ঢাকা, শনিবার 8 May 2021, ২৫ বৈশাখ ১৪২৮, ২৫ রমযান ১৪৪২ হিজরী
Online Edition

স্পিডবোট দুর্ঘটনা: চালকদের অধিকাংশই উচ্ছৃঙ্খল-মাদকাসক্ত

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: নৌরুটের স্পিডবোট চালকদের অধিকাংশ উচ্ছৃঙ্খল আর বেপরোয়া মনোভাব সম্পন্ন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা।  

সোমবার (০৩ মে) দুর্ঘটনার শিকার স্পিডবোটটির চালকও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না বলে জানা গেছে।

মাঝ পদ্মায় বেপরোয়াভাবে বোট চালিয়ে আসছিলেন যাত্রীদের নিষেধ সত্ত্বেও! সোমবার চালকদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের আলোচনাই ছিল সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।  

জানা গেছে, স্বল্প সময়ে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় বিধায় এটি যাত্রীদের কাছে খুবই জনপ্রিয় একটি রুট। বিআইডব্লিউটিএর তথ্য অনুযায়ী নৌরুটে নিয়মিত চলাচল করছে ৮৬টি ছোট-বড় লঞ্চ, ১৬টি ফেরি।  

এদিকে নিবন্ধিত না থাকায় স্পিডবোটের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। তবে উভয় ঘাট মিলিয়ে ২শ এর বেশি রয়েছে বলে ঘাট সূত্রে জানা গেছে।

এই নৌরুট দিয়ে চলাচলকারী যাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সময় স্বল্পতার কারণে নৌরুটটি জনপ্রিয় হলেও নৌরুটের নৌযানগুলোর চালক ও শ্রমিকদের আচার-আচরণ খুবই বাজে এবং আক্রমণাত্মক। এই নৌরুট দিয়ে বিশেষ করে স্পিডবোটে চলাচলকারী অনেক যাত্রীই সামান্য অনিয়মের প্রতিবাদ করেও বিভিন্ন সময়ে চালকদের দ্বারা অপদস্ত হওয়ার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। আর বিভিন্ন সময়ে স্পিডবোট দুর্ঘটনার মূলেই রয়েছে এসব চালকদের বেপরোয়া, খামখেয়ালিপনা এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনোভাব।

যাত্রী এবং ঘাট সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাড়তি ভাড়া আদায়, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ভারী ব্যাগ নিলে বাড়তি টাকা আদায় এবং শিশুযাত্রীদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত টাকা আদায়সহ নানা অনিয়ম নিয়ে যাত্রীদের কেউ প্রতিবাদ করলে কখনো মাঝ পদ্মায় গিয়ে আবার কখনো ঘাটে গিয়ে সংঘবদ্ধ হয়েও যাত্রীদের অপদস্ত করে স্পিডবোট চালকেরা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা অপদস্ত হওয়ার ভয়ে নিরবেই এসব মেনে নিয়ে পার হয় প্রমত্তা পদ্মা।

ঘাট সূত্রে জানা গেছে, ৯০ এর দশকে এই নৌরুটে ফেরির পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের পারাপারের একমাত্র বাহন ছিল ট্রলার। পরবর্তী সময়ে আধুনিক বাহন হিসেবে যুক্ত হয় লঞ্চ। ২০০২ সালের দিকে স্পিডবোট জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। সেই সময়ে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি বোট চলাচল করতো এই নৌরুটে। বর্তমানে রয়েছে কমপক্ষে ২ শতাধিক স্পিডবোট। স্পিডবোটের সংখ্যা ও ভাড়ার পরিমাণ বাড়তে থাকার সঙ্গে অনেকটা পাল্লা দিয়েই যেন বাড়তে থাকে স্পিডবোট দুর্ঘটনার মাত্রাও। প্রাণহানি, নিখোঁজ, পঙ্গুত্বের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।

শীত মৌসুমে ঘনকুয়াশা, বর্ষা মৌসুমে স্রোতের তীব্রতা, বৈরী আবহাওয়ায় ঢেউয়ের দাপট এবং সন্ধ্যার পর রাতের আধাঁরে বাধাহীন চলাচল স্পিডবোট দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম বলে বিবেচিত। এর পাশাপাশি রয়েছে চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, নিয়ন্ত্রণহীন গতি আর মাদকে আসক্তি।

সরেজমিনে ঘাট ঘুরে জানা গেছে, বোট চালানোয় কোনো প্রশিক্ষণ নেই তাদের। আর চালকদের বেশির ভাগই উঠতি বয়সী তরুণ। বিশেষ করে পদ্মার ঘাট এলাকার এক শ্রেণির বখাটে, মাদকাসক্ত যুবকরাও স্পিডবোট চালক হিসেবে রয়েছে। আর এদের কাছেই বিভিন্ন সময়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা।  

নিয়ন্ত্রনহীন গতির কারণে ঘটছে দুর্ঘটনাও। তাছাড়া প্রতিটি ট্রিপেই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহন করে এসব স্পিডবোট। ১৪ জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন বোটে তোলা হয় ২০ জন যাত্রী। ২০ জনের ধারণক্ষমতার বোটে ২৪/২৫ জন। আবার ২৮ জনের বোটে ৩৫/৪০ জন যাত্রীও বহন করে থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাবাজার ঘাট এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, চালকদের চেহারা দেখলেই তো বোঝা যায় ওরা কেমন! বেশির ভাগই ইয়াবা-গাঁজায় আসক্ত। আর বয়স কম থাকায় উগ্রতাও বেশি এদের মধ্যে। এরা বোট নিয়ে পদ্মায় নামলে কোনো কিছুর তোয়াক্কা করে না। এদের কাছে সাধারণ যাত্রীরা জিম্মি হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরেই।

মো. সোবাহান নামের সাবেক এক চালক জানান, স্পিডবোট চালানোর ক্ষেত্রে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই কোনো চালকেরই। সিনিয়র একজনের সঙ্গে থেকে থেকে চালানো রপ্ত করেছে প্রায় সব চালকই। আর তরুণ চালকেরা বোট নিয়ে পদ্মায় নেমে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। খেয়ালখুশি মতো স্পিডবোট চালায়।

ঘাটের স্পিডবোট চালকেরা জানিয়েছে, প্রতিটি স্পিডবোট দিনে আসা-যাওয়ায় দুটি/তিনটি করে ট্রিপের সিরিয়াল পায়। আর ইঞ্জিনভেদে জ্বালানি খরচ হয় কমপক্ষে ২২ লিটার/২৫ লিটার। দুই, তিন এবং চার ট্রিপে প্রতিদিন চালকেরা পান যথাক্রমে ৫শ, ৮শ এবং ১ হাজার টাকা। এদের কোনো মাসিক বেতন নেই।

জানা গেছে, চালকদের অর্ধেকের বেশিই পেশাজীবী চালক নয়। শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়া পদ্মার ঘাট কেন্দ্রিক শিশুরাই নিজেদের পকেট খরচ চালানোর জন্য কিশোর বয়সে এসে স্পিডবোটের চালক হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘লকডাউনে’ লঞ্চ ও স্পিডবোট বন্ধ থাকলেও কিছু অসাধু বোট মালিক তাদের বোট চালু রেখেছে। আমরা সার্বক্ষণিক চেষ্টা করি যাতে বোট চালাতে না পারে। কিন্তু শিমুলিয়া থেকে বেশির ভাগ বোট যাত্রী নিয়ে এসে ঘাটের আশপাশের চরে যাত্রী নামিয়ে দিচ্ছে আবার ঘাটের আশপাশ থেকে যাত্রী উঠাচ্ছে। আসলে আমাদের জনবল কম, নেই কোনো নৌযানও। সব মিলিয়ে ঠিকমতো তদারকি করা যাচ্ছে না।

বিআইডব্লিউটিএর বাংলাবাজার লঞ্চ ঘাটের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আক্তার হোসেন বলেন, লকডাউনে স্পিডবোট বন্ধ রাখার বিষয়ে আমাদের একাধিকবার বলার পরও বাংলাবাজার ঘাটের কিছু এবং শিমুলিয়া ঘাটের স্পিডবোট চালকেরা বোট চালিয়ে যাচ্ছে। তারা এ সময়ে ঘাটে বোট না রেখে নদীর পাড়ের বিভিন্ন স্থানে রেখে বোট চালাচ্ছে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান জানান, বাংলাবাজার ঘাটটি আমরা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি। যাতে করে ‘লকডাউনে’ কোনো বোট না চলতে পারে। আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের টিমেরও নজরদারি রয়েছে। তবে শিমুলিয়া থেকে যাত্রী নিয়ে এসব স্পিডবোট এই পাড়ে এসে ঘাটের বাইরে গিয়ে যাত্রীদের ওঠানামা করায়। এ বিষয়ে নৌপুলিশকে নজরদারি রাখতে বলা হয়েছে।

সোমবার সকাল ৬টার দিকে শিমুলিয়া থেকে যাত্রী বোঝাই একটি স্পিডবোট কাঁঠালবাড়ী ঘাটে নোঙর করে রাখা একটি বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে স্পিডবোটের ২৬ যাত্রীর মৃত্যু হয়। চালকসহ আহত হয় ৬ জন।

সূত্র: বাংলানিউজ

ডিএস/এএইচ

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ