শনিবার ০৮ মে ২০২১
Online Edition

স্পিডবোট সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি শিমুলিয়া ঘাটের যাত্রীরা

নাছির উদ্দিন শোয়েব : মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে স্পিডবোট দুর্ঘটনায় ২৬ জনের প্রাণহানির পর বেরিয়ে আসছে ভয়ঙ্কর তথ্য। কোনো নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে চালকরা সিন্ডিকেট করে চালাচ্ছে শত শত স্পিডবোট। যাদের নজরদারি থাকার কথা তাদেরই ছত্রছায়ায় চলছে এসব অনিয়ম। অভিযোগ আছে, ঘাটের প্রশাসনকে ম্যানেজ করে যাত্রীদের জিম্মি করে প্রচণ্ড প্রতাপে অবৈধভাবে স্পিডবোট চালানো হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া, মাদারীপুরের বাংলাবাজার ও শরীয়তপুরের মাঝির ঘাট নৌপথে লঞ্চ ও ফেরির সঙ্গে যাত্রী পরিবহন করছে স্পিডবোট ও ট্রলার। এই তিনটি ঘাটে অন্তত চার শতাধিক স্পিডবোট চলাচল করে। স্পিডবোটে ৩০ থেকে ৩৫ জন এবং ট্রলারে ৮০ থেকে ১০০ জন যাত্রী বহন করা হয়। স্পিডবোট ও ট্রলার চলাচলে কোনো সরকারি অনুমতি নেই। তাদের কোনো লাইফ জ্যাকেটও দেয়া হয় না।
এদিকে মাদারীপুরের শিবচরে বাল্কহেডে ধাক্কা দিয়ে স্পিডবোটের ২৬ যাত্রীর প্রাণহানির ঘটনায় শিমুলিয়া ঘাটের ইজারাদার, বোটের মালিক-চালকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সোমবার গভীর রাতে শিবচর থানায় মামলাটি করেন নৌ-পুলিশের এসআই লোকমান হোসেন। আর সোমবার রাতেই ২৬টি লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শিবচর থানার ওসি মিরাজ হোসেন জানান, দুর্ঘটনায় ঘাটের ইজারাদার ইয়াকুব বেপারী, বোটের মালিক কান্দু মোল্লা, জহিরুল ইসলাম ও চালক শাহ-আলমের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। মামলায় আরও ১০-১২ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। গত সোমবার সকালে বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌপথের কাঁঠালবাড়ী ঘাট এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা বাল্কহেডে (বালু টানা কার্গো) ধাক্কা দিয়ে উল্টে যায় যাত্রীবোঝাই স্পিডবোট। সেখান থেকে একে একে উদ্ধার করা হয় শিশুসহ ২৬ জনের লাশ। জীবিত উদ্ধার করা হয় পাঁচজনকে। এ ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে আহত বোটচালককে। আহত চালক এখন পুলিশ পাহারায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার অধিকাংশ মানুষ এই পথে যাতায়ত করে থাকেন। দ্রুত যাওয়ার জন্য অনেক সময় স্পিডবোটে পদ্মা পাড়ি দিতে হয়। দ্রুত পাড়াপাড়ের জন্য ঘাটের দুই পাড়ে রয়েছে শত শত স্পিডবোট। দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকায় স্পিডবোটে পদ্মা পাড়াপাড়ের ব্যবস্থা চালু আছে। কিন্তু দ্রুত যাতায়ত করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ বোট চালকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। কোনো আইনকাননের তোয়াক্কা না করে সিন্ডিকেট গড়ে তোলছে চালক, মালিক ও ইজারাদাররা। বিআইডব্লিউটিসি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের ছত্রছায়ায় চালকরা কাউকে তোয়াক্কা করছে না। প্রতিটি স্পিডবোটে দুই থেকে তিনগুন যাত্রী ওঠানো হয়। একেকটি বোটে সর্বোচ্চ ১০-১২ জন যাত্রীর ধারণ ক্ষমতা থাকলেও কয়েকজন যাত্রী  তোলা হয়। প্রতিটি স্পিডবোটে ৩০ থেকে৩৫ মজন যাত্রী তোলা হয়। ঘাটের সিন্ডিকেটের কারণে কেউ এর প্রতিবাদ করতে পারে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ বাধ্য হয়ে স্পিডবোটে ওঠেন। সময় বাঁচাতে কখনো কখনো জীবন চলে যায়। এমনকি মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বের পথে জনপ্রতি সড়ে তিন থেকে চারশত টাকা করে নেয়া হয়। ঘাটে যাত্রী বোঝাই ছাড়া স্পিডবোট ছাড়েন না চালকরা। যাত্রীদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাদেরকে লাইফ জ্যাকেট বা বয়া কোনো কোনো কিছুরই ব্যবস্থা নেই।  
ভুক্তভুগীরা জানান, স্পিডবোটের চালকরা এতটাই প্রতাপশালী যে যাত্রীদের কথা তারা শোনে না। একের পর এক যাত্রী তুলে ডুবুডুবু অবস্থায় ঘাট থেকে ছাড়া হয় স্পিডবোট। নারী-শিশু, বৃদ্ধদের নিয়েও অনেকে বাধ্য হয়ে ওঠেন। দ্রুত অন্যপারে যাওয়ার জন্য চালকরা বেপরোয়াভাবে চালায়। একপার থেকে দ্রুত পৌঁছতে পারলে অন্য পারে আগে সিরিয়াল পাওয়া যাবে এই প্রতিযোগীতায় বেপরোয়া চালায় তারা। কখনো পদ্মায় ঢেউয়ের মধ্যেও ঘাট থেকে ছেড়ে দেয়া হয় স্পিডবোট। ঝড়ের কবলে পড়ে এরআগেও পদ্মার মাঝে স্পিডবোট উল্টে গিয়ে প্রানহানির ঘটনা ঘটেছে। কে কার আগে যাবে এই প্রতিযোগিতা করে সংঘর্ষ ঘটেও স্পিডবোট দুর্ঘটনা ঘটে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে অনেক দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের টনক নড়েনি। রাতে দুর্ঘটনা ঘটলে লাশও খুঁজে পাওয়ার অবস্থা থাকে না। এছাড়াও স্পিডবোটে যাত্রী তুলে মাঝপদ্মায় লুটতারাজের ঘটনাও ঘটেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, তিনি অন্তত ১৫ বছর ধরে এই পথ দিয়ে যাতায়াত করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্পিডবোট চালক, মালিক, ইজারাদার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দেখছেন। তিনি বলেন-ঘাটে এসে যাত্রীরা চালকদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। প্রতিবাদ করলে উল্টো হয়রানীর শিকার হতে হয়। এমনকি যাত্রীরাদের নাজেহাল পর্যন্ত করা হয়। চালকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদকারী যাত্রীর ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। মান সম্মানের ভয়ে অনেকে এখন আর প্রতিবাদ করতে চান না। কেননা ঘাটের দুই পাশে স্পিডবোট চালক, মালিক এবং ইজারাদার সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ মানুষ অসহায়। এখানে কোনো ঘটনা ঘটলে যাত্রী বা প্রতিবাদকারীর পক্ষে কথা বলার কেউ সাহস পায় না। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও সহায়তা পাওয়া যায় না। ঘটে নৌ পুলিশের ফাঁড়ি থাকলেও প্রয়োজনে তাদের কাউকে পাওয়া যায় না। এমনকি ঘাটে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা যাত্রীদের অভিযোগ শোনে না। তারা স্পিডবোট চালকদের পক্ষে অবস্থান নেয়।
জানা গেছে, চলমান লকডাউনে গণপরিবহনের সঙ্গে এই নৌরুটে গত ৫ এপ্রিল থেকে লঞ্চ ও স্পিডবোট বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ২৭ এপ্রিল থেকে নৌরুটে চলাচল শুরু করছে স্পিডবোট। দ্বিগুণ থেকে তিনগুন  ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের পারাপার করা হচ্ছে। ফেরিতে উঠতে ব্যর্থ এবং দ্রুত যাওয়ার তাড়া থেকে যাত্রীরা স্পিডবোটে বাড়তি ভাড়া দিয়েই পারাপার হচ্ছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সিরাজুল কবির বলেন, ঘাটে যাত্রীদের প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। পল্টুন থেকে কোনো স্পিডবোট ছাড়ছে না। কিছু কিছু স্পিডবোট ঘাটের বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী পারাপার করছে। আমরা সেখানে গেলেই তারা দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করে। তবে আমরা চেষ্টা করছি যাতে অবৈধভাবে স্পিডবোট যাত্রী পার না করতে পারে। তিনি আরও বলেন, লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ থাকার নির্দেশনা রয়েছে। সে নিয়ম উপেক্ষা করে অবৈধভাবে স্পিডবোটটি চলছিল। এটি কখন, কোন স্থান থেকে ছেড়ে গেছে তা জানা যায়নি।
জানা গেছ, সারা দেশে রুট পারমিট আছে মাত্র ২০টি স্পিডবোটের। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধন নিয়েছে ৩৪০টি। বাকিগুলো চলছে রুট পারমিট ছাড়াই। এমনকি মুন্সীগঞ্জ ও মাদারীপুর কেন্দ্রীক পদ্মায় যে শত শত স্পিডবোট চলছে তার একটিরও কোনো পারমিট নেই। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে সোমবার স্পিডবোট দুর্ঘটনায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, সেটিরও নিবন্ধন বা রুট পারমিট কোনোটি ছিল না। যে বালুবাহী (বাল্কহেড) জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছে, তার নাম এমভি সাফিন সায়হাম। এ জাহাজটিরও নিবন্ধন নেই। নিবন্ধন ছাড়াই বি আইডব্লিউটিএ, নৌপরিবহণ অধিদপ্তর, নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব নৌযান চলাচল করেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালীদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেই চলে অবৈধ এসব নৌযান।
বি আইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মাওয়ায় সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট। ওইদিন দিন-দুপুরে এমভি পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়। নিখোঁজ হয় অর্ধশতাধিক। ওই লঞ্চটি আর উদ্ধার হয়নি। ওই ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লঞ্চ ও স্পিডবোট নিয়ন্ত্রণে আনতে পদক্ষেপ নেয় নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়। কিন্তু এক পর্যায়ে তা গতি হারায়। তারা আরও বলেন, ওই দুর্ঘটনার পর মাওয়া রুটে আর লঞ্চ ডোবেনি। তবে প্রায় স্পিডবোট দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। সর্বশেষ সোমবার স্পিডবোট দুর্ঘটনায় ২৬ জনের মৃত্যু হলো। সোমবারের দুর্ঘটনার পর মাদারীপুরের শিবচরে কাঁঠালবাড়ীর বাংলাবাজার পুরোনো ঘাটে স্পিডবোট দুর্ঘটনার তদন্তে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বি আইডিব্লিউটিএ) যুগ্ম-পরিচালক (নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) মো. ইকবাল আলমকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, স্পিডবোট দুর্ঘটনায় ২৬ জনের প্রাণহানির ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই গতকাল  মঙ্গলবারও মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে স্পিডবোট ছাড়ছে। যাত্রীদের নামিয়ে দিচ্ছে মাদারীপুরের বাংলাবাজারের অদূরে চরের মধ্যে। বাংলাবাজার ঘাটে নৌ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কোনো নজরদারি দেখা যায়নি। নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক আবদুর রাজ্জাক বলেন, দুর্ঘটনায় চালক, দুজন মালিক ও ঘাট ইজারাদারকে আসামি করে মামলা হয়েছে। ওই কাজে ব্যস্ত থাকায় ঘাটে যাওয়া সম্ভব হয়নি তাদের। তা ছাড়া এই ফাঁড়িতে আটজনের জনবল রয়েছে। নদীতে দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো নৌযান নেই। তাই তীরে হেঁটেই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ