শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

ফরিদ আহমদের ভাগ্যবিড়ম্বনা

সম্প্রতি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, সরকারি ত্রাণসহায়তা নম্বরে ফোন দিয়ে বড় ধরনের বিপত্তিতে পড়েছেন ফরিদ আহমদ নামের জনৈক ব্যক্তি। এমনকি তাকে এজন্য চড়া মাশুলও গুণতে হয়েছে। যা একজন সাহায্যপ্রার্থীর ভাগ্যবিড়ম্বনা বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ, বিপদাপন্ন সাহায্যপ্রার্থী তো কোন সাহায্য পান-ই নি বরং এজন্য তাকে রীতিমত বড় ধরনের জরিমানাও গুনতে হয়েছে। যা আমাদের আমলাতন্ত্রের বিচ্যুতি ও সুশাসনের অনুপস্থিতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। বিষয়টি সভ্য সমাজের জন্য মোটেই  শোভন নয়।
যদিও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন বিষয়টি ভুলবোঝাবুঝি বলে উল্লেখ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিষয়টিকে এভাবে সরলীকরণ করা যৌক্তিক বা সঙ্গত মনে করার কোন সুযোগ নেই। কারণ, মধ্যবিত্তের কেউ সরকারি ত্রাণ সহায়তা চাইলে তা গোপন করাই বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে তো গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়নি বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আর্থিক দণ্ডসহ জনসমক্ষে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়েছে। এই দণ্ড দেয়ার ক্ষেত্রে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার আরও দায়িত্বশীল হওয়ায় কাক্সিক্ষত ছিল।
জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে ৩৩৩ নম্বরে ফোন দিয়ে সরকারি ত্রাণসহায়তার অপরাধে জনৈক্য ব্যক্তিকে শাস্তির মুখোমুখি হওয়ায় ঘটনা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসনের টনক নড়েছে। বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি। ততদিনে একজন অসহায় মধ্যবিত্ত মানুষকে গুণতে হয়েছে বড় ধরনের অর্থদণ্ড। যা তার জন্য মোটেই সহজসাধ্য ছিল না।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা প্রশাসনের ভাষ্য, খাদ্যসহায়তা করতে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি চারতলা বাড়ি এবং হোসিয়ারি কারখানার মালিক। তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাঁকে ৩৩৩ ফোন করে অযথা হয়রানি ও সরকারি সময় নষ্ট করার দায়ে শাস্তি হিসেবে ১শ গরিব লোককে খাদ্যসহায়তা করার জন্য দুই দিন সময় বেঁধে দিয়ে আসেন। যদিও পরে জানা যায়, ফরিদ আহমদের এক ছেলে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, দুই মেয়ে রয়েছে। তিনি একটি হোসিয়ারি কারখানায় পাঁচ-ছয় হাজার টাকা বেতনের কাজ করেন। পরে ফরিদ আহমদ তাঁর বড় মেয়ের স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে  এবং চড়া সুদে ঋণ করে ও ধার করে ১০০ প্যাকেট খাদ্য জোগাড় করে ইউএনওর উপস্থিতিতে বিতরণ করেন। ফরিদ আহমদের এই হয়রানির ঘটনা জানাজানি হলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন।
তদন্ত কমিটির পক্ষে জানানো হয়েছে, ৩৩৩ নম্বরে ফোন পেয়ে ইউএনও খাদ্যসহায়তা দিতেই তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন। তবে ফরিদ আহমদের চারতলা বাড়ির মালিক এবং তিনি সচ্ছল, এই বিষয়টি নিয়ে ভুলবোঝাবুঝি হয়েছে দাবি করে তদন্ত কমিটির প্রধান। তিনি জানিয়েছেন, আপাতত বিষয়টির সমাধান হয়েছে। ফরিদ আহমদকে সমাজের বিত্তবানদের একজন সেই খাদ্য বিতরণের টাকা ফেরত দিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে তার কোনো অভিযোগ নেই।
বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তা যত সহজভাবে নিয়েছেন আসলে বিষয়টি তত সহজ নয়। একজন অভাবগ্রস্ত মানুষের সাথে উপজেলা প্রশাসন যে আচরণ করেছে তা রীতিমত দায়িত্বহীনতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার। ফরিদ আহমদকে ভুল দণ্ড দেয়ার কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে দিয়েছেন সমাজের একজন বিত্তবান মানুষ। কিন্তু যারা ভুল দণ্ড দিয়েছেন তাদেরই দায়িত্ব ছিল এই ক্ষতি পোষাণা। ভিকটিম যে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়েছেন এটি কীভাবে সমাধান করবেন স্থানীয় প্রশাসন? আর এভাবেই ফরিদ আহমদরা প্রতিনিয়ত ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার হন। আমরা শুধু নীরব দর্শক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ