শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

পশ্চিম বাংলার নির্বাচন

গেরুয়া শিবিরের অনেক আশা ছিল এবার পশ্চিম বাংলায় ক্ষমতায় আসবে বিজেপি। শুধু বিজেপি’র কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতারাই নয়, গোটা সংঘ পরিবার অনেকটাই নিশ্চিত ছিল তাদের জয় নিয়ে। অনেক হিসাব-নিকাশ এবং পরিকল্পনা করা সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত ফলের কাছাকাছিও যেতে পারেনি তারা। তারা তাদের ব্যর্থতা নিয়ে কোন কূলকিনারা করতে পারছেন না। তবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যে পশ্চিম বাংলার মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
গত ২ মে দিনব্যাপী টানটান উত্তেজনার মধ্যেই দফায় দফায় ভোট গণনা চলেছে। শুরু থেকেই মমতা বন্দোপধ্যায়ের তৃণমূল খানিকটা এগিয়ে ছিল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে গেরুয়া শিবিরের সাথে তৃণমূলের ভোটের ব্যবধানটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুরুতেই কোলকাতার জনপ্রিয় দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ‘আবার দিদিই ফিরছেন?’ শিরোনাম করলেও অল্পক্ষণের মধ্যে শিরোনাম থেকে ‘প্রশ্ন চিহ্ন’ তুলে দেয়া হয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে, তৃণমূলের বিজয় ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। যদিও শেষ পর্যন্ত দলনেত্রী মমতা বন্দোপধ্যায় নিজ দলের দলত্যাগী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরেছেন।
এবারের নির্বাচনকে বিজেপি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করেছিল। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে কেন্দ্র থেকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ অনেক কেন্দ্রীয় নেতারা সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন। যেকোন মূল্যে পশ্চিম বাংলায় ক্ষমতায় আসার জন্য মরিয়া ছিল গেরুয়া শিবির। পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা আত্মবিশ্বাসীও হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু পশ্চিম বাংলার মানুষ নীরবে তৃণমূলের পক্ষে ভোট বিপ্লব ঘটিয়েছে। ফলে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে তৃণমূল।
নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায় শুধু হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপিকে ভোট দেয়নি বরং তৃণমূল ২০১৬ সালের বিজয়ের ধারাবাহিকতা ভালভাবেই রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছে। যে রাজ্যে মোটামুটি ৭৫ শতাংশ হিন্দুর ভোট, সেখানে হিন্দু বাঙালি যদি বিজেপিকে ঢেলে ভোট দিত, যেমনটা তারা দিয়েছিল ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে, তাহলে বিজেপির বিজয় ঠেকানো যেত না।
২০১৪ সালের লোকসভা থেকে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির হিন্দু ভোট ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৭ শতাংশ হয়েছিল। এই মেরুকরণ ২০২১ সালে আরও তীব্র হবে বলে আশা করেছিল বিজেপি শিবির। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার মেরুকরণের রাজনীতি ব্যর্থ করে দিয়েছে পশ্চিম বাংলার হিন্দু ভোটাররা। তবে তারা বিজেপিকে কিছু ভোট দিয়েছে বলেও মনে করছেন নির্বাচন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাই বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি পুরোপুরি সফল না হলেও একেবারে ব্যর্থ হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘বাংলায় মেরুকরণের রাজনীতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায় নি বরং এক্ষেত্রে বিজেপি’র বড়ধরনের অর্জনও রয়েছে। কারণ, হিন্দুদের একটা বড় অংশ অবশ্যই বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। অন্যথায় দলটি ২০১৬ সালের ৩ থেকে এখন ৭৭-এ পৌঁছাতে পারতো না। অবশ্য অন্য সব রাজ্যের ক্ষেত্রে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের পর যেটা দেখা গিয়েছিল, সেটা এখানেও হয়েছে। লোকসভা থেকে বিধানসভা ভোটে বিজেপির ভোট ১২ থেকে ১৬ শতাংশ কমেছে সব রাজ্যেই। পশ্চিম বাংলাও তা থেকে আলাদা থাকে নি।
তবে একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, হিন্দুদের একটা বড় অংশ তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি অনেকাংশে পাল্টে গেল এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। একদিকে একটা হিন্দু ভোটব্যাংক তৈরি হলো, অন্যদিকে তৈরি হলো একটা ধর্মনিরপেক্ষ ভোট। রাজ্য থেকে অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস।
গত নির্বাচনের তুলনায় তৃণমূলের আসন সামান্য বেড়েছে। অপরপক্ষে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে না পারলেও অগের তুলনায় অনেক আসন বেশি পেয়েছে। ফলে উগ্র সাম্প্রদায়িক উত্থান ঘটতে শুরু করেছে তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ