বৃহস্পতিবার ০৫ আগস্ট ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

 

 

সাজজাদ হোসাইন খান

॥ আটত্রিশ ॥

ধনাশীলের মতো আরো একজন আসতো পনর বিশদিন পরপর। তার নাম ছিল নিতাই ধোপা। বাড়ির ময়লা কাপড়চোপড় সে নিয়ে যেতো। কদিন পর আবার ফেরত দিয়ে দিতো। ইসতেরি টিসতেরি করে। নানা বাড়ির এ রেওয়াজটি অনেকদিন পর্যন্ত চালু ছিল। এমনটা আমাদের ঘাটুরার বাড়িতেও দেখেছি। নাপিত আসতো, ধোপা আসতো। দাদাদের পায়জামা-পাঞ্জাবী চাচাদের কাপড় চোপর নিয়ে যেতো। মাঝে মাঝে দাদি-ফুফুদের শাড়ি কাপড়ও নিতো। তার নাম ছিলো মহেশ ধোপা। আমাদের গ্রামেরই পশ্চিম মাথায় ছিলো তার বাড়ি। কাউয়ালপাড়া ছিলো সে এলাকাটির নাম। মহেশ ধোপা আর নিতাই ধোপারা যে কোথায় কে জানে। তবে ধনা মামার সাথে দেখা মিলে নানা বাড়ির সীমায় যখন পা পড়ে আমার। বছরে তো দু একবার আসাই হয়। আগানগরের খাল-বিল আর বরই-পেয়ারা বাগান ঘুরতে। বিলের ধারঘেঁষে বেড়ানোর মজাটাই আলাদা। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঝুলতো তখন পাড়ে পাড়ে ঘুরতাম, আমি আর হুমায়ুন মামা। বক-বালিহাঁস উড়তো। বিলে ভাসতো হাঁস। প্যাঁক প্যাঁক আওয়াজ করে দৌড়াতো মাছের পেছন পেছন। হররোজই আমাদের টানতো বিল হাঁস-বালিহাঁস। ধলবক, কানিবকের উড়াল। জানতে পেরে আমাকে আর মামাকে বকাঝকা করে ছিলেন আম্মা। পানির কাছে যেতে বারণ করলেন। কখন কি বিপদ ঘটে কে জানে। পানি বলে কথা। আমরা দু’জন মাথা নিচু করে রাখলাম।

দেখতে দেখতে বাদামের মৌসুম এসে গেলো। নানাদের ছিলো অনেক জমি চরে। সে জমিগুলোতে চাষ হতো বাদাম। বাড়ির দু’উঠানের মাঝখানটায় রাখা হতো বাদাম গাছের আঁটি। সেই আঁটির গোড়ায় ঝুলছে কাঁচা কাঁচা বাদাম। সে সব বাদাম আলদা করা হতো গাছ থেকে। এই বাদাম ছেঁড়ার সময় একটা অন্যরকম গন্ধ ভাসতো সারাবাড়ি জুড়ে। টকমিষ্টি। বাদাম ছেঁড়ার জন্য মহিলারা আসতো দল বেঁধে। সাথে ছোটরাও আসতো। গাছ থেকে বাদাম আলাদা করে যার যার পাশে জমা করতো। এমনটা চলতো মাগরিবের আগ পর্যন্ত। আমি বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে থাকতাম। তখন একটা ভিন্নরকম খুশি বুকের ভিতর হাঁটতো নিঃশব্দে। জমা করা বাদাম ভাগ করে দিতো বাড়ির কর্মচারীরা। তিনটা ভাগ হতো বাদামের। একভাগ পেত যারা বাদাম ছিঁড়েছে। আর দু’ভাগ থাকতো নানাদের। একভাগ দখলে আসতেই মহিলারা খুশিতে বাগবাগ । এমন বাদাম ছিঁড়াছিঁড়ি চলতো প্রায় সপ্তা দু’এক। বাদামের মৌসুমে একটা ভিন্নরকম হই-হল্লা লেগেই থাকতো সারা নানাবাড়িতে। আর ভাসতো টকমিষ্টি বাতাস। আগানগরের প্রায় বাড়িতেই চলতো এমন বাদাম উৎসব। উল্লাস আর ফুর্তি। তখন উঠান জুড়ে থাকতো বাদাম আর বাদাম। ঝুঁকে পড়তো সূর্য- রোদ। উত্তাপ শুষে নিত বাদামের পানি। তারপর বেচা-বিক্রির আয়োজন।

কোত্থেকে যেনো পানি এসে দাঁড়িয়ে থাকলো। ঘাটলায়। রাত পার হতে হতেই সয়লাব সারা তল্লাট। নজর ঘুরালেই পানি আর পানি। সারা গ্রাম ডুবুডুবু। মেঘের ছাদে শুয়ে শুয়ে এলো বৃষ্টি। ঝরতে থাকলো ঝুপঝাপ। আম্মা বললেন বর্ষাকালে নাকি এমনটা হয়। বর্ষার সময় পানি আসে। বর্ষার সময় বৃষ্টি নামে। পানি থৈ থৈ। নৌকা বাঁধা ঘাটে ঘাটে। অন্য সময় কোথায় থাকে এতো পানি! ভাবনারা মোচড় খায় মগজে। আমি আর হুমায়ুন মামা বারবার ঘাটে যাই। পানিতে হাঁটা-চলা করি। গ্রামের বালক-বালিকারও পানির নরম শরীরে হাত রাখে পা ভেজায়। তখনও হাঁটুর উপরে উঠেনি পানি। একটা অন্যরকম খুশিতে পেয়ে বসে। রাত কাবার হতেই ফুলে ফেঁপে হাঁটুর অনেক উপরে উঠে গেছে পানি। ছোট ছোট মাছ দৌড়ঝাঁপ দিচ্ছে। গ্রামের এপাড়া থেকে অন্যপাড়ায় যাচ্ছে ঠান্ডা বাতাস। গাছ গাছালিতেও যেন বসে আছে খুশি। এরি মধ্যে নানাবাড়ির ঘাটেও ভিড়েছে নৌকা। চলাফেরায় নৌকাই এখন ভরসা। ছোট ছোট ঢেউ এসে মাথা ঠুকছে নৌকার তলায়। এখন আবার বৃষ্টি ঝরছে প্রায় প্রতিদিন। ঘরে বসেই দিন কাবার। বৈঠকখানায় জমে আড্ডা। বাদামভাজার ধুম পরে। বৃষ্টির দিনে বাদাম এক অন্য রকম স্বাদ! এই স্বাদ গিলছি হররোজ। আম্মা সাবধান করলেন। বাদাম পেটে সমস্যা করে। কম কম খাও। কে শোনে কার কথা। 

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মনটাও এক সময় ভিজা ভিজা হয়ে গেল। পড়ালেখা উঠলো কারে। বোঝা গেলো আম্মাও চিন্তিত। চিন্তা আসারই কথা। দেখতে দেখতে উড়ে গেলো বছরে অর্ধেকের বেশি সময়।  আর ভালো লাগছে না। একটা একঁঘেয়েমি চারপাশটায় বসে আছে। গুটিসুটি মেরে। বৃষ্টি আর পানির জ¦ালাতন। অন্যপাশে খেলাধুলার পায়ে বেড়ি। এ অবস্থায় আড্ডা ফাড্ডায়ও মন উসখুস করছে। একদিন রোদ উঠলো। মনের আকাশটা একেবারেই ফকফকা। ঘাটে গিয়ে দেখি সূর্য সাঁতার কাটছে পানিতে। ঝরে ঝরে পড়ছে খুশির রেনু। অপেক্ষা করছিল আরো খুশি। অন্দরমহলে ঢুকতেই আম্মা কাছে ডাকলেন। তারপর জানালেন আমরা আগামী বুধবার রওয়ানা হচ্ছি। তোমার আব্বা স্টেশনে থাকবেন, ঢাকায়। ছুটি ছাটার ঝামেলা। তাই আমরা যেনো চলে আসি। পত্র পাঠিয়েছেন। 

পাশের বাড়ির এক মামার মারফত। তিনি ব্যবসার কাজে গিয়েছিলেন ঢাকায়। সে সময়ই আব্বার সাথে মোলাকাত। খবর শুনে আনন্দ ঝরলো চোখে। আম্মার চেহারায়ও উঠলো চাঁদ। সময়ের পাতা ঝরছে ঝুরঝুৃর। আম্মা গোছগাছ করছেন মালসামান। আর মাত্র দু’চার দিন। তারপরই ফোঁস ফোঁস রেলগাড়ি। প্রতিদিন যেমন আঙুড় বেদানা ভালো লাগে না। হররোজ আনন্দও পানসে পানসে হয়ে যায়।  (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ