রবিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরবরাহ করা বাড়তি টাকার বিনিয়োগ নেই

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে টাকার ব্যবহার কমেছে। ফলে সরবরাহ করা বাড়তি টাকা ব্যাংকগুলোর ভল্টে অলস পড়ে আছে। কিছু অর্থ ব্যাংকগুলো সরকারি বিভিন্ন বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে সামান্য মুনাফা পাচ্ছে। অথচ ব্যাংকগুলোর মূল দায়িত্ব হলো মানুষের কাছ থেকে আমানত নিয়ে তা শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য খাতে বিনিয়োগ করা। কিন্তু ব্যাংকগুলো সেটি করতে পারছে না। এদিকে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংকে যোগাযোগ করেও ঋণ পাচ্ছেন না। কারণ ঋণ পাওয়ার জন্য ব্যাংকের নানা শর্ত বাস্তবায়ন করতে তারা পারছেন না। অথচ করোনার ক্ষতি মোকাবিলায় উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ১ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকার জোগান দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুদ্ধার করতে যে হারে টাকার প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হারে টাকার ব্যবহার বাড়াতে হবে। তাহলে বাজারে টাকার চাহিদা বাড়বে। তখন অর্থনীতিতে আরও টাকার জোগান দেয়া যাবে। এমনটা করতে পারলে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতি।
জানা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুদ্ধার করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের কর্মকাণ্ড প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় টাকার ব্যবহার আগের তুলনায় বাড়েনি। বরং কমে গেছে। এ কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ধীরগতিতে এগোচ্ছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে সেই কার্যক্রমে এসেছে আরও ধীর গতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়েছিল ৭ দশমিক ১২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বাজারে টাকার প্রবাহ বেশি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ। যে হারে টাকার প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে, সে হারে ব্যবহার বাড়েনি। বরং গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে টাকার ব্যবহার কমেছে। ফলে সরবরাহ করা বাড়তি টাকা ব্যাংকগুলোর ভল্টে অলস পড়ে আছে। কিছু অর্থ ব্যাংকগুলো সরকারি বিভিন্ন বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে সামান্য মুনাফা পাচ্ছে। অথচ ব্যাংকগুলোর মূল দায়িত্ব হলো মানুষের কাছ থেকে আমানত নিয়ে তা শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য খাতে বিনিয়োগ করা। কিন্তু ব্যাংকগুলো সেটি করতে পারছে না।
এদিকে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংকে যোগাযোগ করেও ঋণ পাচ্ছেন না। কারণ ঋণ পাওয়ার জন্য ব্যাংকের নানা শর্ত বাস্তবায়ন করতে তারা পারছেন না। অথচ করোনার ক্ষতি মোকাবিলায় উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ১ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকার জোগান দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বরাদ্দ রেখেছে ৬৩ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো ব্যবহার করেছে মাত্র ২৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এর বাইরে বিধিবদ্ধ আমানত, নগদ জমা সংরক্ষণের হার কমিয়ে ও ঋণ-আমানতের অনুপাতের হার বাড়িয়ে ব্যাংকগুলোতে টাকার প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে ঋণসীমা ২ শতাংশ বাড়ানোর ফলে আরও ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ঋণ দেয়ার সুযোগ পায়। এছাড়া আরও প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার জোগান দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিধিবদ্ধ আমানত, নগদ জমা সংরক্ষণের হার কমিয়ে আনায় আরও প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর হাতে এসেছে। এর বাইরে ব্যাংকগুলোতে আমানত ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে। গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে আমানত বেড়েছিল ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর মধ্যে চলতি আমানত গত অর্থবছরের কমেছিল ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মেয়াদি আমানত গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। ব্যাংকে আমানতকারীদের টাকা জমা রাখার প্রবণতা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে।
গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছিল ১৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ৩৫ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। রেমিটেন্সের কারণেও ব্যাংকে তারল্য প্রবাহ বেড়েছে। সব মিলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য প্রবাহ বেশি মাত্রায় বেড়েছে। কিন্তু ওই হারে ব্যাংক থেকে টাকা বের হয়নি। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কিছুটা বাড়লেও সরকারি খাতে কমেছে। এসব মিলে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ কমে গেছে।
এ বিষয়ে কন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, ব্যাংকগুলো সাধারণত পুরনো গ্রাহকদেরই ঋণ দিয়ে থাকে। অন্য ব্যাংকের গ্রাহক নিয়ে টানাটানি করে। কিন্তু নতুন গ্রাহকদের ঋণ দিতে চায় না। নতুন গ্রাহকদের ঋণ না দিলে অর্থনীতি বিকশিত হতে পারে না। এখন তো মেয়াদি ঋণের চাহিদা কমে গেছে। চলতি মূলধন ঋণের চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ বাড়ছে না। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলোকে করোনার ধকল কাটিয়ে উঠতে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো চললে ব্যাংকই প্রথম উপকৃত হবে।
প্রতিবেদনের তথ্যের দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে ঋণ প্রবাহ বাড়ার হার কমেছে ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে- সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঋণ। ঋণের একটি বড় অংশ গ্রহণ করে সরকার। কিন্তু করোনার কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কম হওয়ায় সরকারের ঋণ গ্রহণ কমেছে। গত বছর প্রায় ৬৬ দিন সাধারণ ছুটির কারণে রাজস্ব আয় কম হয়েছিল। যে কারণে ওই বছর সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়েছিল।
গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ৪০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে ঋণ প্রবাহ বাড়ার হার কমেছে ৪০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। গত অর্থবছরে একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছিল ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে ঋণ প্রবাহ বেশি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ। করোনার প্রভাব মোকাবিলায় প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বেসরকারি খাতে কম সুদে ঋণের জোগান বাড়ানো হয়েছে। এ কারণে এ খাতে ঋণের প্রবাহ বেড়েছে। তবে মেয়াদি ঋণের চাহিদা বাড়েনি। ফলে মেয়াদি ঋণ কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনায় ব্যাংকগুলোও ঋণ দিতে শঙ্কিত। তারা যাচাই-বাছাই করছে। আবার মেয়াদি ঋণের চাহিদাও কম। কারণ এখন ঋণ নিয়ে নতুন শিল্প করার কোনো ঝুঁকি নিচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। এসব কারণে সুদের হার কমলেও ঋণের চাহিদা খুব বেশি বাড়ছে না। করোনার কারণে গত বছরে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছিল। এ কারণে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিজের হাতে রেখেছিল। এ কারণে বেড়ে গিয়েছিল ব্যাংকবহির্ভূত মুদ্রার পরিমাণ বা ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পরিমাণ। গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি ব্যাংকবহির্ভূত মুদ্রার হার বেড়েছিল ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এ হার বাড়েনি, বরং কমেছে ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে গ্রাহকদের ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তোলার চাহিদা অনেক কমেছে। এসব মিলে ব্যাংকে টাকা পড়ে আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ