শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

সেক্টরভিত্তিক ব্যাংক স্থাপন কি খুবই প্রয়োজন?

এম এ খালেক : দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) পরিচালনা পর্ষদের ২৬ এপ্রিলের সভায় অন্যান্যের মধ্যে একটি ব্যাংক স্থাপনসহ আরো কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ব্যাংক ছাড়াও তারা বীমা কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাসপাতাল স্থাপন করতে চায়। অন লাইনে অনুষ্ঠিত এই সভায় এফবিসিসিআই’র সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম সভাপতিত্ব করেন। এসব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের বিষয়ে ইতোমধ্যেই সরকারের উচ্চ মহলে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। তার অর্থ হচ্ছে, সরকারের উচ্চ মহল থেকে সবুজ সঙ্কেত পেয়েই তারা এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এফবিসিসিআই’র মতো একটি ব্যবসায়িক সংগঠনের জন্য হঠাৎ করে ব্যাংক স্থাপনের প্রয়োজন কেনো দেখা দিলো? শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়িদের অনেকেরই ব্যাংক রয়েছে। তাই নতুন করে এই সংস্থার নামে ব্যাংক স্থাপনের আবশ্যকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, এফবিসিসিআই দেশের উদ্যোক্তা- ব্যবসায়িদের শীর্ষ সংগঠন। সারা দেশ ব্যাপী এর শাখা রয়েছে। কিন্তু এটি কোনো ব্যবসায়িক সংগঠন নয়। কাজেই তারা ব্যবসায়িদের মতো আচরণ করতে পারে না। চেম্বার ও এসোসিয়েশনের সদস্যরা প্রস্তাবিত ব্যাংকের শেয়ার হোল্ডার হবেন। ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের তুলনামূলক সহজ শর্তে এবং কম সুদে ঋণ দেয়া হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রস্তাবিত ব্যাংকটি গড়ে তোলা হবে। এফবিসিসিআই’র উদ্যোগে একটি ব্যাংক স্থাপন নিযে সংস্থাটির মধ্যেই দ্বিমত রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এফবিসিসিআই’র উদ্যোগে একটি ব্যাংক স্থাপন করা হলে তা দেশের ব্যবসায়ি-উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারে। আবার অনেকেই মনে করছেন, এফবিসিসিআই একটি ব্যবসায়িক সংগঠন কিন্তু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। তাই এই সংগঠনের জন্য ব্যাংক স্থাপনসহ ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করা মোটেও উচিৎ হবে না। এটা করা হলে সংগঠনের আসল উদ্দেশ্য বিঘ্নিত হতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। তারা বিষয়টি আরো ভেবে দেখার জন্য পরামর্শ দেন। এছাড়া দেশে নতুন ব্যাংক স্থাপনের উপযোগিতা কতটুকু আছে সেটাও ভেবে দেখা দরকার। নতুন ব্যাংক স্থাপন করলে তা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে কিনা সেটাও বিবেচনা করা দরকার।
বাংলাদেশে অর্থনীতির যে আকার এবং শক্তি তাতে ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত সংখ্যায় ব্যাংক স্থাপিত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। রাষ্ট্রায়ত্ব, ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং বিদেশি মিলিয়ে দেশে মোট ব্যাংকের সংখ্যা হচ্ছে ৬১টি। এর মধ্যে ৪৩টি ব্যাংকের মালিক ব্যক্তি খাতের ব্যবসায়িরা। এফবিসিসিআই’র নেতৃত্বে ছিলেন এমন অনেকেই ব্যাংকের মালিক। সাম্প্রতিক নিকট অতীতে দেশে যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন প্রাপ্ত। ফলে সেই সব প্রতিষ্ঠান তেমন একটা ভালো চলছে না। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের মেয়াদকালে শেষের দিকে ৯টি নতুন ব্যাংক স্থাপনে অনুমোদন দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সময় এসব নতুন ব্যাংক স্থাপনের বিষয়ে তাদের দ্বিমত জানিয়েছিল। কিন্তু অর্থমন্ত্রাণালয় তাতে কর্ণপাত করেনি। এমন কি সাবেক অর্থমন্ত্রী এক পর্যায়ে বলেছিলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকগুলো স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনা যে অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে খাটে না ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা তার প্রমান দিয়েছে। একটি ব্যাংকে ব্যাপক দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল। সরকার থেকে আর্থিক সাপোর্ট দিয়ে সেই ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমন কি ব্যাংকটির নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। ব্যাংকটির মালিক, যিনি একজন আমলা। সারা জীবন সরকারি চাকরি করেছেন। কিছু দিন প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। সেই ব্যক্তিটি যখন ৫০০ কোটি টাকা পেইড আপ ক্যাপিটাল জমা দিয়ে ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য আবেদন করেন তখন প্রশ্ন উত্থাপন করা উচিৎ ছিল যে তিনি এত টাকা কোথায় পেলেন? কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তা জিজ্ঞাসা করা হয় নি। এর ফল আমারা প্রত্যক্ষ করেছি। পেশাগত দক্ষতা বিবেচনা না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো কাজ করলে যে তার ফলাফল ভালো হয় না তা এই আমলার ব্যাংকের পরিণতি দেখেই আমরা বুঝতে পারি। অর্থনীতিকে অর্থনীতির নিয়ম অনুসারেই চলতে দেয়া উচিৎ। কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিবেচনায় অর্থনীতি পরিচালনা করা ঠিক নয়। সরকার নানাভাবে বিপন্ন  প্রায় ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করছেন। কিন্তু মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে কোনো প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারি উদ্যোগ কাম্য হতে পারে না। মুক্তবাজার অর্থনীতির মূল কথাই হচ্ছে, ‘যোগ্যতার জয়।’ যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই বাজারে টিকে থাকবে। অযোগ্যরা বাজার থেকে বিদেয় হয়ে যাবে। বর্ণিত ব্যাংকটি যখন মারাত্মক সঙ্কটে পতি ত হলো তখন সরকারের উচিৎ ছিল তাকে অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভুত করে দেয়া বা মালিকানা পরিবর্তন করা। বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। কোনোভাবেই এত বিপুল সংখ্যক ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। ভারতের মতো বিশাল দেশেও এত ব্যাংক নেই। ভারতের ব্যাংকের সংখ্যা ২৫টির বেশি নয়। বিশ্বে দুই ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করা যায়। এর একটি হচ্ছে, ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং এবং অন্যটি হচ্ছে, ইউনিট ব্যাংকিং। ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং হচ্ছে সেই ধরনের ব্যাংক যেখানে ব্যাংকের সংখ্যা থাকে তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু সেই কম সংখ্যক ব্যাংকই বিপুল সংখ্যক শাখা স্থাপনের মাধ্যমে জনগণের ব্যাংকিং চাহিদা পূরণ করে থাকে। বৃটেনে এ ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করা যায়। আর এক ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আছে যেখানে কয়েকটি শাখা নিয়ে একটি ব্যাংক স্থাপিত হয়। অর্থাৎ এই সিস্টেমে ব্যাংকের সংখ্যা থাকে বেশি। কিন্তু শাখা সংখ্যা থাকে কম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করা যায়। ইউনিট ব্যাংকিং এর সবচেয়ে অসুবিধা হচ্ছে এদের ব্যবস্থাপনা থাকে খুবই দুর্বল। ফলে সামান্য সমস্যা হলেই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। ইউনিট ব্যাংকিং ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর তা আমরা ২০০৭-২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্রাইসিস থেকেই অনুধাবন করতে পারি। ইউনিট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। ফলে কোনো ব্যাংকই সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। বাংলাদেশে বর্তমানে এক ধরনের মিশ্র ব্যাংকিং ব্যবস্থা চলছে। একে ইউনিট ব্যাংকিংও বলা যাবে না আবার সঠিক অর্থে ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংও বলা যায় না।
আমাদের দেশের সরকার বিভিন্নভাবে ব্যবসায়িদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কোনো ব্যবসায়ি সংগঠন একটি দাবি উত্থাপন করলে সরকার তা উপেক্ষা করতে পারেন না। ব্যক্তি পর্যায়ের ব্যাংক মালিকদের সংগঠন অত্যন্ত শক্তিশালি। তারা নানাভাবে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে দাবি আদায় করে নিচ্ছেন। ইতোমধ্যেই তারা এমন কিছু দাবি আদায় করে নিয়েছেন যা ব্যাংকিং সেক্টরের ভবিষ্যতের জন্য খুবই ক্ষতিকর। আগে একটি পরিবার থেকে কোনো ব্যাংকে দু’জন পরিচালক থাকতে পারতেন। তারা একাদিক্রমে দুই টার্ম (প্রতি টার্ম তিন বছর) দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। কিছু দিন আগে এই নিয়মের পরিবর্তন করে একই পরিবার থেকে ৪জন পরিচালক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারা তিন টার্ম অর্থাৎ ৯ বছর একদিক্রমে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। মাঝে এক টার্ম গ্যাপ দিয়ে আবারো তিন টার্ম দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এতে ব্যাংকির উপর পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যাংক পরিচালিত হয় সাধারণ মানুষের আমানতের অর্থে। সেখানে উদ্যোক্তা বা মালিকদের অর্থের পরিমাণ ৫ শতাংশের বেশি নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে অর্থ আত্মসাতের একটি চমৎকার উপায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে ব্যাংক স্থাপন করা। অনেকেই আছেন যারা ব্যাংকের মালিক হয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছেন। এফবিসিসিআই যদি ব্যাংক স্থাপন করে তাহলে এ ধরনের আরো যেসব সংগঠন আছে তারাও তো ব্যাংক স্থাপন করতে চাইতে পারে। তখন অবস্থা কি দাঁড়াবে? এফবিসিসিআই কর্তৃক নতুন ব্যাংক স্থাপনের উদ্যোগের বিষয়ে একটি পত্রিকার পক্ষ থেকে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশে এমনিতেই ব্যাংকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে গেছে। তাই এ মুহূর্তে নতুন ব্যাংক স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র জন্য নতুন ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি প্রদান ঠিক হবে না। বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই দেশের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা সম্ভব। এফবিসিসিআই নেতৃবৃন্দের মাঝে যারা ইতোমধ্যেই ব্যাংক মালিক হয়েছেন তাদের অনেকের ব্যাংকের অবস্থাই খারাপ। কাজেই সবকিছু বিবেচনা করে নতুন ব্যাংক না দেয়াই ভালো। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এই মনসুর বলেন, ব্যবসায়ীদের নতুন করে ব্যাংক করার কোনো আবশ্যকতা আমি দেখি না।
এমনিতেই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই আমি মনে করি, ব্যাংকের সংখ্যা না বাড়িয়ে বরং কমিয়ে ১০টায় নিয়ে আসা উচিৎ। এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র কাজ হলো ব্যবসায়ীদের পক্ষে এডভোকেসি করা। আমি মনে করি সেই কাজটি সঠিকভাবে করতে পারলে ব্যবসায়ীদের অনেক সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে। আইনে কোথায় লেখা নেই যে, এফবিসিসিআই কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবে না। তবে আমি মনে করি, এফবিসিসিআই’র কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ না করাই ভালো।
এফবিসিসিআই একটি ব্যবসায়িক সংগঠন। তাদের ব্যবসায়িদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকাটাই উচিৎ। কারণ দেশের ব্যবসায়ীরা এখনো অনেক ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। তাদের সেই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে সংস্থাটিকে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যুক্ত করা কোনোভাবেই উচিৎ হবে না। এফবিসিসিআই’র বর্তমান নেতৃত্ব ইতোমধ্যেই অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন ইস্যুতে তাদের অবস্থান মোটেও সন্তোষজনক নয়। এফবিসিসিআই’র নির্বাচন হতো অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে। সেই আনন্দের উপকরণ ইতোমধ্যেই বিদূরিত হয়েছে। আগামীতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তা নির্বাচন হবে না, সেটা হবে সিলেকশন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ