বৃহস্পতিবার ১৭ জুন ২০২১
Online Edition

চিকিৎসার্থে খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেয়া অত্যন্ত জরুরি -মেডিকেল বোর্ড

স্টাফ রিপোর্টার : করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নেয়ার সুপারিশ করেছে তার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ড। চিকিৎসকরা বলছেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেয়া অত্যন্ত জরুরি। গতকাল মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করতে গঠিত মেডিকেল বোর্ড সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বৈঠক করে। বিএনপি চেয়ারপার্সনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন।
জানা গেছে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড মনে করে, খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেয়া অত্যন্ত জরুরি। তার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। ফুসফুসের পানি কমেছে। তবে অক্সিজেন সাপোর্ট এখনও চলছে।
গতকাল সকালে হাসপাতালে বেগম খালেদা জিয়াকে দেখে এসে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, ম্যাডামের অবস্থা আলহামদুলিল্লাহ। উনার পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব রিপোর্টগুলো নিয়ে ১০ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড দুপুরে বসছেন। এরপর সব কিছু জানানো যাবে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত মেডিকেল বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্রিফিং না করলেও একাধিক বোর্ড সদস্য জানান, বেগম জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত বিদেশে নেয়া জরুরী। তারা বিষয়টি দল ও সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে।
এভারকেয়ার হাসপাতালে বিএনপি চেয়ারপারসন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ শাহাবুদ্দিন তালুকদারের তত্ত্বাবধায়নে চিকিতসাধীন। গত ২৭ এপ্রিল গুলশানের ওই হাসপাতালে ভর্তির পরদিনই তার জন্য ১০ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এই মেডিকেল বোর্ডে বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক টিমের প্রধান অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী, অধ্যাপক এজেডেএম জাহিদ হোসেন ও ডা. মোহাম্মদ আল মামুন রয়েছেন।
জানা গেছে, করোনা আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার গেল সোমবার সকালের দিকে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। এ অবস্থায় তার দল ও পরিবার চাচ্ছে তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করাতে। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল) এএম আমিনউদ্দিন জানিয়েছেন, খালেদা জিয়াকে বিদেশ নিয়ে যেতে হলে আদালতের সম্মতি লাগবে। মঙ্গলবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্টে নিজ কক্ষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা জানান। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারা অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়েছে সরকার। এখন এটা (বিদেশ নিতে) করতে গেলে আদালতে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, ওনার (খালেদা জিয়ার) চিকিৎসা কতটুকু প্রয়োজন। বাংলাদেশে কী আছে, না আছে, সবকিছু দেখে সরকার বিবেচনা করবে। সরকার যদি প্রয়োজন মনে করে, যদি আইন অনুযায়ী প্রয়োজন হয়, তাহলে সরকার আদালতে আসবে। কারণ এটা তো সরকারি আদেশ, সরকারই এটা ঠিক করবে।
উন্নত চিকিৎসার জন্য বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিতে চায় তার দল ও পরিবার। তার চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। এজন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তার পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করা হয়েছে।  বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাতে খালেদা জিয়ার ভাই শামীম ইস্কান্দার ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে টেলিফোনে খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নেওয়ার বিষয়ে আলাপ করেন। তারা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করেন।  জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার বলে বিএনপি মহাসচিবকে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে সরকারের অন্যান্যদের সঙ্গে আলাপ করে পরবর্তীতে জানানো হবে।
জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম সোমবার দিবাগত রাতে বলেন, খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে লিখিত কোনো আবেদন এখনো করা হয়নি। দলের চেয়ারপার্সনের জন্য দোয়া চেয়ে মঙ্গলবার জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও মহান মে দিবস ২০২১ উপলক্ষে এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা নিশ্চয়ই সবাই উদ্বিগ্ন খালেদা জিয়ার অসুস্থতার খবরে। দলের নেতাকর্মীরা এখনও উদ্বেগের মধ্যে আছেন দেশনেত্রীর শারীরিক অবস্থা কী রকম এ নিয়ে। আপনারা সবাই শুনেছেন যে, গত ৩ মে তার একটু শ্বাসকষ্ট হওয়ায় সিসিইউতে নেওয়া হয়েছে। এখনও তিনি সিসিইউতে আছেন। অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। এখন তিনি স্থিতিশীল আছেন। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর কাছে খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া চাইছি। শুধু দল নয়, সমগ্র জাতি আজকে প্রার্থনা করছেন, দোয়া করছেন। এই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের শেষ আশ্রয়স্থল, যাকে গণতন্ত্রের একমাত্র প্রহরী বলা যায়, তিনি যেন অতি দ্রুত সুস্থতা লাভ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আবেদন করা হয়নি। গতকাল রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের নাজনীন স্কুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে কর্মহীন অসহায় মানুষের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া যে সাজা ভোগ করছিলেন পরিবারের নিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা স্থগিত রেখে বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার সুবিধা করে দিয়েছেন। আমরা যতটুক জানি তিনি এখন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার ইচ্ছা অনুযায়ী চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তাকে চিকিৎসা দিচ্ছেন এ পর্যন্ত আমাদের জানা। খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করার জন্য সরকারের কাছে কোনো আবেদন করা হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তার পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আবেদন বা নিবেদন করা হয়নি। তিনি যেন দেশে উন্নত চিকিৎসা পান সেই ব্যবস্থা প্রধানমন্ত্রী করে দিয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানোর জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হলে সরকার কি পদক্ষেপ নেবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি আদালতের বিষয়। প্রধানমন্ত্রী যে ধারায় তার সাজা স্থগিত রেখে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন, এখন আরও কিছু পেতে হলে তাকে আদালতের মাধ্যমে আসতে হবে।
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর গত ১১ এপ্রিল থেকে গুলশানের ভাড়া বাসা ‘ফিরোজা’য় থেকে ব্যক্তিগত চিকিৎসক টিমের তত্ত্বাবধায়নে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন খালেদা জিয়া। ১৪ দিন পর আবার পরীক্ষা করা হলে তখনও তার করোনাভাইরাস ‘পজিটিভ’ আসে। এরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ২৭ এপ্রিল রাতে তাকে এভার কেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। চেস্টের সিটিস্ক্যান ও কয়েকটি পরীক্ষার পর সেই রাতেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে ‘ফিরোজা’র বাসায় বিএনপি চেয়ারপারসন ছাড়াও আরও ৮ জন করোনায় আক্রান্ত হন। তবে ফিরোজার সব স্টাফরা ইতোমধ্যে করোনামুক্ত হয়েছেন।
৭৫ বছ বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কথিত দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে কারাগারে যেতে হয়। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু পর পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বছরের ২৫ মার্চ সরকার নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে তাকে ছয় মাসের জন্য সাময়িক মুক্তি দেয়। পরে আরও দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। মুক্তি পাওয়ার পর খালেদা জিয়া গুলশানে ভাড়া বাসা ফিরোজায় থেকে ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তার সঙ্গে বাইরের কারও যোগাযোগ সীমিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ