রবিবার ০২ অক্টোবর ২০২২
Online Edition

ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসছে বিশাল ঘাটতি বাজেট

 

 এইচ এম আকতার: ২০২১-২২ অর্থ বছরের বাজেট প্রস্তুত এখন শুধু উপস্থাপনের বাকি। দেশের ইতিহাসে এত বড় ঘাটতি নিয়ে বাজেট কখনও করেনি সরকার। বাজেটে এ ঘাটতি দাঁড়াবে দুই লাখ ১৩ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।  জানা গেছে,  বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসছে এবারের বিশাল বাজেট। রয়েছে বেশ কিছু চমকও। ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের বাজেট প্রণয়নের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে অর্থ মন্ত্রণালয়, যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা বেশি।

 সাধারণত জুন মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার সংসদে বাজেট পেশ করা হয়। সে অনুযায়ী আগামী ৩ জুন বাজেট উপস্থাপন করতে পারেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। একেক সময় একে ধরনের পরিস্থিতি সামনে আসছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেট বাস্তবসম্মত করা উচিত। বর্তমান সংকটময় সময়ে বাজেটে অবশ্যই স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা ও মানুষের আয় বাড়ানোর মতো উদ্যোগ থাকা দরকার।

ব্যবসায়ীরা বলছেন,করোনার কারণে তাদের ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। আর এ অবস্থায় এত বড় বাজেট বাস্তকায়নে ব্যবসায়ীদের উপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। এতে করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যে হারে সরকার সব ধরনের পণ্যে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর(মূসক) আরোপ করছে তাতে ছোট ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হবেন। এজন্য ভ্যাট না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।

জানা গেছে,আগামী বাজেটে পণ্য আমদানিতে অগ্রিম আয়করে (অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স বা এআইটি) বড় পরিবর্তন আসছে। চার স্তরের পরিবর্তে ৬ স্তরে এআইটি আদায় করা হবে। সর্বোচ্চ হার ৫ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ করা হচ্ছে। স্থানীয় শিল্পকে সহায়তা দিতে কাঁচামালের কর কমানো হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

উল্লেখ্য, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এক ধরনের কর, যা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আমদানিকৃত পণ্য থেকে আদায় করা হয়। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে এই কর আদায় করা হয় না। অনিবন্ধিত আমদানিকারকদের করের আওতায় আনতে ২০০৭ সালে এই কর ব্যবস্থা চালু করা হয়।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর থেকে সিংহভাগ আয়কর আদায় হয়। তাই আগামী বাজেটে এ দুটি খাতকে অধিকতর যৌক্তিকীকরণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যেমন দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়াতে অগ্রিম আয়করে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ানো হচ্ছে বিলাসী পণ্যে। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগের মতোই ১৮৯টি আইটেমে কর থাকছে না।

বর্তমানে পণ্যভেদে ৪ স্তরে অগ্রিম আয়কর আদায় করা হয়। এগুলো হচ্ছে ০, ২, ৩ ও ৫ শতাংশ। আগামী বাজেটে এটিকে ৬ স্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে ০, ১, ২, ৩, ৫, ২০ শতাংশ। এর বাইরে স্টিল আইটেমে টনপ্রতি ৫০০ টাকা এবং ভুটান থেকে নির্দিষ্ট আইটেমের পণ্য আমদানিতে এআইটি দিতে হয় না।

আগামী বাজেটে সমুদ্রগামী জাহাজের অগ্রিম আয়কর ১ শতাংশ করা হচ্ছে। বর্তমানে এটি ২ শতাংশ আছে। এছাড়া ইথাইল অ্যালকোহল, স্পিরিট, আঙ্গুরের ওয়াইন ও মার্ক, হুইস্কি, রাম অ্যান্ড টাফিয়া, জিন অ্যান্ড জেনেভা, ভদকা, মদজাতীয় পণ্য এবং সুগন্ধি আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ২০ শতাংশ করা হচ্ছে। স্থানীয় সিমেন্ট শিল্পের ক্লিংকার আমদানিতে উৎসে কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হচ্ছে।

এছাড়া জীবিত প্রাণী যেমন গরু, ছাগল, মহিষ, মুরগি ও একদিন বয়সি মুরগির বাচ্চা, হাঁস, টারকি, স্বাদু পানি ও সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির মতো খাদ্যসামগ্রীকে আগের মতোই অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের তালিকায় রাখা হয়েছে। তালিকায় আরও আছে আলু, পেঁয়াজ, বাদাম, ডাল, ভুট্টা, আটা-ময়দা, সয়াবিন বীজ, সূর্যমুখীর বীজ, সরিষার বীজ, শাকসবজির বীজ, সুগার বিট, ওয়েল কেক, পশু খাদ্য ও ভিটামিনসামগ্রী, ইউরিয়া সার, জিংক সালফেট, পটাশিয়াম ক্লোরাইড, তুলা, কম্পিউটার প্রিন্টার ও কালি, প্রিন্টারের যন্ত্রাংশ মোমিরা কার্ডসহ মোট ১৮৯ আইটেমের পণ্যকে অব্যাহতির তালিকায় রাখা হয়েছে।

অবশ্য এ তালিকা থেকে দেশে উৎপাদিত বিদেশি ফল ও সবজি বাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন ক্যাপসিকাম, ব্রুকলি, গাজর। এসব পণ্য আনতে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর দিতে হবে।

আর ২ শতাংশ অগ্রিম কর বহাল রয়েছে যেসব পণ্যে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রসুন, ক্লিংকার, কেরোসিন, জেট ফুয়েল, ফার্নেস ওয়েল, বিউটেন, প্রপেন, ডিজেল, পেট্রোলিয়াম, বিটুমিন, রড, এঙ্গেল, বার, মোবাইল ফোন, মোবাইল ফোনের সার্কিট বোর্ড, মাদার বোর্ড, কিপ্যাড, এয়ারফোন, মাইক্রোফোনসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি এবং পশম ছাড়া ভেড়ার চামড়া।

এর বাইরে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা, মটরডাল, সব ধরনের ডাল, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ভুট্টা, আটা-ময়দা, লবণ, পরিশোধিত তেল, চিনি, কালো গোলমরিচ, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, খেজুর, তেজপাতা, পাট, তুলা, সুতাসহ সব ধরনের ফল সরবরাহের ক্ষেত্রে ভিত্তিমূল্যের ওপর ২ শতাংশ হারে উৎসে কর বহাল থাকছে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও গবেষণা সংস্থা বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আবুল কাশেম খান বলেন, কোনো কর অগ্রিম নেওয়ার যৌক্তিকতাই নেই। হোক সেটা অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বা আগাম কর (এটি)। এ করোনা পরিস্থিতিতে সেটা তো আরও ভয়াবহ। এটি বা এআইটি নেওয়া হলে ব্যবসার ক্যাশ ফ্লো কমে যায়। তখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।

পণ্য সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর হারে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। যেমন ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর হার ৩ শতাংশ করা হচ্ছে। বর্তমানে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎসে করের দুটি স্লাব আছে। ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ২ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৩ শতাংশ।

এছাড়া আগামী বাজেটে ৫০ লাখ টাকা থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত উৎসে কর হার ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। বর্তমানে ৫০ লাখ টাকা থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ৪ শতাংশ উৎসে কর বহাল আছে। আর এক কোটি টাকার বেশি সরবরাহের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কর বহাল আছে। আসন্ন বাজেটে ২ কোটি টাকার বেশি সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর ৭ শতাংশ করা হচ্ছে।

গতবারের চেয়ে আরও বড় বাজেটের চ্যালেঞ্জ নিতে যাচ্ছে সরকার। ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের বাজেট প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়, যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা বেশি।

গতকাল রোববার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে জুম প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত সম্পদ কমিটি ও বাজেট সমন্বয় কাউন্সিলের বৈঠকে আগামী অর্থবছরের বাজেটের এমন রূপরেখা সাজানো হয়েছে। এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে সংযুক্ত ছিলেন এমন একজন সচিব এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সূত্র জানায়, মোটা দাগে আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্য থাকবে করোনা ভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলা করা। এজন্য অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করার নানা উদ্যোগ থাকবে। বিশেষ গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাজেটের অন্যতম উদ্দেশ্য। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা এই রূপরেখা এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরে বাজেটের সম্ভাব্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ছয় লাখ দুই হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। সার্বিকভাবে তিন লাখ ৮৯ হাজার ৭৮ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকছে। এতে বাজেটের ঘাটতি দাঁড়াবে দুই লাখ ১৩ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি। দেশের ইতিহাসে এত বড় ঘাটতি নিয়ে বাজেট কখনও করেনি সরকার। এই ঘাটতি অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে মেটানো হবে। আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি আশা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এজন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে দুই লাখ ২৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ ব্যয়ের বড় অংশ থাকবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, অবকাঠামো উন্নয়নে। আগামী অর্থবছরে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ মূল্যস্ম্ফীতি হবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়।

করোনা ভাইরাসের কারণে গত বছরের মার্চ থেকেই অর্থনীতি নানাভাবে সমস্যায় পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার ছোট হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কমেছে। নিম্ন আয় ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এতে বড় শিল্প ও সেবা খাতে কিছুটা গতি পেলেও সাধারণ মানুষের কষ্ট কমেনি। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগেই নতুন করে করোনার বিস্তার বেড়েছে। লকডাউন ব্যবস্থায় যেতে হয়েছে সরকারকে। এতে জীবনযাত্রা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সরকার আশা করছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৬ দশমিক ১ শতাংশ। মূল বাজেটে যা ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। একইভাবে কমানো হয়েছে বাজেট বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রাও। অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করছে, চলতি অর্থবছরে পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা ব্যয় করা যাবে। মূল বাজেটে পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। রাজস্ব আয়েও ব্যাপক সংশোধন এনেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছরের বাজেটে তিন লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, যা সংশোধন করে তিন লাখ ৫১ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সংশোধিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৯৭ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা।

এদিকে চাল, তেল, সবজি এবং খাদ্যবহির্ভূত অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়লেও অর্থবছর শেষে মূল্যস্ম্ফীতি মূল বাজেটের মতোই ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হবে বলে মনে করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ