শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

মামুনুল হকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরার ধর্ষণ মামলা

স্টাফ রিপোর্টার : হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তার দাবি করা দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরা ঝর্ণা। গতকাল শুক্রবার সকালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানায় মামলাটি করেন তিনি। সোনারগাঁ থানা পুলি  জানায়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আমীর খসরু বলেন, সোনারগাঁয়ের রয়্যাল রিসোর্টে বাদীর সঙ্গে মামুনুল হক প্রতারণা করে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে সম্পর্ক করার অভিযোগে মামলা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে করা মামলাটি তদন্ত করবেন সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম।
মামলার এজাহারে জানা যায়, মামুনুল হক দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করলেও মামলায় জান্নাত আরা ঝর্ণা নিজেকে মামুনুল হকের স্ত্রী বলেননি। তিনি বলেছেন, বিয়ের প্রলোভন ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মামুনুল হক আমার সঙ্গে সম্পর্ক করেছেন। কিন্তু বিয়ের কথা বললে মামুনুল করছি, করব বলে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। ২০১৮ সাল থেকে ঘোরাঘুরির কথা বলে মামুনুল বিভিন্ন হোটেল, রিসোর্টে আমাকে নিয়ে যান। মামুনুলের সঙ্গে পরিচয় প্রসঙ্গে জান্নাত বলেন, ২০০৫ সালে তার স্বামী মাওলানা শহীদুল ইসলামের মাধ্যমে মামুনুল হকের সঙ্গে পরিচয় হয়। স্বামীর বন্ধু হওয়ায় আমাদের বাড়িতে মামুনুলের অবাধ যাতায়াত ছিল। মামুনুলের সঙ্গে পরিচয়ের আগে আমরা সুখে-শান্তিতে বসবাস করছিলাম। আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মতানৈক্যের মধ্যে প্রবেশ করে মামুনুল হক শহীদুল ও আমার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে থাকেন। মামুনুলের কারণে আমাদের দাম্পত্য জীবন চরমভাবে বিষিয়ে ওঠে। সাংসারিক এই টানাপোড়েনে একপর্যায়ে মামনুলের পরামর্শে ২০১৮ সালের ১০ আগস্ট বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।
অভিযোগে জান্নাত বলেন, বিচ্ছেদের পর তিনি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েন। এ সময় মামুনুল আমাকে খুলনা থেকে ঢাকায় আসার জন্য বলেন। আমি ঢাকায় চলে আসি। মামুনুল আমাকে তার অনুসারীদের বাসায় রাখেন। সেখানে নানাভাবে আমাকে প্রস্তাব দেন। একপর্যায়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে তার প্রলোভনে পা দিই। এরপর তিনি উত্তর ধানমন্ডির নর্থ সার্কুলার রোডের একটি বাসায় আমাকে সাবলেট রাখেন। একটি বিউটি পারলারে কাজের ব্যবস্থা করে দেন। ঢাকায় থাকার খরচ মামুনুলই দিচ্ছিলেন।
জান্নাত আরা ঝর্ণা অভিযোগে বলেন, গত ‘৩ এপ্রিল সোনারগাঁয়ের রয়্যাল রিসোর্টে ঘোরাঘুরির কথা বলে মামুনুল হক নিয়ে যান। সেখানে অবস্থানকালে কিছু মানুষ আমাদের আটক করে ফেলে। পরে মামুনুল হকের অনুসারীরা রিসোর্টে হামলা করে আমাদের নিয়ে যায়। কিন্তু মামুনুল আমাকে নিজের বাসায় ফিরতে না দিয়ে পরিচিত একজনের বাসায় অবৈধভাবে আটকে রাখেন। কারও সঙ্গে যোগাযোগও করতে দেননি।
জান্নাত আরা বলেন, পরে কৌশলে আমি আমার বড় ছেলেকে আমার দুরবস্থার সব কথা জানাই এবং আমাকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধারের জন্য আইনের আশ্রয় নিতে বলি। পরে ডিবি পুলিশ আমাকে উদ্ধার করলে জানতে পারি, আমার বাবা রাজধানীর কলাবাগান থানায় আমাকের উদ্ধারের জন্য একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। পুলিশ আমাকে উদ্ধারের পর বাবার জিম্মায় দেয়। সেখানে আমি আমার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পরামর্শ করায় অভিযোগ দায়ের করতে বিলম্ব হয়। জান্নাত আরা ঝর্ণার বাবা ওলিয়ার রহমানকে গত ২৪ এপ্রিল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ। আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর থেকে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। এরপর ২৬ এপ্রিল মেয়েকে উদ্ধারে পুলিশের সহায়তায় চেয়ে কলাবাগান থানায় সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করেন তিনি। পরদিন মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে ঝর্নাকে উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। ঝর্না উদ্ধার হওয়ার তিন দিনের মাথায় এই মামলা করলেন।
ঝর্ণার মেডিকেল টেস্ট সম্পন্ন: এদিকে মামুমুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা করার পর জান্নাত আরা ঝর্ণার মেডিকেল টেস্ট সম্পন্ন করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ঝর্ণার মেডিকেল টেস্ট করা হয়। মামলা হওয়ার পর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য জান্নাতকে নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে নিয়ে যায় সোনারগাঁ থানা পুলিশ। সেখান থেকে তাকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সোনারগাঁ থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জান্নাত আরা ঝর্ণা মামলা দায়েরের পর তাকে মেডিকেল পরীক্ষার জন্য মহিলা পুলিশের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। মেডিকেল পরীক্ষার পর তিনি নিজের বাসায় চলে যান।’ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সোনারগাঁ থানার ধর্ষণ মামলায় ভিকটিম জান্নাত আরা ঝর্ণাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে পুলিশ। পরে গাইনি বিভাগের তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করে তার মেডিকেল পরীক্ষা করানো হয়। যথাসময়ে মেডিকেল রিপোর্ট সোনারগাঁ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’ এদিকে জান্নাত আরা ঝর্ণা নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টোরিয়া) সাংবাদিকদের বলেন, আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে মামুনুল হক আমার সঙ্গে অন্যায় ও প্রতারণা করেছেন। আমি রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাই। মামুনুল হক আমার সঙ্গে যে ধরনের অন্যায় করেছেন আর কোনো নারীর সঙ্গে যেন এমন করতে না পারেন, সেজন্য তার সেই ধরনের বিচার হওয়া উচিত। মামুনুল হক আমার জীবনটাকে নরক বানিয়ে দিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ