শুক্রবার ১৮ জুন ২০২১
Online Edition

স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রীবাহী বাস চালুর দাবি জোরালো হচ্ছে

* সারাদেশে পরিবহন শ্রমিকদের বিক্ষোভ মিছিল কাল
* জেলা প্রশাসকের কার্যলয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ৪ মে
স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর পীর ইয়ামিনি মার্কেটের ব্যবসায়ি আফজালুর রহমান। বাস চালু থাকা কালে ১৫টাকা দিয়ে প্রতিদিন রায়েরবাগ থেকে তার দোকানে আসা যাওয়া করতেন। এখন তাকে প্রতিদিন ভাড়া গুনতে হয় প্রায় ২শ টাকা । মার্কেট চালুর পর তার নিয়মিত যাতায়াত ভাতা বেড়েছে প্রায় ৬/৭গুন । আক্ষেপ করে তিনি জানান, সবাইতো চলতেছে তাহলে বাস বন্ধ কেন। স্বাস্থবিধি মেনে বাস চাললে  তো কোন সমস্যা হবে না। বরং যারা নিন্ম আয়ের তাদের অনেকে উপকার হতো। ব্যবসায়ী আফজালের মতো অনেকে মানুষ  জোর দাবি উঠেছে বাস চালু করার। তবে তা হতে হবে স্বাস্থবিধি মেনে।
এদিকে করোনা ভাইরাস রোধে চলমান লকডাউনে (কঠোর বিধিবিষেধ) স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাস চালুর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। গতকাল শুক্রবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সমিতির সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গা ও মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ এই দাবি জানান।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন চালুর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। অন্যথায় আগামী ২ মে সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল এবং ৪ মে সারাদেশে জেলা প্রশাসকের কার্যলয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে মসিউর রহমান রাঙ্গা ও মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, লকডাউনে বাস ছাড়া সবই চলছে। বাস চালু না থাকায় স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বিকল্পভাবে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টেম্পু, থ্রি-হুইলার, মাইক্রোবাস, স্টাফ বাস, এমনকি অ্যাম্বুলেন্সেও গাদাগাদি করে যাত্রী বহন করা হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। বরং স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়ছে। লকডাউনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাসে সিটের অর্ধেক যাত্রী, তথা ২ সিটে ১ জন যাত্রী নিয়ে বাস চালু থাকলে করোনা সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা থাকবে না।
তারা আরো বলেন, বাস চালুর ব্যাপারে সারাদেশের পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। বাস চালুর দাবিতে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সড়ক-মহাসড়কে অবরোধ ও বিক্ষোভ চলছে। লাখ লাখ শ্রমিক কর্মহীন অবস্থায় পড়ে আছে। বহু গরিব মালিক ব্যাংক ঋণের কিস্তিসহ অসহায় জীবন-যাপন করছে।
এসব দিক বিবেচনা করে কর্মহীন শ্রমিকদের মাঝে খাদ্য সহযোগিতা প্রদানসহ বাস চালু করার জন্য সারাদেশের মালিকদের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তারা।
 খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লকডাউনের রাজধানীতে গণপরিবহন ছাড়া সব ধরনের যানবাহন চলাচল চলছে। কলকারখানা ও বিভিন্ন অফিস খোলা থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
উবার-পাঠাও অ্যাপস বন্ধ থাকলেও নগরীর মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহন করছে মোটরসাইকেল চালকেরা। অবাধ চলাচল রয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশার। এছাড়া বিভিন্ন সড়কে লেগুনাও চলাচল করছে। আগের মতোই চলছে খাবার দোকানগুলো। গণপরিবহন না থাকায় অন্যান্য যানবাহনে চড়ে অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ১৮ দফা ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনের ১১ দফা বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে বলে ঘোষণা দেয়া হলেও সড়কে তাদের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।
গণপরিবহন বন্ধ থাকার কারণে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বেসরকারি অফিসে চাকরিজীবীদের। এমনই একজন আনোয়ার হোসেন। মোহাম্মদপুর থেকে গুলশান যাওয়ার জন্য নিয়মিত গণপরিবহন ব্যবহার করলেও সিএনজিতে করে অফিসে পৌঁছেছেন। এ জন্য তাকে গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত ভাড়া।
আনোয়ার বলেন, ‘রাস্তায় যানজট না থাকলেও প্রায় দ্বিগুণ সিএনজি ভাড়া গুনতে হয়েছে। মোহাম্মদপুর থেকে গুলশান পর্যন্ত দুই শ থেকে আড়াই শ টাকায় সিএনজি ভাড়া হলেও আজকে সাড়ে তিন শ টাকা নিয়েছে।’
সকালের দিকে যানবাহন না পাওয়ায় বনশ্রী থেকে মালিবাগ পর্যন্ত পায়ে হেঁটে অফিসে যেতে দেখা গেল বনশ্রীর বাসিন্দা রিয়াজ আহমেদকে। বলেন, ‘প্রথমে সিএনজিতে আসতে চেয়েছিলাম ভাড়া বেশি চাওয়ায় পায়ে হেঁটে অফিসে এসেছি।’
মোবাইল অ্যাপে রাইড শেয়ার সার্ভিস পাঠাও উবার বন্ধ থাকলেও চুক্তিভিত্তিক রাইড শেয়ার করতে দেখা গেছে বিভিন্ন জায়গায়।
রামপুরা ব্রিজের মুখে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন চালক। তাদের একজন মইনুল। তিনি বলেন, ‘মোটরসাইকেল চালিয়ে আমার সংসার চলে। অ্যাপস বন্ধ তাই চুক্তিতে চালাচ্ছি।’
মহাখালী ও মিরপুর সড়কে কিছু গণপরিবহনের বাস চলতে দেখা গেছে। চালকরা বলছেন, রাতভর যানজট থাকার কারণে তারা ঢাকায় ঢুকতে পারেননি। টার্মিনালে গাড়ি রাখার জন্য ফাঁকা গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। তারপরও পুলিশ মামলা দিচ্ছে।
মহাখালী রেলক্রসিংয়ে সংলগ্ন সিগন্যালে দায়িত্বে থাকা পুলিশের সার্জেন্ট আমিনুল বলেন, ‘গণপরিবহন যাতে না চলে সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক আছি। কিছু গাড়ি এখনও টার্মিনালে ঢুকছে। সেগুলো আমরা ছেড়ে দিচ্ছি।’
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ সিগন্যালে ঠিকানা পরিবহনের একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। চালক রহমান মিঞা বলেন, ‘রাতে গাড়ি নিয়ে আসতে পারি নাই। খালি গাড়ি নিয়ে আইসি। তাও মামলা দিচ্ছে।’
নগরীর যানবাহন সংকটের মধ্যে স্বস্তির বাহন হয়ে উঠেছে রিকশা। কম দূরত্বের পথ রিকশায় করে পাড়ি দিচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। তবে ভাড়া আগের তুলনায় একটু বেশি গুনতে হচ্ছে।
জিগাতলার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালক রমিজ মিয়া বলেন, ‘আজকে ইনকাম মাশাল্লাহ ভালো। প্যাসেঞ্জার পাইতেছি।’বাড়তি ভাড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাস্তায় কোনো গাড়ি নাই ভাড়া তো একটু বেশি নিবই।’
যানবাহন সংকটের কারণে অনেককেই মাইক্রো প্রাইভেটকারে শেয়ার করে চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে এই যাতায়াতকে বিপজ্জনক বলছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, অতীতে প্রাইভেট কার বা মাইক্রোতে করে রাইড শেয়ারিং করার সময় অসংখ্য মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছে। লকডাউন পরিস্থিতিতেও এই ঝুঁকি রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ