শুক্রবার ১৪ মে ২০২১
Online Edition

বিশাল জয় ॥ মমতার সামনে প্রতিশ্রুতি পূরণের অনেক চ্যালেঞ্জ

মুহাম্মদ নূরে আলম : ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হ্যাটট্রিক এই জয়ে তিনি অর্জন করেছেন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তবে নন্দীগ্রামের আসনে হারলেও মমতার মুখ্যমন্ত্রী হতে বাধা নেই। মমতা-ঝড়ে উড়ে গেছে মোদি-শাহের বিজেপি। প্রতিপক্ষ যতই শক্তিধর হোক মমতা বন্দোপাধ্যায় আবার এটা প্রমাণ করে দিলেন যে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনীতিতে তিনি এখনো অপরাজেয়। তবে গত রোববারের এই জয়ের পর তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বসে থাকেননি মমতা। গতকাল সোমবারই দুপুরে দলের জয়ী প্রার্থীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন তিনি। তার জনপ্রিয়তা হয়তো ১০ বছর আগের তুলানায় কিছুটা কমে গেছে, কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস আবারও বিপুল বিজয় পেয়েছে, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে বহু পিছনে ফেলে। বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আনার জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার পশ্চিমবঙ্গে সভা করেছেন তবু ভোটের লড়াইয়ে টিকতে পারেননি পায়ে চোট পেয়ে হুইলচেয়ারে বসে প্রচারাভিযান চালানো মমতার সাথে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মোট আসন ২৯৪টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সরকার গড়তে কোনো একটি দল বা জোটকে জয়লাভ করতে হবে অন্তত ১৪৮টি আসনে। আর মমতার  তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ২১৬ টি আসন। গোটা রাজ্যজুড়ে ৭৮হাজার ৭৯৯টি কেন্দ্রে চলে ভোটগ্রহণের কাজ।  শুধু পোলিং বুথ বা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নয়, ৮০ বছরের বেশি বয়সের ভোটারদের জন্য নির্বাচন কমিশন ঘরে বসে ভোটদানেরও ব্যবস্থা করেছিল। তবে ভারতের বাইরে বসবাসরত ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা ছিল না এই নির্বাচনে। নতুন ভোটারের সংখ্যা ২০ লাখ ৪৫ হাজার ৫৯৩। তবে মোদী-শাহের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছেন, বিশাল জয় পেয়েছেন, এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে অপেক্ষা করছে আরো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিশ্রুতি পূরণের চ্যালেঞ্জ। যে প্রতিশ্রুতি তিনি ভোটের আগে ইস্তাহারে দিয়েছেন। সেই তালিকাটা রীতিমতো লম্বা। আগামী পাঁচ বছরে যদি তিনি সেই প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারেন, তা হলে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিপুলভাবে উপকৃত হবেন। কিন্তু সেই সব প্রতিশ্রুতি পালন করা রীতিমতো কঠিন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম প্রতিক্রিয়া, বাংলা পারে। এটা বাংলার জয়। পরে বললেন, এই জয় বাংলার মানুষকে বাঁচিয়ে দিল। নন্দীগ্রামের খবরে মমতা বললেন, আমরা পুনর্গণনা চাই। আদালতে যাওয়ার কথাও বললেন। তবে মমতা জানিয়ে দিয়েছেন, এখন বিজয় উৎসব নয়। এখন প্রথম কাজ, করোনার মোকাবিলা করা। তাই সকলের জন্য বিনা পয়সায় মোদীর কাছ থেকে টিকা চেয়েছেন। না দিলে ধরনার হুমকিও।
জন্মলগ্নের পরে এই প্রথম বামেদের কোনো প্রতিনিধি বিধানসভায় থাকবেন না। বাম জোটের তরফে বিমান বসু বলেছেন, জনগণ বিজেপি-কে পরাস্ত করতে চেয়েছিলেন। তাই তৃণমূল লাভবান হয়েছে। আমরা যৌথ পর্যালোচনা করব। এই হার থেকে শিক্ষা নেব। আমাদের দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল।
ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি চুপ: ভোটের কিছুদিন আগে দল গঠন করেছিলেন ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি। ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফ। তারা হাত মেলায় বাম ও কংগ্রেসের সঙ্গে। জোটের হয়ে একমাত্র জয় আব্বাসের ভাই নওসাদ সিদ্দিকির। কিন্তু এরপর প্রতিক্রিয়া দেননি আব্বাস। তবে দিল্লিতে কংগ্রেস মুখপাত্র বলেছেন, আইএসএফের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভালো হয়েছে না ভুল হয়েছে, তা পরে পর্যালোচনা করা হবে। অনেকের মনেই এই প্রশ্ন জাগতে পারে, কেমন করে পশ্চিমবঙ্গের এবং সর্বভারতীয় রাজনীতির এত বড় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে পারলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়।
বিজয়ী প্রার্থীদের নিয়ে মমতার বৈঠক: টানা তৃতীয় দফায় সরকার গঠনের পর সম্ভাব্য নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। জয়ের ইঙ্গিত পাওয়ার পরই তৃণমূলের এই শীর্ষ নেত্রী হয়তো ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য মন্ত্রিসভার ছক সাজিয়ে রেখেছেন। গতকাল সোমবার দুপুরের বৈঠকে সেটা সকলের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করতে পারেন তিনি।
অনেক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে মমতা: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিশ্রুতি, পাঁচ বছরে ৩৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য রেখার থেকে উপরে তোলা হবে। তার মানে বছরে সাত লাখ অত্যন্ত গরিব মানুষ একটু স্বাচ্ছন্দ্যের মুখ দেখবেন। তারপর অতি-গরিব মানুষের সংখ্যা থাকবে মাত্র পাঁচ শতাংশ। কীভাবে এই কাজ করা হবে, তার কোনো রূপরেখা ইস্তাহারে নেই।
ইস্তাহারের প্রতিশ্রুতি, প্রতি বছর পাঁচ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান হবে। রাজ্যে এখন বেকারের সংখ্যা বলা হয়েছে ২১ লাখ। প্রতি বছর নতুন বেকার যুক্ত হয়। পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান দিয়ে পাঁচ বছর পরে বেকারের সংখ্যা অর্ধেক হবে বলে দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জিডিপি বাড়বে এবং শিল্পের বিকাশ ঘটবে, তাতেই কর্মসংস্থান তৈরি হবে। সাধারণ মানুষের কাছে এটা কোনো বার্তা দেয় কি? দেয় না। বরং এর চেয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি হলো, আগামী এক বছরে বিভিন্ন সরকারি দফতর ও পুলিশে এক লাখ ১০ হাজার খালি পদ পূরণ করা হবে।
শিল্পের প্রতিশ্রুতি: রাজ্যে প্রতি বছর ১০ লাখ ছোট ও মাঝারি শিল্প হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। পাঁচ বছরে বড় শিল্পের দুই হাজারটি ইউনিট যুক্ত হবে। আর বিনিয়োগ হবে পাঁচ লাখ কোটি টাকা। মানে বছরে এক লাখ কোটি টাকা। এই তিনটি প্রতিশ্রুতি রূপায়ণ করা রীতিমতো কঠিন। বিশেষ করে অতীত অভিজ্ঞতার নিরিখে। যিনি অর্থ ও শিল্পমন্ত্রী হবেন, তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়ার মতো প্রতিশ্রুতি।
নির্বাচনের ফলকে পরাজয় মানতে নারাজ বিজেপির দিলীপ: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ২০০-র কাছাকাছি আসন পাবে বলে জানিয়েছিলেন দলটির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল তিন অংকে তো দূরের কথা ৮০ আসনও পার করতে পারেনি দলটি। স্পষ্টতই মুখ থুবড়ে পড়েছে বিজেপি। তবে এরপরও দলটি নির্বাচনের এই ফলকে পরাজয় হিসেবে মানতে নারাজ। নির্বাচনের ফল স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর দিলীপ ঘোষ বলেন, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আমরা মাত্র ৩ আসনে জিতেছিলাম। সেই জায়গায় ৫ বছরে আমরা যেখানে পৌঁছেছি সেটা কম নয়। এ প্রসঙ্গে দিলীপ বলেন, লোকসভা আর বিধানসভা নির্বাচনের ফলের মধ্যে ফারাক ছিল। আমার অনেক শক্তি বাড়িয়েছি। কিন্তু রাজ্যের মানুষ আমাদের বিরোধী দল হিসেবেই দেখতে চাইছে। আমরা সেই দায়িত্ব পালন করব।
প্রার্থী না হয়েও জিতলেন মমতার ভাইপো: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের মতো বিজেপির রথী-মহারথীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাশে শক্ত অবস্থান নিয়ে ছিলেন তারই ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনে প্রার্থী হননি তিনি। কিন্তু এরপরও নির্বাচনী কাজ পরিচালনা ও প্রচারণায় ঘুরেছেন গোটা রাজ্য। আর তাই প্রার্থী না হয়েও দলের জন্য বিপুল জয় ছিনিয়ে আনলেন অভিষেক।
হারলেও মমতার মুখ্যমন্ত্রী হতে বাধা নেই: পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পেয়েছে মমতা বন্দোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। পরিহাসের বিষয় হলেও নানা নাটকীয়তার পর হেরে গেছেন স্বয়ং মমতা। বিধায়ক নির্বাচিত না হওয়ায় তার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। ভোট গণনা বন্ধ ও স্থগিতের পর নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নন্দীগ্রাম আসনে বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে। তার এক সময়ের ডানহাত ও সম্প্রতি দল বদলে বিজেপিতে যাওয়া শুভেন্দুর কাছে হেরেছেন মমতা। বিশাল জয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো তৃণমূল রাজ্যে সরকার গঠনের জনরায় পেলেও মমতা বন্দোপাধ্যায় কি রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারবেন। মমতার মুখ্যমন্ত্রিত্ব নিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে দেখতে হবে দেশটির সংবিধান এ সম্পর্কে কি বলা হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের ১৬৩ ও ১৬৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হতে হলে ভারতের নাগরিক হতে হবে এবং বয়স হতে হবে ২৫ বা তার বেশি। এছাড়া হতে হবে বিধানসভার সদস্য। তবে শর্তসাপেক্ষে বিধানসভার সদস্য না হয়েও মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যাবে।
মুসলিম ও সংখ্যালঘু ভোট: এবার বিধানসভা নির্বাচনে ভাগ্য নির্ধারণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে মুসলিম ভোট বলে বিশ্লেষকরা নির্বাচনের আগে থেকেই দাবি জানিয়েছেন। ইন্ডিয়া টুডেসহ কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছিল, এ বছর বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৩০ ভাগ ভোটার মুসলমান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচনে যেই জিতুক, ব্যবধান হবে অল্প। ফলে, ২৭ থেকে ৩০ ভাগ মুসলিম ভোটকে এখানে ফলাফল নির্ধারক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, হিন্দুত্ববাদ ও বাংলাদেশিদের অনুপ্রবেশের মতো বিষয় নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। বিজেপি সাম্প্রদায়িক শক্তি নিয়ে প্রচারণায় নামায় অন্য দুই দল- তৃণমূল ও কংগ্রেস-বামফ্রন্টের কাছে মুসলিমদের ভোটের গুরুত্ব বেড়েছে। ভোটের এই মেরুকরণেরই সুবিধা পেতে চাইছে বিজেপি।
এবারের নির্বাচনে আলোচিত ছিল, কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোটে যোগ দেওয়া পশ্চিমবঙ্গের ফুরফুরা শরীফের আব্বাস সিদ্দিকীর নবগঠিত রাজনৈতিক দল ‘ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট’। আব্বাস সিদ্দিকী তাদের ঝুলিতে মুসলিমদের অনেক ভোট টানতে পারবেন বলে শুরু থেকে ধারণা করা হচ্ছিল। অনেকে আব্বাস সিদ্দিকিকে নির্বাচনে ‘গেম চেঞ্জার’ বলেও বিবেচনা করেন। অন্যদিকে মমতার দল তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপিকে নির্বাচনে জেতাতেই বিজেপি বিরোধীদের ভোট কাটার জন্য মাঠে নেমেছে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)। মুসলিমদের পাশাপাশি সাঁওতাল এবং কিছু হিন্দুরাও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। ভারতে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় তিন কোটি মতুয়া জনগোষ্ঠীর মানুষ আছেন। এই মতুয়া গোষ্ঠী নির্বাচনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকরা বলেছেন। মমতার দল তৃণমূলের অভিযোগ, মতুয়া গোষ্ঠীর ভোট টানতেই নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। হিন্দুস্তান টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের ‘আচরণবিধি লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মমতার ওপর হামলার অভিযোগ: গত ১০ মার্চ নন্দীগ্রামে নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে বাঁ পায়ে ও কাঁধে আঘাত পান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ঘটনাকে তিনি ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করে হামলার জন্য বিজেপিকে দায়ী করেন। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং হুইল চেয়ারে করে হাসপাতাল ছাড়েন। পরবর্তীতে তিনি হুইল চেয়ারে বসেই নির্বাচনী অংশ নেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বলেছিলেন, বিজেপি আমাকে ঘরবন্দী করে রাখতে চেয়েছিল যাতে আমি নির্বাচনের সময় বাইরে বের হতে না পারি। তারা (বিজেপি) আমার পায়ে আঘাত করেছে। কিন্তু, তারা আমার কণ্ঠস্বর রুখতে পারবে না, আমরা বিজেপিকে পরাজিত করব। তবে, ভারতের নির্বাচন কমিশন মমতার ওপর হামলার কোনো প্রমাণ পায়নি এবং এটিকে দুর্ঘটনা বলে উল্লেখ করে।
মমতার তৃণমূলকে জেতানো ভোটকৌশলী কে এই প্রশান্ত কিশোর? শেষ লোকসভা ভোটে বিজেপি ‘চমক’ দেখানোর পর আওয়াজ তোলে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আসল চমক দেখাবে বঙ্গের জনগণ, এখানে ফুটবে ‘পদ্মফুল’। অর্থাৎ এই নির্বাচনে তৃণমূলকে হটিয়ে ‘আসল পরিবর্তন’ আনবে বিজেপি।
লোকসভার ফলের পর বিজেপির এমন গলাবাজি ভাবিয়ে তোলে মমতাকে। তখন মমতা ডাকেন ‘পিকে’-কে, যার পুরো নাম প্রশান্ত কিশোর। পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট বা রাজনৈতিক কৌশল রচয়িতা। নির্বাচনের আগে তিনি বারবার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, তৃণমূলই জিতবে এবার। বিজেপি তিন সংখ্যার অঙ্কে পৌঁছাতে পারবে না। তারা আটকে থাকবে দুই সংখ্যায়। যদি বিজেপি তিন সংখ্যার আসন পায়, তবে তিনি তার নিজের সংস্থা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে যাবেন। এরপর রোববার ভোটের ফল গণনায় তার কথাই বাস্তবে প্রমাণিত হয়।
কিন্তু কে এই প্রশান্ত কিশোর? তার জন্ম বিহারের রোহতাস জেলার কোরান গ্রামে। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর তার বাবা পাকাপাকি ভাবে চলে যান বিহারেরই বক্সারে। অন্য দিকে ইঞ্জিনয়ারিং পড়তে হায়দরাবাদে যান প্রশান্ত। পড়াশোনার পাঠ চোকানোর পর কাজে যোগ দেন রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগে। কর্মস্থল ছিল আফ্রিকা। আট বছর চাকরির পর ২০১১ সালে ফিরে আসেন দেশে। তৈরি করেন নিজের সংস্থা সিটিজেন্স ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নমেন্ট (সিএজি)। নিজের সংস্থায় নিয়োগ করেন আইআইটি-আইআইএম-এর পেশাদার লোকজনকে।
পরের বছরই গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পথ বাতলে দেন নরেন্দ্র মোদিকে। তারপর প্রধানমন্ত্রী হতেও প্রশান্তের ওপর ভরসা করেন মোদি। সেসময়ই প্রশান্তের মস্তিষ্ক থেকে বেরোয় ‘চায়ে পে চর্চা, রান ফর ইউনিটি’র মতো ‘মাস্টার স্ট্রোক’। আর সেই সবের হাত ধরেই দেশ জুড়ে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মোদি। ফল ২০১৪ সালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদে উত্তরণ। এরপর নিজের সংস্থা সিএজি পরিবর্তন করে গড়ে তোলেন ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (আইপিএসি)। এর মধ্যেই ২০১৫ সালের গোড়ায় যোগ দেন নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন নীতীশ কুমার। পরে প্রশান্তের হাত ধরে কংগ্রেস। প্রথমেই দায়িত্ব পান ২০১৬ সালের পঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচন। সেবার ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংহের জয় নিশ্চিত করার কারিগর ছিলেন এই ‘পিকে’ই। পরের বছরই উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার নির্বাচনে ব্যাকফুটে চলে যান প্রশান্ত। জেতাতে পারেননি কংগ্রেসকে। তারপরই অন্ধ্রপ্রদেশে ওয়াইএসআরসিপির জগনমোহন রেড্ডিকে জয় এনে দেন তিনি। ২০১৯ সালের জুনে মোটা অংকের অর্থে নিয়োগ দিয়ে এই জাদুকর’র সামনে মমতা ‘মিশন’ হিসেবে দেন ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন। প্রশান্ত কিশোরকে বলা হয়, মোদির ‘জাদু’ থামাতে হবে, ‘পাল্টা জাদু’ দেখাতে হবে ২০২১ সালের ভোটে। তিনি দেখালেনও; ২০০’র বেশি আসনে জিতল তৃণমূল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ