শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

খালেদা জিয়ার বিদেশযাত্রা নিয়ে দিনভর আলোচনা 

# দ্রুতই সিদ্ধান্ত জানানো হবে--আইনমন্ত্রী  

ইবরাহীম খলিল : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসায় বিদেশ নেয়ার বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার  সন্ধ্যা পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোন সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।  আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হবে। সব শেষ গতকাল খালেদা জিয়ার করোনা রিপোর্ট  নেগেটিভ আসলেও করোনা পরবর্তী শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন তিনি। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে বলে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বরাবরই সরকারের পক্ষ থেকে নেতিবাচক মনোভাব দেখানো হচ্ছিল। সবশেষ খালেদা জিয়ার ভাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বিদেশে যাওয়ার আবেদন করলে নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় আসে। আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে যায়। সব শেষ সরকারের পক্ষ থেকে কি সিদ্ধান্ত আসে সেদিকে তাকিয়ে দেশের  মানুষ।  

উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি গতকাল সারাদিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সবখানে আলোচনার বিষয় ছিল খালেদা জিয়ার বিদেশযাত্রা। ফলে বিষয়টি ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়। খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে ছিল পুরো দেশ। 

মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে গতকাল মেডিকেল বোর্ড দেখা করে তার সঙ্গে। এর আগে ডাক্তাররা জানিয়েছেন, চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। এ কথা জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

অধ্যাপক জাহিদ গতকাল বলেন, মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা উনার (খালেদা জিয়ার) যেসব পরীক্ষা করানো হয়েছিল সেগুলো রিভিউ করেছেন। উনারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার চেস্ট দেখেছেন। কিছু ট্রিটমেন্ট এডজাস্টমেন্ট করেছেন এবং সেই অনুযায়ী উনার চিকিৎসা চলছে। তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে উনি যে অবস্থায় ছিলেন এখন উনি সেই অবস্থাতে আছেন। উনার চিকিৎসা চলছে। দেশবাসীর কাছে বিএনপি চেয়ারপারসনের রোগমুক্তির জন্য দোয়া করার অনুরোধ জানান তিনি। গত মঙ্গলবার সকালের দিকে শ্বাসকষ্ট অনুভব করলে চিকিৎসকরা বিকেলে খালেদা জিয়াকে সিসিইউতে স্থানান্তর করেন।

এভারকেয়ার হাসপাতালে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ শাহাবুদ্দিন তালুকদারের তত্ত্বাবধায়নে ১০ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গত মঙ্গলবার দুপুরে খালেদা জিয়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো পর্যালোচনা করেন। গত ২৭ এপ্রিল গুলশানের ওই হাসপাতালে ভর্তির পরদিনই এই মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর গত ১১ এপ্রিল থেকে গুলশানের ভাড়াবাসা ‘ফিরোজা’য় থেকে ব্যক্তিগত চিকিৎসক টিমের তত্ত্বাবধায়নে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন খালেদা জিয়া। ১৪ দিন পর আবার পরীক্ষা করা হলে তখনো তার করোনাভাইরাস ‘পজেটিভ’ আসে।

এরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ২৭ এপ্রিল রাতে তাকে এভারকেয়ার হাসপপাতালে নেয়া হয়। চেস্টের সিটি স্ক্যান ও কয়েকটি পরীক্ষার পর সেই রাতেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর পরিবারের আবেদনে সরকার গত বছরের ২৫ মার্চ ‘মানবিক বিবেচনায়; শর্তসাপেক্ষে তাকে সাময়িক মুক্তি দেয়। তখন থেকে তিনি গুলশানে নিজের ভাড়াবাসা ফিরোজায় থেকে ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার সাথে বাইরের কারো যোগাযোগ সীমিত।

খোঁজ রাখছেন প্রধানমন্ত্রী : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খোঁজ খবর রাখছেন বলে জানিয়েছেন, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর রাখছেন। খালেদা জিয়া দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ এপ্রিল রাত ১০টার দিকে করোনা আক্রান্ত খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সিটি স্ক্যানসহ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় তার। গত ১১ এপ্রিল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন ৭৫ বছর বয়সী খালেদা জিয়া। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তার করোনা পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসে। তবে তার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। শ্বাসকষ্ট রয়েছে। ডায়াবেটিকসের মাত্রা ওঠা নামা করছে। তাকে অক্সিজেন দেয়া হয়েছে। 

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য  

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে সরকারের কাছে করা আবেদনটি মানবিকভাবে দেখা হচ্ছে জানিয়ে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, এখানে আদালতের কোনো বিষয় জড়িত নেই। নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়েছেন। এখন মানবিকভাবেই আবেদনটি নিষ্পত্তি করা হবে। গুলশানে নিজ বাসভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে আইনমন্ত্রী বলেন, নির্বাহী আদেশে দুটি শর্তে বিএনপি চেয়ারপারসনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। প্রথম শর্ত হচ্ছে তিনি বাসায় থেকেই চিকিৎসা নেবেন। দ্বিতীয়টি ছিল বিদেশে চিকিৎসা নেবেন না। এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নিতে তার পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। সরকার মানবিক দিক বিবেচনা করেই এ আবেদন নিষ্পত্তি করবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বুধবার রাত ১১টার দিকে আমাদের মন্ত্রণালয়ের সচিবের হাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত আবেদনটি পৌঁছেছে। আইনি দিক বিশ্লেষণ করে এবং মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে আমরা খুব তাড়াতাড়ি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেব আশা করছি।

এর আগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের কাছে আবেদন করা হয়। খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার এই আবেদন করেন। ওই আবেদনপত্র পর্যালোচনার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।  

 এদিকে ঢাকার এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার পোস্ট-কোভিড নানা জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় ‘মানবিক’ কারণে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান।

রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলটির উদ্যোগে সারাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রামণে নিহত দলীয় নেতাকর্মীদের পরিবারকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঈদ উপহার প্রদান উপলক্ষে এই অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানে মহানগর বিএনপির ১০ জন নেতাকর্মীর পরিবারকে ঈদ উপহার তুলে দেন বিএনপি মহাসচিব।

অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কোভিডোত্তর যে পোস্ট-কোভিড জটিলতা হয়, সেই জটিলতা কিন্তু মাঝে মাঝে টার্ন নেয় বিভিন্ন দিকে। উনার (খালেদা জিয়ার) যে বয়স, বিভিন্ন রোগ আছে, এর আগে প্রায় তিন বছর কারাগারে ছিলেন, এখনও তিনি অন্তরীণই আছেন। এই অবস্থার প্রেক্ষিতেই তার জটিলতা সৃষ্টি।’

তিনি বলেন, ‘এ জন্য আমাদের দেশের প্রায় বেশির ভাগ মানুষের  ইচ্ছা যে, তার চিকিৎসাটা উন্নত কোনও হাসপাতালে হওয়া উচিত। বাংলাদেশে উন্নত হাসপাতালেই তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন। আরও উন্নত বিদেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব কিনা। আপনারা  জানেন যে, গতকাল তার পরিবার থেকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য অনুমতি চাওয়া হয়েছে। আমরা আশা করি, সরকার মানবিক কারণে তার বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন এবং এই দেশের ১৮ কোটি মানুষের সবচেয়ে প্রিয় নেতার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন।’

খালেদা জিয়ার চিকিৎসার অবস্থা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা জানেন, করোনায় আক্রান্ত হয়ে বেগম খালেদা জিয়া গত ২৭ এপ্রিল থেকে এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাকে এখানে সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং আমাদের চিকিৎসকরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তার চিকিৎসা করছেন।’ তিনি বলেন, ‘নিজেদের নেতাকে সুস্থ দেখতে চাওয়া বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার। 

বিশিষ্টজনের উদ্বেগ  

খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনেরা।  উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। বৃহস্পতিবার দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাকিব আনোয়ার স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে তিনি এই উদ্বেগের কথা জানান।

মান্না বলেন, ‘যতদূর জেনেছি বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। কারাবন্দি হওয়ার আগে থেকেই তার বেশ কিছু অসুখ ছিল। প্রায় দুই বছর কারাবন্দি থাকায় সেগুলো মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এরই মধ্যে তিনি করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। সব মিলিয়ে বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থা বেশ উদ্বেগজনক। এই অবস্থায় সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং একজন বীর উত্তমের স্ত্রী হিসেবে তার সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।’

 কোভিড ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে সিসিইউতে স্থানান্তরের সংবাদে দেশবাসীসহ আমরাও উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডি’র সভাপতি আ স ম আবদুর রব।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে রব এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ খালেদা জিয়ার জীবন সুরক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। তার উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিতকরণে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক সার্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এবং প্রয়োজনে তাকে বিদেশে প্রেরণ করে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সম্পন্ন করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানাচ্ছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ