রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

ভারতগামী নৌযানের নাবিকরা স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই ঘুরছে মোংলা বাজারে

খুলনা অফিস : করোনা ভাইরাসের ভারতীয় ধরণ (ভারত ভেরিয়েন্ট) সংক্রমণ শুরু হয়েছে নাকি খুলনাতেও? করোনা আক্রান্ত ভারত ফেরত পাইকগাছা উপজেলার ধামরাইল গ্রামের আমিরুল ইসলাম সানার ছেলে আরিফ (১৩) করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন। যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসার পর গত ২৬ এপ্রিল উপজেলা প্রশাসন করোনা আক্রান্ত আমিরুল ইসলাম সানাকে (৫০) নিজ বাড়ি থেকে নিয়ে পুনরায় যশোরের হাসপাতালে প্রেরণ করেছিল। পাইগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ফেসবুক পেজে ভারত ফেরত করোনা আক্রান্ত রোগীর ছেলে করোনায় সংক্রমিত হবার খবরে এলাকায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে-তাহলে কি করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরণ (ভারত ভেরিয়েন্ট) সংক্রমণ শুরু হয়েছে খুলনাতে? এদিকে, কিশোর আরিফ করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরণে সংক্রমিত কি না, সেটা খতিয়ে দেখতে রোববার দুপুরে পুনরায় তার নমুনা সংগ্রহ করেছে খুলনা সিভিল সার্জন অফিস। সোমবার সে নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
সূত্র মতে, গত ১৮ এপ্রিল থেকে ২৪ এপ্রিল সময়ের মধ্যে করোনা সংক্রমিত সাতজন যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে ফেরেন। তারা যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি ছিলেন। সেখান থেকে তাঁরা পালিয়ে যান। গত ২৫ এপ্রিল বিষয়টি জানাজানি হয়। ভারতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ায় এই পালানোর বিষয়টি আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সাতজন করোনা রোগীর মধ্যে ১৮ এপ্রিল একজন, ২৩ এপ্রিল পাঁচজন ও ২৪ এপ্রিল একজন আসেন। তাঁদের জরুরি বিভাগ থেকে হাসপাতালের তৃতীয় তলায় করোনা ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। তাঁরা ওয়ার্ডে না গিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান। এই সাতজনের মধ্যে খুলনার দু’জন। তারা হলেন পাইকগাছা উপজেলার ধামরাইল গ্রামের আমিরুল ইসলাম সানা (৫২) ও রূপসা উপজেলার সোহেল সরদার (১৭)। যশোরের হাসপাতাল থেকে পালিয়ে তারা সরাসরি বাড়ি ফিরে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথেই স্বাভাবিকভাবে বসবাস করছিলেন বলে জানা গেছে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মো. আরিফ আহম্মেদ বলেন, ভারত থেকে আসা ৭ জন করোনা পজিটিভ ছিলেন। তাঁদের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তির পর করোনা ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। ভর্তির টিকিট ওয়ার্ডে পৌঁছেছে, কিন্তু রোগীরা সেখানে যাননি। হাসপাতালে থাকতে হবে বলে সেখান থেকে তারা পালিয়ে যান। গত ২৫ এপ্রিল বিষয়টি জানা যায়। করোনার ভারতীয় যে ধরণ সেটা অনেক ভয়াবহ শক্তিশালী; সংক্রমিত করার শক্তিও বহুগুনে বেশি। সে কারণে পাইকগাছার আমিরুল ইসলাম সানার ছেলে যে ভারত ভেরিয়েন্ট সংক্রমিত নন, সেটা নিশ্চিত করে এখন বলা যায় না।
যশোরের সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহীন বলেন, ভারত থেকে আসা সাতজন করোনা পজেটিভ রোগী হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। তাদের পাসপোর্ট হাসপাতালের সিস্টারদের কাছে জমা থাকার কথা। কিন্তু সেটা ছিল না। কেন সেটা ছিল না এবং হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পালিয়ে যাওয়া রোগীদের ব্যাপারে নিজ নিজ জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জনের কাছে চিঠি দেয়ায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের পুনরায় হাসপাতালে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তারা অন্যদের যে সংক্রমিত করিনি, সেটার নিশ্চয়তা কে দেবে?
হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলীপ কুমার রায় বলেন, পালিয়ে যাওয়া ৭ জন করোনা রোগীকে হাসপাতালে ফেরত আনা হয়েছে। হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে তাদের চিকিৎসা চলছে। তাদের অবস্থা স্থিতিশীল।
এদিকে, দ্রুত সংক্রমণশীল করোনার এই ভেরিয়েন্টটির সংক্রমণ খুলনাতে ছড়িয়ে পড়ার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারাও। তারা বলছেন, খুলনার পাইকগাছা ও রূপসার দু’জন রোগী যশোরের হাসপাতাল থেকে পালিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে পরিবারের সাথে বসবাস করে। তাদের পরিবার-পরিজন আমার এলাকায় অবাধ চলাফেরা-যাতয়াত করেছেন। এখন নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না-যেহেতু পাইকগাছার আমিনুল ইসলাম সানার ছেলে করোনায় সংক্রমিত হয়েছে।
পাইগাছার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘যশোর থেকে ভারত হতে আক্রান্ত পাইকগাছায় পালিয়ে আসা করোনা রোগীকে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে যশোর সদর হাসপাতালে পাঠিয়েছিলাম। অতীব দুঃখের সাথে জানাচ্ছি, এই স্বল্প সময়ের মধ্যে উক্ত রোগী তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভয়ঙ্কর করোনা স্ট্রেইন সংক্রমিত করেছেন। তার ছেলের করোনা পজেটিভ এসেছে। ইতোমধ্যে উক্ত বাড়ি গত চারদিন ধরে লকডাউন অবস্থায় আছে। ধামরাইলবাসীসহ উক্ত এলাকার জনগণকে সাবধানে থাকার জন্য অনুরোধ করছি।’
পাইকগাছার নির্বাহী অফিসার এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ‘উপজেলার ধামরাইল গ্রামের ভারত ফেরত আমিরুল ইসলাম সানার ছেলে আরিফ (১৩) করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। গত মধ্যরাতে (০২ মে) বিষয়টি জানতে পেরেছি। ধারণা করছি-পশ্চিমবঙ্গের ধরণটাই সে সংক্রমিত হয়েছে। তার পরিবারের সদস্যদের লকডাউন করে দিয়েছি। এখন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেই তাদের খাদ্য সরবরাহ করছি। বিষয়টি নিয়ে আমরাও চিন্তিত।’
খুলনা সিভিল সার্জন ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ বলেন, ভারত ফেরত আমিনুল সানার ছেলের করোনা পজেটিভ এসেছে। আমরা রোববার আবার নমুনা সংগ্রহ করেছি, সোমবার সকালে ঢাকায় পাঠাচ্ছি। এই নমুনাটি পরীক্ষা করা হবে-করোনার ধরণটি ভারতীয় কি না, সেটা নিশ্চিত হবার জন্যই। আতঙ্কিত হবার কিছুই নেই, পাইকগাছার ওই বাড়িটি এখন সম্পূর্ণ লকডাউনে রয়েছে।
এদিকে করোনা মহামারীর মধ্যেও মোংলা বন্দরে স্বাভাবিক ভাবে চলছে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। ভারত থেকে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বন্দরে আসছে ভারতীয় লাইটার ও কার্গো জাহাজ। নাবিকরা স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই বিভিন্ন অজুহাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মোংলা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায়।
করোনা প্রাদুর্ভাবের কারনে সরকারের দেয়া দেশব্যাপী লকডাউন চলছে। এ লকডাউনের মধ্যেও মোংলা সমুদ্র বন্দরের দেশি-বিদেশী বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য খালাস-বোঝায়ের কাজ চলছে যথা নিয়মে। তবে ভারতে করোনা সংক্রমণ দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় মহামারী আকার ধারণ করেছে সেখানে। সেই ভারত থেকে ক্লিংকার, ফ্লাইয়াস ও চালসহ অনেক পণ্য বোঝাই করে কার্গো ও লাইটার জাহাজগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আর পণ্য নিয়ে আসা এ সকল লাইটারেজগুলো একমাত্র নৌ-রুট শিপসা নদীর আংটিহারা হয়ে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে এসে নঙ্গর করে নৌযাগুলোর নাবিকরা। এ সময় বাজার ও অন্য ওজুহাতে স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই অনায়াসে চলাফেরা করতে এখানকার মানুষের মধ্যে। পুনরায় বন্দর থেকে ঘষিয়াখালী চ্যানেল হয়ে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এভাবে অসচেতনতা ভাবে সামাজিক দূরত্ব বা স্বাস্থ্যবিধি না মানায় করোনাভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে মোংলা বন্দরসহ এখানকার বসবাসকারীরা।
ভারত থেকে আসা নৌযানের নাবিকদের মোংলা বাজারে হরহামেশা চলাচলের কথা স্বীকার করে লাইটার শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি মাইনুল হোসেন মিন্টু বলেন, ভারত থেকে পণ্য নিয়ে আসা নাবিকরা এ বন্দরে নঙ্গর করছে এবং বাজারে ঘোরাফেরা করছে একথা সত্য তবে চেষ্টা করছি লাইটার শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের সচেতন করা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে চলাচল করার জন্যও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
যে সকল ভারতগামী নৌযানের নাবিকরা রয়েছে তাদের চাহিদা অনুয়ায়ী সকল খাদ্য সামগ্রী জাহাজে পৌঁছে দিতে প্রশাসনসহ পৌর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলে তার সহায়তা করার আশ্বাস দেন পৌর মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আ. রহমান। তার পরেও বন্দরসহ পৌরসভা এলাকাকে করোনার ঝুঁকি থেকে রক্ষার জন্য প্রশাসনের সহায়তা কামনা করেন তিনি।
ভারত থেকে আসা নৌযানগুলো মোংলা বন্দরের এ রুট দিয়ে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি লাইটার ও কার্গো জাহাজ বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আর দেশে লকডাইন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ শতাধিক কার্গো ও লাইটার জাহার পণ্য নিয়ে মোংলা বন্দর হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে গেছে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ