রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

মহান মে দিবস আজ

ইবরাহীম খলিল : আজ মহান মে দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন। ১৮৮৬ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ওইদিন তাদের আত্মদানের মধ্যদিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
শ্রমিকদের আত্মত্যাগের এই দিনকে সারা বিশ্বে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। এবারের মে দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘মালিক-শ্রমিক নির্বিশেষ মুজিববর্ষে গড়বো দেশ’।
 দিবসটি উপলক্ষ্যে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি  মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। এক বার্তায় শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান শ্রমজীবী মেহনতি ভাইবোনদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
প্রতি বছর নানা অনুষ্ঠানের মধ্যেদিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে দিনটি পালিত হলেও এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শ্রমিক সমাবেশ, শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
ইতিহাস বলছে, ১৮৮৬ সালের ১ মে দৈনিক ১২ ঘণ্টার পরিবর্তে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে শ্রমিকরা ফুঁসে উঠেন। হে মার্কেটের কাছে তাদের বিক্ষোভে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে ১০ শ্রমিক নিহত হন। উত্তাল সেই আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মেনে দিতে বাধ্য হয় এবং বিশ্বব্যাপী দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের সময় চালু করা হয়।
১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমাবেশে ১ মে’ কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরের বছর থেকে বিশ্বব্যাপী এ দিনটি পালিত হচ্ছে।
মহান মে দিবস উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় পত্রিকাসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো দিনটি উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান ও টকশো সম্প্রচার করবে।
এদিকে শিল্প কারখানায় শ্রমিকদের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে শ্রমিক নেতারা। তারা মালিক পক্ষকে ৮ দফা বাস্তবায়নের দাবি জানান। দাবিগুলো হলো-
১. সকল শিল্প-কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস বাস্তবায়ন করতে হবে। অবিলম্বে শ্রম আইনের কর্মঘণ্টা ও ওভারটাইম-বিষয়ক ধারা স্থগিতের সরকারি প্রজ্ঞাপন বাতিল করতে হবে। ২. বিশ রোজার আগে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি-বোনাসসহ সকল পাওনাদি পরিশোধ করতে হবে। ৩. শ্রমিক ছাঁটাই-নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ৪. করোনা-লকডাউন চলাকালে শ্রমিকদের ফ্রি টেস্ট, ভ্যাকসিনসহ সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. শ্রমিকদের জন্য সেনাবাহিনীর রেটে পূর্ণ-রেশনিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে। ৬. অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে।
গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির সমন্বয়কারী ও গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম সবুজ, বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, বাংলাদেশ ওএসকে গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন, গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির  প্রধান তাসলিমা আখতার, গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের সভাপতি শবনম হাফিজ, গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মাসুদ রেজা, বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি মাহমুদ হোসেন, বাংলাদেশের সোয়েটার গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এএএম ফয়েজ হোসেন, গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক বিপ্লব ভট্টাচার্য, গার্মেন্টস শ্রমিক সভার অন্যতম কেন্দ্রীয় নেতা তুলসী দাস এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, এবছর ১৩৫তম মহান মে দিবস পালিত হবে। এ বছর করোনা মহামারিজনিত দুর্যোগকালীন সময়ে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে ‘সঙ্গনিরোধ’ বজায় রাখতে শ্রমিক শ্রেণি বিগত বছরের মতো এ দিবসটি উদযাপন করতে পারছে না। অথচ লকডাউন চলাকালীন সময়ে গার্মেন্টস শ্রমিকদেরকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কল-কারখানায় কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ কর্মস্থলে স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারি নির্দেশনা পুরোপুরি মানা হচ্ছে না।
শ্রমিক নেতারা  বলেন, আমরা দেখছি, মে দিবসের ইতিহাস রচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তখনকার শ্রমিক শ্রেণির দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণার যে চিত্র প্রতীয়মান হয়েছিল, আজকের প্রেক্ষাপটেও শ্রমিক শ্রেণি সেই নির্মম শোষণ-পীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত খাটুনি, কম মজুরি ও বিভিন্নভাবে হয়রানি-নির্যাতন চালিয়ে মালিক শ্রেণি আমাদের শ্রমিক জীবনকে অস্থির করে তুলছে।
বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘মহান মে দিবসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ৮ ঘণ্টা কর্ম দিবসের অধিকার অর্জিত হওয়ার পরেও তা আমাদের দেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এখনও গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদেরকে নানা অজুহাতে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করানো হয়। যেখানে শ্রমিকদের জীবনীশক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা রক্ষার জন্য ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস বাস্তবায়ন করা জরুরি, সেখানে উল্টো সরকার বাংলাদেশ শ্রম আইনের ৩২৪ ধারার ক্ষমতার অপব্যবহার করে গত ১৩ এপ্রিল একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই প্রজ্ঞাপনে ১৭ এপ্রিল ২০২১ থেকে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য কর্মঘণ্টা ও ওভারটাইম ভাতা সংক্রান্ত ধারার (১০০, ১০২, ১০৫) প্রয়োগ স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এর ফলে শ্রমিকরা আগের থেকে আরও বেশি করে শোষণ-বঞ্চনা ও হয়রানির শিকার হবেন। বর্তমান করোনাকালে এই ঘোষণা শ্রমিকদের জীবন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপত্তাহীন করে তুলবে। নেতারা অবিলম্বে শ্রম আইনের কর্মঘণ্টা ও ওভারটাইম-বিষয়ক ধারা স্থগিতের সরকারি প্রজ্ঞাপন বাতিরের আহ্বান জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ