শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

প্রাক-বাজেট ভাবনা ও অতীতবৃত্ত

ইবনে নূরুল হুদা : জাতীয় বাজেটে রাষ্ট্রের বার্ষিক ব্যয় ও আয়ের সম্ভাব্য পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়। তাই প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্যই বাজেট অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আমাদের দেশেও নতুন অর্থবছরের প্রাক্কালে জাতীয় সংসদে জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আমাদের বাজেটগুলো জনপ্রত্যাশা পূরণে খুব একটা সহায়ক হয়নি। আমরা কখনো জনবান্ধব ও সুষম বাজেট পাইনি বলে অভিযোগটা বেশ পুরনো বরং বাজেটগুলো বরাবরই অসমতার দোষে দুষ্ট। এই ‘অসম’ কথাটা আবার ‘ঘাটতি’র বৃত্তেই সীমাবদ্ধ। আর প্রতিবছরই আমাদের বাজেট ঘাটতির পরিসর বাড়ছে। এর পূর্বাভাস মিলেছে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রাক্কলনেও। প্রাপ্ত তথ্যমতে, আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ছয় লাখ এক হাজার ৫শ ১১ কোটি টাকা। এতে ঘাটতিই ধরা হয়েছে দুই লাখ ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। জিডিপির অংশ হিসেবে ঘাটতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ। যা একটি নতুন রেকর্ড।
জানা গেছে, করোনার কারণে চলতি বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত দুই শতাংশেরও বেশি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। গত বছরের জুনে যখন চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয় তখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়া এবং দেশব্যাপী ‘কঠোর লকডাউন’-এর কারণে এখন মনে হচ্ছে এই প্রবৃদ্ধি কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই নতুন প্রাক্কলনে এই প্রবৃদ্ধির হার কাটছাঁট করে ৬ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আগামী অর্থবছরে মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধির আবারো একটি উচ্চাভিলাষী প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘বাজেট ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ কমিটি’র এক ভার্চুয়াল বৈঠকে  এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফলে আগামী অর্থবছরের বাজেট যে গতানুগতিকই হবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে বাজেটের আকার ছয় লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করতে পারে। এতে মোট রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হয়েছে তিন লাখ ৮৯ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১১ দশমিক ২ শতাংশ। মোট রাজস্বের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকেই আয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ৩০ হাজার ৭৮ কোটি টাকা; যা জিডিপির ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ধরা হয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। যা নতুন সমস্যার সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
 বৈঠকে রাজস্ব আয়ের বিষয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। এনবিআর বলেছে, করোনার কারণে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যাহত হচ্ছে। রাজস্ব আদায়েও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে বৈঠকে চলতি বছরে রাজস্ব আদায়ে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল আগামী অর্থবছরের জন্যও একই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অতীতের বাজেট ঘাটতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১শ ৯০ কোটি টাকা। ঘাটতি এক লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। মূল বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ ছিল এক লাখ ২৫ হাজার ২শ ৯৩ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি ছিল এক লাখ ১২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। ঘাটতি ৬৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।
দেশে প্রতিবছরই উচ্চাভিলাসী বাজেট ঘোষণা করা হয়। যা প্রায় ক্ষেত্রেই হয় বাস্তবতাবিবর্জিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ প্রবণতা আরও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপরও ঘোষিত বাজেটকে সরকার সবসময়ই জনবান্ধব আখ্যা দিয়ে থাকে। কিন্তু বিরোধী মহলগুলো ঘোষিত বাজেটকে গণবিরোধী হিসাবে আখ্যা দিয়ে আসছেন প্রথাগতভাবে। কিন্তু ঘোষিত বাজেটগুলো প্রকৃতপক্ষেই জনবান্ধব কি না তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট কেমন হবে তা প্রাথমিক প্রাক্কলন থেকে অনুমান করা গেলেও এখনই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট মন্তব্য করার সময় আসেনি। তবে তা যে অতীতের বৃত্তে বৃত্তাবদ্ধ হবে বলে কিছুটা অনুমান করা যায়। কিন্তু এ বিষয়ে প্রাক-ধারণা নেয়ার জন্য বিদায়ী অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা করা দরকার।
২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩ লক্ষ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। যা ২০১৯-২০ অর্থ বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৯.৮২% বেশি। অথচ বিগত অর্থবছরে ৩ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বিপরীতে জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। তারপরে এত বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ছিল বাস্তবতার সাথে একেবারের সঙ্গতিহীন।
২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারের পরিচালনা ব্যয় ধরা হয় ৩ লক্ষ ১১ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। অথচ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ ২ লক্ষ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। অনুন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হবে ৬৫ হাজার ৮৬ কোটি টাকা এবং পেনশন বাবদ ব্যয় হবে ২৭ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ৯৩ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। তাছাড়া পণ্য বা সেবা সরবরাহ ও যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনা খরচে বরাদ্দ রাখা হয় ৩৪ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাবদ খরচ ৮% এবং ব্যবস্থাপনা খরচ ৭% বৃদ্ধি করা হয়। মূলত, সরকারের মোট বাজেটের ২২.৫৮% ব্যয় হয়ে যাচ্ছে এসব খাতে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল, যার সিংহভাগই বরাদ্দ ছিল উন্নয়ন কর্মসূচিতে। অথচ বর্তমানে উন্নয়ন কর্মসূচির তুলনায় পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে সংশোধিত বাজেটের পরিমাণ ঘোষিত বাজেটের তুলনায় ছিল অনেক বেশি। তাই বিদায়ি অর্থবছরে উন্নয়ন কর্মসূচি বরাবরের মতই উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে বিদায়ি অর্থবছরের বাজেট যে সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিপরীতে শ্রেণি তোষণ ছিল তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে প্রত্যক্ষ কর তথা আয়করের উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও পরোক্ষ কর তথা ভ্যাটের চাপে মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল বিপর্যস্ত। কারণ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর থেকে রাজস্ব আয় ৩১.৫০% এবং ভ্যাট থেকে ৩৭.৯৩%, আমদানি শুল্ক থেকে ১৩.০৫% এবং সম্পূরক শুল্ক থেকে ১৭.৫২% লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। অথচ ২০১৯-২০ অর্থবছরে আয়কর থেকে ৩৪.২৪% এবং ভ্যাট থেকে ৩৬.৫৫% রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আয়ের অনুপাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ক্রয়ে মধ্যবিত্ত তার আয়ের সিংহভাগ ব্যয় করে। তাই মধ্যবিত্তের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয়ের সময় অতিরিক্ত ভ্যাট দিতে হয়েছে। আর প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থার অস্বচ্ছতার দিকেই অঙ্গুলী নির্দেশ করে। তাই আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি ১০.৮৮% এবং মধ্যম আয়ের দেশের তুলনায় সর্বনিম্ন।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৩শ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রফতানি হয়েছে। তবে এপ্রিলে সেটি হ্রাস পেয়ে ৫২ কোটি ডলারে নেমেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে অর্থবছরের দশ মাস শেষে রফতানি কমে গেছে ১৮%। করোনায় বৈশ্বিক পণ্য রফতানি বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় রফতানি আয়ের উৎসে কর ০.২৫% থেকে বৃদ্ধি করে ০.৫% বৃদ্ধি করাকে অর্থনীতিবিদরা যৌক্তিক মনে করেন নি। তাছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে খোলা এলসির ওপর ২% হারে ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে। আর এর নেতিবাচক প্রভাবে বাজার পরিস্থিতি ছিল অস্থির হয়ে পড়েছে। যা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ২৫.৩% অর্জনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা বিদায়ী অর্থবছরে বাড়িয়ে ১৬.৭০% নির্ধারিত হয়। অথচ অতীতে প্রদত্ত ঋণের মেয়াদ হ্রাসকরণসহ, খেলাপি ঋণ আদায় এবং মন্দঋণ শনাক্তকরণে কোনো দিকনির্দেশনা এই বাজেটে ছিল না। পাশাপাশি, ব্যাংক ও ক্লায়েন্ট নির্ভর সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করার কারণে প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধাভোগী হতে পেরেছেন বিশেষ একটি শ্রেণি। রফতানিমুখী শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তাদের বর্তমানে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে চলতি মূলধনের অভাব। এই সংকট মোকাবিলায় ১ লাখ কোটি টাকার ওপর প্রণোদনা ঘোষণা করলেও এই প্রণোদনার সুফল নিশ্চিত করতে ঋণ প্রদান প্রক্রিয়াকে সহজতর করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি।
করোনা পরবর্তী সময়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে বাজেটের মোট বরাদ্দের মাত্র ০.৯৬% ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে মাত্র ২.৯৮% বরাদ্দ করা হয়। তাছাড়া কৃষি অবকাঠামো উন্নয়নে এডিপিতে ২ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা এডিপির মাত্র ১.২%। অথচ আমাদের বড় বড় প্রকল্পের বরাদ্দের কমতি নেই। সড়ক ও বিদ্যুৎ বিভাগ বরাদ্দের শীর্ষে। বিদ্যুৎ বিভাগের আওতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ক্যাপাসিটি পেমেন্টের নামে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে চুক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে।
অথচ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা ও সরকারিভাবে আর কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার প্রতিষ্ঠা এবং বীজ সংরক্ষণে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়নি। যে খাতে দেশের ৪২% মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে, সেই খাতে মোট এডিপির ১.২% বরাদ্দ। বাস্তবতা হলো-কৃষিকে সুরক্ষা দিতে পারলে দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব। তাই জনমুখী চাহিদাকে প্রাধান্য দিতে ১০টি ফাস্টট্র্যাক প্রকল্পের মধ্যে যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনসাধারণের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট, সেসব প্রকল্প অগ্রাধিকার-ভিত্তিতে বাস্তবায়নের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি উঠেছে নতুন অর্থবছরের বাজেটে।
এডিপিতে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ০.৯% বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিগত অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে ৪ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এই সামান্য বরাদ্দ নিয়ে স্বাস্থ্যখাতে করোনার মত মহামারিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় মানবসম্পদের নিয়োগ প্রদান আকাশকুসুম চিন্তা বৈ কিছু নয়। তারপরও যতটুকু বরাদ্দ রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা গেলে কিছুটা হলেও উন্নতি সম্ভব হতো। কিন্তু বাংলাদেশে এডিপি বরাদ্দের ব্যয় ৯ মাসে হয় ৪০%। আর অবশিষ্টাংশ ৬০% হয় পরবর্তী ৩ মাসে। যা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়।
গত একদশকে প্রবৃদ্ধি উৎসাহব্যঞ্জক হওয়া সত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের চাপে জর্জরিত বাংলাদেশ। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির চেয়ে বিদ্যমান কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ। একইভাবে ঘোষিত বাজেটগুলোতে রাজস্ব ঘাটতি ও অর্থায়নও বড় ধরনের সমস্যা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যম কর্মক্ষম জনশক্তি। আর এই প্রবৃদ্ধির ভোক্তা জনগণ। যদি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন না হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধি কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না।
এমতাবস্থায় অতীতবৃত্ত থেকে বেড়িয়ে এসে রাজস্ব আয় সম্প্রসারণ করে বাজেট ঘাটতি কমনো, উন্নয়ন খাতে ব্যয়বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা নতুন বাজেটের বড় চ্যালেঞ্জ। একই সাথে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় প্রকৃত অংশীজন ঋণ প্রদান নিশ্চিত করা দরকার। করোনা মহামারির কারণে অসংখ্য মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন, রফতানিমুখী শিল্পশ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন এবং কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না-তাদের জন্যও নতুন বাজেটে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দরকার। তাই কাল্পনিক রাজস্ব আয় বা কাল্পনিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং কর্মসংস্থান বান্ধব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ ও মানুষ বাঁচানোর জনমুখী বাজেট সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র শ্রেণি তোষণ, ক্ষমতাবান্ধব ও অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করা যাবে না। নতুন বাজেট হতে হবে অবশ্যই উৎপাদনশীল ও গণমুখী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ