজজাদ হোসাইন খান:

॥ একচল্লিশ ॥

আমরা যে বাড়িটিতে উঠেছি সে বাড়ির মালিকের নাম কাইউম সাহেব। এ নামেই তো ডাকতো লোকজন। বাড়ি রাজশাহীর কোথায় যেনো। বেশ ভদ্র লোক। হাসি হাসি চেহারা। বেটে, খাটো। এটিই ছিলো পুব মাথার শেষ বাড়ি এ পাড়ার। তারপর নিচু জমি। দশ বারো কাঠাতো হবেই। এরপর আবার বাড়ি-ঘর। এগুলোও শান্তিবাগেরই সীমায়। পায়েচলা মেঠোপথ সামনে। পথ লাগুয়া একটি ঘর, অন্য বাড়ি। পাশে মাঠ মতো একটি সুনসান জায়গা। অনেক দুপুরই কাটতো এ মাঠে। আড্ডা ফাড্ডা খেলাধুলায়। মাঝখানটায় ফসলি জমি। এরপর রাজারবাগ এলাকা শুরু। আশপাশে খালি খালি। ফসল টসল করতো কারা যেনো। হাঁটতে চলতে ফিরতে চমৎকার লাগতো। গ্রাম গ্রাম পরিবেশ। আগানগর ঘাটুরার কাছাকাছি। এমনিতে লোকজন কম শান্তিবাগে। নতুন নতুন ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে। উত্তর-দক্ষিণ পুব-পশ্চিমে। কোনোটি টিনের, কোনোটি বাঁশ বেড়ার। 

একটু আধটু চেনাজানা হয়ে গেছে শান্তিবাগ। বন্ধু বান্ধবও জুটতে শুরু করেছে। এরিমধ্যে সময় যাচ্ছে হু হু। বইপত্রের সাথে এখনো চোখাচোখি হয়নি। কিন্তু সময় চলে যাচ্ছে পেছনে। আগানগর-ঘাটুরা থাকতে তো স্কুল টিস্কুলে যেতাম। বইয়ের পৃষ্ঠায় চোখ রাখতাম। এই শান্তিবাগে কি করবো? সেই কবে দ্বিতীয় শ্রেণী শেষ করেছি। তারপর সব লন্ডভন্ড। তৃতীয় শ্রেণীর আর দেখা নাই। এ দিকে মাস যাচ্ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। নজরে শুধু স্কুল ভাসে। দফতরির ঘন্টা কানে এসে ধাক্কা দেয়। আব্বাকে বললাম আমি স্কুলে যাবো কবে। দেখলাম আব্বাও চিন্তিত। আম্মার সাথে সলাপরামর্শ করেন। বছরের মাত্র দু’তিন মাস বাকি। এই ভাংগা বছরে কি আর করা। তুমি বরং এ কমাস ঘরেই পড়াশোনায় মনোযোগ দাও। পেছনের পড়াগুলো ঝালিয়ে নাও। যেই হুকুম সেই কাজ। পুরানো বইপত্র বাইরে আনলাম। তারপর চোখ রাখলাম পৃষ্ঠায়। সকাল রাত। 

মনের আকাশে কেবল কাক উড়ে। ডানাভাংগা প্রজাপতির দাপাদাপি। ঝাঁপিয়ে পড়ে তালুতে ক্লান্ত দুপুর। চোখে হাবুডুবু খায় স্কুল-পাঠশালা। অমর, রহমান আর ভুপাল স্যার। খেলতে যাই সকাল বিকাল নতুন বন্ধুদের সাথে। ওরা ওদের স্কুলের গল্প শোনায়। আমার  চোখে তখন আফসোসের বাতাস। একদিন চাঁদ উঠলো। উধাও হলো কাক। ঘরের উঠানে খুশির গড়াগড়ি। আম্মা বললেন তৈরি হয়ে নাও। তৈরি কেন? তৈরি এজন্যে যে তুমি আজ স্কুলে ভর্তি হতে যাবে। খবর শোনামাত্র চোখে পানি এসে গেলো, আনন্দে। মনে হলো শরীর কাঁপছে। আম্মা চুলটুল ঠিকঠাক করে দিলেন। আমি আর আব্বা রওয়ানা হলাম। বাজারবাগের মাঝ বরাবর পথ। এরপর পুলিশ লাইনের পাশ দিয়ে পোস্টাল কলোনীর শেষ মাথায় সেই স্কুল। নাম পোস্ট এন্ড টেলিফোন প্রাইমারি স্কুল। ফকিরাপুল বাজারের বিপরীত দিকে। একতলা দালান তিনটি কামরা। সামনে বিশাল ধু ধু মাঠ। পাশে দীঘি। তাও মাঠের সমান সমান। কলোনীর দালানগুলো তখনো শেষ হয়নি। কাজ চলছে। কোনোটার উঠছে দেওয়াল, কোনটার ছাদ।

স্যার দু’একখানা প্রশ্ন রাখলেন। আমি ঝটপট জবাব দিয়ে দিলাম। স্যারও খুশি আমিও খুশি। তারপর ভর্তি পর্ব শেষ। যাবার পথেই আবার বাসায় ফিরলাম আমি আর আব্বা। আনন্দের বাতাসে উড়তে উড়তে। তারপর অন্যরকম চালচলন। মগজে আটকা থাকে ঘড়ির কাঁটা, টিকটিক। আমি এখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। মনের ভিতর একটা বড় বড় ভাব উঁকি দেয়। সকাল বিকাল স্কুল করি। দলবেঁধে যাই বন্ধুবান্ধব মিলেঝিলে। প্রথম ক্লাস তেমন পড়াশোনা নাই। কেবল গালগল্প। পরিচয় টরিচয়ের পালা।  এরি মধ্যে বছরের পহেলা মাসের অর্ধেকটা খসে পড়েছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৯৫৯ সাল তখন।  

দুইভাগে স্কুল চলে। প্রভাতী আর দুপুর। আমি দুপুরের ছাত্র। সেটি শুরু হয় এগার সাড়ে এগারর দিকে। তৌফিক নামের একজন ছিলো ক্লাসে। তার সাথে ভাব হয়ে গেল। আর একজন ছিল সৈয়দ। পীরজঙ্গি মাজারের বিপরীতে ছিল তার বাসা। বড় সড়কের পাশ ঘেঁষে। স্কুল ছুটির পর মাঝেমধ্যে আড্ডা হতো বাড়ি ফেরার পথে। সৈয়দের আম্মা মুড়ি টুরি খাওয়াতেন। রেজাউল ছিল আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয়। শরীফা নামের একটি মেয়ে ছিল দ্বিতীয়। ওদের সাথেও খাতির দুস্তি ছিল। এই স্কুলে এসে একটা অন্যরকম সময় কাটছে। আমরা এক কামরায় আর পাঁচ ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা ভিন্ন কামরায়। হই হল্লা নাই বল্লেই চলে। রামচন্দ্র পাঠশালায় যেমন ছিল। মজা করে পড়ান স্যাররা। একেক বিষয়ে একেক স্যার। কখন যে আনন্দরা ঢুকে পড়েছে মগজে। অংক স্যার খুব হাসিখুশি মানুষ। টাংগাইলের দিকে ছিল তার বাড়ি। আমাকে খুব ¯েœহ করতেন তিনি। যদিও আমি অংকে ছিলাম লবডংকা। টেনে টুনে চল্লিশের বেশি উঠতো না। এরি মধ্যে বছরের অর্ধেকের কিনারায় এসে পা রেখেছি। সামনে পরীক্ষা। মাথা মগজ কাঁপছে। পাশ পাশে ভয়। এর আগেও একটা পরীক্ষার ঝড় গেছে। এ ঝড় সামলে দাঁড়িয়েছি মাত্র। আবার পরীক্ষা। মনে মনে ভাবলাম ঘনঘন পরীক্ষার কি দরকার? বছর শেষে একটা পরীক্ষা নিলেইতো চলে। কে শোনে কার কথা। এক মামা বলতেন, ‘ছাত্র জীবন সুখের হইতো পরীক্ষা যদি না থাকিতো।’ পরীক্ষা হয়ে গেলো শেষমেশ। তারপর ‘আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি’। স্কুলের কপাট বন্ধ সাপ্তাখানেকের জন্য।  (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ