শুক্রবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

মহান মে দিবস : অধিকার আদায়ের প্রেরণাময় দিন

আতিকুর রহমান : পহেলা মে মহান মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। পৃথিবীর শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের কাছে এ দিনটি একদিকে যেমন খুবই তাৎপর্যময় তেমনি অনেক বেশী আবেগ ও প্রেরণার দিন। প্রায় দেড়শত বছর আগে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ঐক্যবদ্ধ দুর্বার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় শ্রমজীবী মানুষের বিজয়ের ধারা। সেই বিজয়ের ধারায় উদ্ভাসিত বর্তমান বিশ্বের সকল প্রান্তের প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষ। কারণ এ দিনটির মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষ তাদের কাজের প্রাথমিক স্বীকৃতি পেয়েছে। পহেলা মে এক দিনের আন্দোলনের ফসল নয় বরং দীর্ঘ সময় ধরে দাবি আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামে কিছুটা প্রাপ্তি এবং স্বীকৃতি অর্জিত হয়েছে এই দিনে। তাই ঐতিহাসিক মে দিবস বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষার দিন। তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন।
বাংলাদেশে মে দিবস পালন এবং শ্রমিকদের বাস্তবতা : বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং আই.এল.ও কর্তৃক প্রণীত নীতিমালার স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। এই দেশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা অনেক। শ্রমিক দিবসের প্রেরণা থেকে বাংলাদেশ মোটেও পিছিয়ে নেই। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের শাসন থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে বিপুল উদ্দীপনা নিয়ে মে দিবস পালিত হয়। ঐ বছর সদ্য স্বাধীন দেশে পয়লা মে সরকারি ছুটি ঘোষিত হয়। তারপর থেকে আজও পয়লা মে সরকারি ছুটির দিন বহাল আছে। এদিন শ্রমিকরা মহাউৎসাহ ও উদ্দীপনায় পালন করে মে দিবস। তারা তাদের পূর্বসূরীদের স্মরণে আয়োজন করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। শ্রমিক সংগঠনগুলো মে দিবসে আয়োজন করে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমুখী কর্মসূচীর। শ্রমিকরা এদিন তাদের নিয়মিত কাজ থেকে সাময়িক অব্যাহতি পেয়ে থাকে। আনন্দঘন পরিবেশে তারা উদযাপন করে মহান মে দিবস। রাষ্ট্রের সরকারি দল ও বিরোধী দলসহ অন্যান্য বিভিন্ন সংগঠনও দিনটি পালন করে থাকে। এদিন দেশের সকল প্রচারমাধ্যম ও পত্রপত্রিকায় শ্রমিকদের পক্ষে সভা-সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের খবর ফলাও করে প্রচার করা হয়।
প্রতিবছর মে দিবস উদযাপনের মধ্যদিয়ে শ্রমিকরা একদিকে যেমন তাদের অধিকার আদায়ের রক্তাক্ত ইতিহাসকে স্মরণ করে তেমনি স্বপ্ন দেখে তাদের অধিকারের ষোলআনা প্রাপ্তির। বাংলাদেশের শ্রমিকরাও নিঃসন্দেহে এর বাইরে নয়। কিন্তু আজও বাংলাদেশের শ্রমিকদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। বাংলাদেশের শ্রমিকদের দিকে তাকালে আমরা আজও দেখতে পাই মালিকশ্রেণী কিভাবে তাদেরকে শোষণ করছে। মালিকশ্রেণীর শোষণের ফলে অসহায়ের মতো শ্রমিকদেরকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। এইতো মাত্র ৮ বছর পূর্বে ২০১৩ সনের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সাভারে রানা প্লাজায় শ্রমিকদের উপর স্মরণকালের ভয়াবহ ভবন ধসে প্রায় বার শতাধিক নিরীহ শ্রমিকের করুণ মৃত্যু পুরো জাতিকে শোকাহত করে। ঘটনার আট বছর পূর্ণ হলেও রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে নিখোঁজ ১০৫ জন শ্রমিকের সন্ধান আজও মিলেনি, এমনকি অনেকের কপালে ক্ষতিপূরণের অর্থও জোটেনি। এর পূর্বে ২০১২ সালের নবেম্বর মাসে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের গার্মেন্টস কারখানায় আগুন লেগে ১১১ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যায়। এর আগে ২০১০ সালে হামিম গামেন্টসসহ তিনটি গার্মেন্টসে অনেক শ্রমিকের প্রাণ চলে যায়। এসবের অধিকাংশ ঘটনা ঘটেছে শুধুমাত্র মালিকশ্রেণীর গাফলতির কারণে। এভাবে প্রায় প্রতিবছর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোয় বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এসব দুর্ঘটনায় অনেক নারী-পুরুষ-শিশু মারা যায়। দুর্ঘটনায় যেসব শ্রমিক মারা যায়, তাদের পরিবারের রুটি-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তারা চোখেমুখে অন্ধকার দেখে। আর মালিকশ্রেণীরা এ থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে।
আজকের এই দ্রব্যমূল্যের বাজারে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য বেতন পাচ্ছে না। যেখানে শ্রমিক আন্দোলন হয়েছিল ৮ ঘণ্টা কর্ম দিবসের জন্য। যেখানে বাংলাদেশের গার্মেন্টসগুলোতে এখনও ৮ ঘণ্টার পরিবর্তে ১২ ঘণ্টা কাজ করানো হচ্ছে। বিনিময়ে বেতন দেওয়া হচ্ছে নামমাত্র। যা দিয়ে একজন মানুষ চলাফেরা করা কষ্টকর। আজকে শ্রমিকদের কোন নিরাপত্তা নেই। মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তারা পেটের দায়ে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রেখে উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে চায়। এ নিয়ে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় দ্বন্দ্ব দেখা যায়। আমাদের দেশে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। এসব নারী ও শিশু বিভিন্ন কল-কারখানা, বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পে বেশি কাজ করে থাকে। অথচ আমাদের সংবিধানে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। তথাপি বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেরই আবার জীবন ঝুঁকির মধ্যেও পড়ে যাচ্ছে। মারাও যাচ্ছে অনেক শ্রমিক। বাংলাদেশের শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার কারণে তারা শারীরিক-মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। শিক্ষাসহ বিভিন্ন সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা হচ্ছে বঞ্চিত। এসব শিশু স্নেহ-ভালোবাসার অভাবে এক সময় অপরাধ জগতে পা বাড়ায়।
আসলে আমরা শ্রম বা শ্রমিকের মর্যাদা বুঝেও বুঝতে চাই না। একজন মানুষের জীবনধারণের জন্য যা যা প্রয়োজন, অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এসবই একজন শ্রমিকের প্রাপ্য। আর এটাই হচ্ছে শ্রমিকের প্রকৃত মর্যাদা। একুশ শতকে এসে শ্রমিকরা এর কতটুকু মর্যাদা বা অধিকার ভোগ করছে? বর্তমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। কারণ শ্রমিকরা এ দেশের সম্পদ। তাদের কারণেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। তাদের অবহেলার চোখে দেখার কোন সুযোগ নেই। তাদের কাজের ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মহান মে দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আমরা শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকারের কথা বলি কিন্তু বাস্তবে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে শাসক, প্রশাসক ও মালিকগোষ্ঠী আদৌ আন্তরিক হতে পারিনি। যদিও সময়ের ব্যবধানে শ্রমজীবী মানুষের যান্ত্রিক বিপ্লবের কারণে কাজের পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু পরিবর্তন আসেনি শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে। তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার অদ্যাবধি পর্যন্ত অধরাই থেকে গেল।
পোশাক শিল্পের বিকাশে এই দেশে নারী শ্রমিকের অবদান অনেক বেশি। কিন্তু যেই নারী শ্রমিকের অবদানে দেশের জাতীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে, সেই নারী শ্রমিকের চলমান জীবনযাপন বড়ই দুর্বিষহ। বেতনের সাথে যাদের জীবনযাত্রার ব্যয় খাপ খায় না তারাই হলেন গার্মেন্টস শ্রমিক।
বাংলাদেশে কাজের ক্ষেত্রে  পোশাক শ্রমিকের পর নির্মাণ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যাদের রক্ত ও ঘাম মিশে আছে তারাও তাদের শ্রমের ন্যায্য পাওনা অনেক সময় পায় না। শ্রম দিয়ে যারা শ্রমের মূল্য পায় না তারাই জানে জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার লড়াই কত কষ্টের? শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আই এল ও) এবং দেশের শ্রম আইনে সংবিধান অনুসারে শ্রমিকশ্রেণীর মানুষের ন্যায্য অধিকার সংরক্ষিত আছে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার যেন কিতাবে আছে গোয়ালে নেই! বরাবরই এই দেশের দিনমজুর শ্রেণীর মেহনতি মানুষ বঞ্চিত ও শোষিত। বাংলাদেশের গৃহকর্মীরাও কর্মক্ষেত্রে নানাবিধ নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। গৃহকর্মীর গায় গরম ইস্ত্রির স্যাঁকা দিয়ে পিট ঝলসিয়ে দেওয়া এবং নানাবিধ নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। শুধু তাই নয় গৃহকর্মীদের উপর বর্বর নির্যাতনের পাশাপাশি খুন ধর্ষণও করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ কৃষি কাজ ও কৃষি পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে জীবন-জীবিকা পরিচালনা করলেও কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী, কালোবাজারি ও সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে অহরহ বঞ্চিত হচ্ছে। এমনিভাবে পরিবহন সেক্টরে কর্মরত প্রায় ৫০ লক্ষাধিক শ্রমিক প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনসাধারণের সেবা প্রদান করলেও তাদের মজুরি নির্ধারণে সরকারের পক্ষ থেকে কোন নীতিমালা আজও প্রণয়ন করা হয়নি। লাখ লাখ রিকশা শ্রমিক প্রতিনিয়ত তাদের জীবন পরিচালনায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলছে। এ শ্রেণীর শ্রমিকদের জীবন-মান উন্নয়নে রেশনিং, চিকিৎসা সেবা ও সন্তানদের শিক্ষা অধিকার আজও নিশ্চিত হয়নি। মোদ্দাকথা মে দিবসে যেভাবে আমরা শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা বলি তার তুলনায় বাস্তবে শ্রমিকের অধিকার ও অর্জন অনেক সীমিত।
মে দিবসের মূল্যায়ন : শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত ইতিহাসের মধ্য দিয়ে শ্রমিকরা তাদের কিছু অধিকার অর্জন করলেও সকল দিক থেকে শ্রমিকরা তাদের অধিকার পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। মে দিবস ঘটা করে পালন হলেও শ্রমিকরা আজও অবহেলা ও অবজ্ঞার স্বীকার। আজও তারা তাদের কাক্সিক্ষত মজুরি নিশ্চিত করতে পারেনি। কর্মক্ষেত্রে ৮ ঘণ্টা শ্রমের নিয়ম হয়তো বা প্রতিষ্ঠা হয়েছে, কিন্তু থামেনি শ্রমিক নিপীড়ন এবং প্রতিষ্ঠিত হয়নি শ্রমিকের প্রকৃত মর্যাদা ও শ্রমের মূল্য। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অহরহ শ্রমিক বিক্ষোভ থেকে আমরা সহজেই এটা অনুধাবন করতে পারি। বেতন বৃদ্ধি কিংবা বকেয়া বেতন আদায়ের নিমিত্তে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের অধিকাংশ গার্মেন্টে  নৈরাজ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। গার্মেণ্টস শ্রমিকরা দাবি আদায়ে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ করে যাচ্ছে। মালিক পক্ষ হর-হামেশাই শ্রমিকদেরকে ঠকিয়ে যাচ্ছে। আন্দোলন ঠেকানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে শ্রমিক নেতা-নেত্রীদেরকে গ্রেফতার করানো হচ্ছে। গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা আমিনুলকে দীর্ঘদিন গুম করে রেখে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কাজেই এটি দৃঢ়তার সাথে বলা যায়, আজও দুনিয়ার কোথাও শ্রমিক-মালিক সু-সম্পর্ক, শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি এবং তাদের বাঁচার উন্নত পরিবেশ কাক্সিক্ষত মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক সংগঠন হিসেবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের অধিকারসমূহ স্বীকৃতি লাভ করে। আইএলও শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ পর্যন্ত ১৮৩টি কনভেনশন প্রণয়ন করে। এর মধ্যে ৮টি কোর কনভেনশনসহ ৩৩টি কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে বাংলাদেশ। তাছাড়া দেশে বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী সরকার শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতকরণে দায়বদ্ধ। কিন্তু আমাদের শ্রমিকরা কতটুকু অধিকার পাচ্ছে, শ্রমিকদের কতটুকু কল্যাণ সাধিত হয়েছে আজ এই সময়ে তা কঠিন এক প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ লেবার ফোর্সের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশ মহিলা শ্রমিক। মে দিবস যায়, মে দিবস আসে। কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্য যেন আর খোলে না।
শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামী শ্রমনীতির অনিবার্যতা : আধুনিক বিশ্বের পুঁজিবাদী ও সমাজবাদী রাষ্ট্র দর্শনের কোনটাই শ্রমিকের প্রকৃত অধিকার ও মর্যাদার ন্যূনতম সমাধান দিতে পারেনি। তারা মুখে শ্রমিক অধিকারের কথা বললেও বাস্তবে শ্রমিকদেরকে পুঁজি করে রাজনীতি করাসহ অগাধ অর্থ বৈভবের মালিক হয়েছে। ফলে এখনও শ্রমিক-মজুররা নিষ্পেষিত হচ্ছে। মালিকের অসদাচরণ, কম শ্রমমূল্য প্রদান, অনুপযুক্ত কর্ম পরিবেশ প্রদানসহ নানা বৈষম্য শ্রমিকের দুর্দশা ও মানবেতর জীবনযাপনের কারণ হয়ে আছে। যে অধিকারের জন্য শ্রমিকরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন শিকাগোর রাজপথে, তা বাস্তবে এখনও অর্জিত হয়নি। আজও শ্রমিকেরা পায়নি তাদের কাজের উন্নত পরিবেশ, পায়নি ভালোভাবে বেঁচে থাকার মতো মজুরি কাঠামো এবং স্বাভাবিক ও কাক্সিক্ষত জীবনের নিশ্চয়তা। মূলত ইসলামী শ্রমনীতি চালু এবং সৎ ও ন্যায়বান লোকদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা আসলে তারাই শ্রমিকের অধিকার আদায় ও রক্ষার ক্ষেত্রে সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারবে। তাছাড়া কোনভাবেই শ্রমিক সমাজের প্রকৃত অধিকার ও মর্যাদা আদায় সম্ভব হবে না। ইসলামী শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠা হলে ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে দেশের শ্রমনীতিকে ঢেলে সাজিয়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। মানুষের মত বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হবে। একজন মালিকের নিজের স্বজনরা যে রকম জীবনযাপন করবে তার অধীনস্থ শ্রমিকরাও সে রকম জীবনের নিশ্চয়তা পাবে। কাজেই শ্রমিক সমাজসহ দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীকে ইসলামী শ্রমনীতি চালু ও বাস্তবায়নের নিমিত্তে সৎ ও ন্যায়বান লোকদের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা আনয়নে প্রচেষ্টা চালানো জরুরি।
মে দিবসের প্রত্যয় ও করনীয় : মহান মে দিবসকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত অর্থে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে শ্রমজীবী মানুষসহ সকল দায়িত্ববান নাগরিকদেরকে শ্রমিকদের জীবন-মান উন্নয়নে নিম্নোক্ত দাবিসমূহ বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দাবি আদায়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
১. ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে দেশের শ্রমনীতিকে ঢেলে সাজানো।
২. শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে মুনাফায় শ্রমিকদের অংশ প্রদান করা।
৩. সকল বন্ধ কল-কারখানা চালু করা।
৪. শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন মজুরি অবিলম্বে পরিশোধ করা।
৫. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ ও অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা।
৬. গার্মেন্টস শ্রমিকদের ভালোভাবে বেঁচে থাকার উপযোগী মজুরি নির্ধারণ করা।
৭. শ্রমিকদের ন্যায়বিচার ত্বরান্বিত করার স্বার্থে শ্রমঘন এলাকায় শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠা করা।
৮. শ্রমজীবী মানুষের জন্য বাসস্থান, রেশনিং, চিকিৎসা ও তাদের সন্তানদের বিনামূল্যে শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা।
৯. কল-কারখানায় ঝুঁকিমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
১০. আহত ও নিহত শ্রমিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
১১. শ্রমিকদের পেশাগত ও নৈতিক ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করা।
১২. নারী ও পুরুষের বেতন-ভাতার সমতা বিধান করা।
১৩. কল-কারখানায় নারী শ্রমিকদের জন্য প্রসূতিকালীন ছুটি ও ভাতা প্রদান নিশ্চিত করা।
১৪. নারী শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিশু যত্নাগার স্থাপন করা।
১৫. শিশু শ্রম বন্ধ করা।
১৬. সকল পেশায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নিশ্চিত করা এবং সকল পেশার শ্রমিকদের শ্রম আইনের সুবিধা প্রদান নিশ্চিত করা।
১৭. শ্রমিকের প্রতি মালিকের সহনশীল মনোভাব পোষণে কর্তৃপক্ষকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া।
১৮. শ্রমিকদের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার আলোকে কাজ দেওয়া।
১৯. সঠিক সময়ে শ্রমিকের মজুরি পরিশোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
২০. ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়নের আন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষসহ সকলকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করা।
পরিশেষে বলবো যে, আসুন আমরা সবাই মিলে শ্রমজীবী মানুষের সত্যিকার মুক্তি অর্জনে যার যার অবস্থান থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করি। নির্যাতিত-নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করি এবং শ্রমজীবী মানুষের পরকালীন মুক্তি অর্জনে তাদেরকে ইসলামী আদর্শের পতাকাতলে শামিল করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করি। ইসলামী শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে আন্দোলনকে শক্তিশালী করি। মহান আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ