রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

মা-বাবা-দুই বোনের দাফন শেষে অকূল পাথারে শিশু মীম!  

খুলনা অফিস : মাদারীপুরের শিবচরে পুরাতন কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাট এলাকায় পদ্মা নদীতে বালুভর্তি বাল্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোটের ধাক্কায় নিহত খুলনার একই পরিবারের ৪ জনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় জানাজা নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে নিহত মনিরের মায়ের পাশে সারিবদ্ধভাবে তাদের দাফন করা হয়েছে। এর আগে রোববার রাতে নানির মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তাকে দেখতে পরিবারের সব সদস্য স্পিডবোটে করে তেরখাদার পারোখালীর উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। পথে দুর্ঘটনায় মারা যায় মীম ছাড়া সবাই।  নিহতরা হলেন- তেরোখাদার পারোখালী এলাকার মনির শিকদার, তার স্ত্রী হেনা বেগম, শিশু কন্যা সুমি ও রুমি খাতুন। ৫ সদস্যের পরিবারটির একমাত্র সন্তান হিসেবে জীবিত আছে বড় মেয়ে ৮ বছরের মীম। মা-বাবা ও বোনদের হারিয়ে বেঁচে থাকা মীম যেন অকূল পাথারে পড়েছে। পরিবারে এখন আর কেউ নেই তার।

মা-বাবা, দুই বোনকে হারিয়ে শিশু মিমের কান্না যেন থামছে না। অবুঝ এই শিশুকে সান্তনা দেওয়ার ভাষাও নেই স্বজন-প্রতিবেশীদের। এই শিশু এখন কীভাবে কোথায় থাকবে, তার ভবিষ্যৎ কী হবে-এ নিয়ে এখন স্বজন-প্রতিবেশীরা চিন্তিত। মিমের কান্নায় চোখ ভিজে উঠছে তাদেরও।

তেরখাদা উপজেলা চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে মীমের জন্য এক লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মীম বড় হওয়া এবং তার বিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা তার ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করবো বলে এলাকাবাসীর কাছে ওয়াদা দিয়েছি।

এর আগে সোমবার (৩ মে) রাত ৭টার দিকে তেরখাদা উপজেলা সদরের পারোখালী গ্রামে মনির শিকদারের বাড়িতে তাদের লাশগুলো এসে পৌঁছে। সেই থেকে বাড়িসহ পুরো এলাকায় চলছে শোকের মাতম। জানা যায়, ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন মনির শিকদার। তিন মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন মিরপুরে। রোববার রাত ৮টায় খুলনার তেরখাদার বাড়িতে মারা যান মনির শিকদারের মা। মায়ের লাশ দেখতে পরিবারের সবাইকে নিয়েই খুলনার উদ্দেশে রওনা হন মনির। কিন্তু মায়ের লাশ দেখতে যেতে সবাইকেই যে লাশ হতে হবে-তা কে জানতো। এক শোক কাটিয়ে না উঠতেই আরেক শোকে মুহ্যমান সবাই। তেরখাদা সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এফএম অহিদুজ্জামান বলেন, মাদারীপুরের শিবচরের ঘটনাস্থল থেকে সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে লাশগুলো তেরখাদায় আনা হয়েছে। এক শোক কাটিয়ে উঠতেই আরেক শোকে পড়লাম সবাই। পারোখালী গ্রামের বাসিন্দা মনির শিকদারসহ পরিবারের ৫ জনের মৃত্যু হওয়ায় অনেক আত্মীয়-স্বজন এখনো এসে পৌঁছাতে পারেননি, তাই মঙ্গলবার সকালে লাশগুলো দাফন করা হয়।

মনির শিকদারের বেয়াই কিসমত হাওলাদার জানান, ৪ ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন মনির শিকদার। ৫ সদস্যের পরিবার নিয়ে সুখের সংসার ছিল তাদের। এখন কি থেকে কি হয়ে গেল বুঝতে পারছি না।

মনির শিকদারের ভাই কামরুজ্জামান জানান, রোববার রাতে মা লাইলী বেগম (৯০) বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তিকাল করেন। মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ থেকে ওয়াল্টনের শো-রুম বন্ধ করে দিয়ে বাড়ি ফেরেন কামরুজ্জামান। রোববার রাতে সাহরি সেরে ঢাকা থেকে তেরখাদায় বাড়ির উদ্দেশে তিন মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ফিরছিলেন মনির শিকদার। পদ্মা নদীর শিবচর এলাকায় পৌঁছে মনির শিকদারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার ভাতিজা মিরাজ শিকদারের। সেখানে শেষ কথা হয়েছিল তাদের। মিরাজ তার নানিকে নিয়ে আগের স্পিডবোটে পদ্মা পেরিয়ে তেরখাদায় এসেছিল। পরে জানা গেল-মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় পদ্মা নদীতে একটি বালুভর্তি বাল্কহেডের সঙ্গে যাত্রীবাহী স্পিডবোটের সংঘর্ষে ২৬ জন নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় স্ত্রী হেনা বেগম, কন্যা সুমি আক্তার (৭), রুমি আক্তার (৪) ও মনির শিকদার নিহত হন। প্রাণে বেঁচে আছে শুধু তাদের ৯ বছর বয়সী মেয়ে মীম আক্তার। কামরুজ্জামান বলেন, তাদের লাশ পারিবারিক কবরস্থান আমার মায়ের পাশে সারিবদ্ধ করে দাফন করেন। কথা শেষ না করেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন তিনি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ