বৃহস্পতিবার ০৫ আগস্ট ২০২১
Online Edition

আহমদ মতিউর রহমানের লেখা জীবনী গ্রন্থ

সোনিয়া হুসাইন:

আহমদ মতিউর রহমানের পরিচয় ছড়াকার বা শিশুসাহিত্যিক হিসেবে, কিন্তু তিনি প্রবন্ধ ছোট গল্প ভ্রমণ উপন্যাস, ভ্রমণ গাইড ও জীবনীগ্রন্থ লিখেও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বিশ^সাহিত্য অঙ্গনের খবরাখবর, নোবেল পুরস্কার ইত্যাদি নিয়েও তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। এ পর্যন্ত জীবনী সিরিজে তার ১৪ টি বই প্রকাশিত হয়েছে। আরো দুটি প্রকাশের পথে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় ১০ টি, ২০২০ সালে  তিনটি এবং ২০২১ সালে একটি বই প্রকাশিত হয়। এরমধ্যে ১৩টিই প্রকাশ করেছে দি রয়েল পাবলিশার্স। একটির প্রকাশক সাহিত্য কথা। ২০২১ সালে রয়েল থেকে প্রকাশিত আরো দুটি গ্রন্থ রাজনীতির ইতিহাস চর্চামূলক। গবেষণামূলক এই বই দুটি হলো ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের কারণ ও বাংলার ২০০ বছর’ এবং ‘স্বাধীনতার ৫০ বছর: নারিকেলবাড়িয়া থেকে বাংলাদেশ’। এদুটোতে নবাব সিরাজ ও বীর তিতুমীরের জীবনকাহিনীও ফুটে উঠেছে। 

এ বছর বইমেলা উপলক্ষে রয়েল থেকে আহমদ মতিউর রহমানের ভূমিকা সম্বলিত ‘বেগম রোকেয়া রচনাবলী’ ও ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের ১০০ বছর’ নামে একটি গবেষণামূলক বই প্রকাশিত হয়েছে। এদুটো নিয়ে ২০২১ সালে তার  ৬টি বই প্রকাশিত হয়েছে। করোনাকালে এই সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।  

এ লেখায় তার জীবনী সিরিজ নিয়েই আলোচনা করবো। জীবনী সিরিজে তিনি বেছে নিয়েছেন কয়েকজন বিশিষ্ট কবি লেখক, কয়েকজন বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও বিশ^খ্যাত কয়েকজন বিজ্ঞানী। তাদের মধ্যে আছেন বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, মহীয়সী বেগম রোকেয়া, জাতীয় নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,  তাজউদ্দীন আহমদ, জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ভাষা আন্দোলনে পাঁচজন শহীদ, বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন ও বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন । 

সাহিত্যের, রাজনীতির ও বিজ্ঞানের ইতিহাসে তথা জাতীয় জীবনে জীবনী সাহিত্যের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। জাতীয় নেতাদের জীবনী বলতে গেলে সব ধরনের পাঠকেরই প্রয়োজন। কবি লেখককে বুঝতে, তার সাহিত্য মূল্যায়নে তাদের জীবনীমূলক বইয়ের প্রয়োজন। আহমদ মতিউর রহমানের বই একাজে সহায়ক হবে, বলতে দ্বিধা নেই। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চৈতন্যদেবের জীবনভিত্তিক রচনা আদি যুগের বাংলাদেশ ও সমাজ বুঝতে সহায়ক। চর্যাপদ আদি বাংলা নিদর্শন হিসেবে যেমন গৃহীত, এগুলোর রচনাকারদের জীবনকাহিনীও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। 

আহমদ মতিউর রহমানের লেখা জীবনী আধুনিক যুগের কবি, লেখক, ছাত্রছাত্রীদের তথা সাহিত্যে গবেষকদের জন্য সহায়ক হবে বলাই বাহুল্য। রবীন্দ্র ও নজরুলের জীবনকাহিনী সেখানে নতুন সংযোজন। পল্লীকবি জসীম উদ্দীনকে নিয়ে তেমন কাজ হয় নি। আহমদ মতিউর রহমানের এই বই সেই অভাব কিছুটা হলেও পূরণ করবে। তিনি ‘আসমানী’ ‘রূপাই’ চরিত্র ও সোজন বাদিয়ার ঘাটের বাস্তব ভিত্তিক যে চিত্র তুলে ধরেছেন তা জসীম উদ্দীনকে বুঝতে সহায়ক হবে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বই সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। আর বেগম রোকেয়া নিয়ে আগেও কিছু বই বের হয়েছে, তাঁর এই নতুন বইটি সেক্ষেত্রে নতুন সংযোজন হতে পারে। 

বাংলার জাতীয় নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে নিয়ে বিডি হাবিবুল্লাহর লেখা জীবনী এখন আর সহজলভ্য নয়। আরো কয়েকজন লেখকও লিখেছেন তার উপর। মতিউরের নতুন বইটি এই ধারাকে সমৃদ্ধ করবে। জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে বাংলাদেশে তেমন একটা কাজ হয় নি। এই রাজনীতিবিদের জীবন ও রাজনীতিতে তার অবদান সম্পর্কে জানতে মতিউরের এই বই বিরাট ভূমিকা রাখবে বলা যায়। ১৯৬৩ সালে লেবাননের বৈরুতে হোটেল কক্ষে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘ডন’ এর প্রথম পাতায় এই খবর গুরুত্বসহ ছাপা হয়। লেখক সোহরাওয়ার্দীর জীবনী বইয়ে উক্ত পত্রিকার এই খবরের প্রতিলিপি ছেপেছেন, যা এই বইয়ের একটি বাড়তি আকর্ষণ। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু পাকিস্তানের রাজনীতির ঘটনা প্রবাহ পাল্টে দেয়। সেই সময়টি তাই বোঝা প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে অনেক গ্রন্থ বের হয়েছে। মতিউরের লেখা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অজানা কথা’ চিন্তাশীলদের নতুন তথ্য দেবে। সাহিত্য কথা থেকে প্রকাশিত ছোটদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও কিশোরদের জন্য উপাদেয় হবে। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মূল্যায়নও তেমন একটা হয় নি। মতিউরের তাজ জীবনী সেই অভাব কিছুটা হলেও পূরণ করবে। আর ভাষা আন্দোলনে ৫জন শহিদের জীবনকথাতেও মিলবে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আর শহিদদের বিষয়ে বহু অজানা তথ্য। যেমন তিনি ভাষাশহীদ এক কিশোর অহিউল্লাহর কথা উল্লেখ করেছেন যা নতুন সংযোজন। তাকে নিয়ে ভাষা শহীদ দাঁড়াচ্ছে ৬ জন। 

বাংলায় বিজ্ঞানের উপর লেখা বইয়ের সংখ্যা কম। জীবনী সাহিত্যও কম। এই লেখকের লেখা নিউটন ও আইনস্টাইনের জীবনী সেই অভাব কিছুটা হলেও পূরণ করবে। উৎসাহী পাঠক আহমদ মতিউরের এই ‘বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন’ ও ‘বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন’ বইদুটো পড়ে তাদের সম্পর্কে যেমন জানতে পারবেন তেমনি জানতে পারবেন আপেল গাছ থেকে আপেল পড়া নিয়ে বিজ্ঞানের কি তুমুল আলোড়ন সৃৃষ্টিকারী তত্ত্বের উদ্ভাবন হয়েছিল। এসব গ্রন্থের জন্য তিনি অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। 

এসব বই ছাড়াও আহমদ মতিউর রহমানের লেখা বইয়ের মধ্যে রয়েছে ভ্রমণ উপন্যাস ‘নীলগিরি কক্সবাজার’ (২য় সংস্করণ) প্রকাশক : সাহিত্য কথা, মানসম্পন্ন ও তথ্যবহুল ভ্রমণ গাইড ‘ভ্রমণ বাংলাা : দি রয়েল পাবলিশার্স ; গল্পগ্রন্থ ‘সোনারঙ বিকেলে’, প্রকাশক : কোঅপারেটিভ বুক সোসাইটি; ‘গল্পগুলো ভূতের’ প্রকাশক : সাহিত্য কথা, ‘গভীর রাতের আতংক’ ও ‘আমাদের বারান্দায় এখন পাখি আসে’ , দুটিরই প্রকাশক: ঝিঙেফুল; ছড়াগ্রন্থ ধিচিং লালের ছড়া (২য় সংস্করণ), লাল লাল নীল নীল (২য় সংস্করণ), দুটিরই প্রকাশক : ঝিঙেফুল এবং আরেকটি ছড়াগ্রন্থ ‘প্রজাপতির রঙিন পাখা’, প্রকাশক: সিদ্দিকীয়া পাবলিকেশন্স; কাব্যগ্রন্থ ‘সাংকেতিক চিহ্নগুলো’ প্রকাশক : এবি আই এবং ক্রীড়া বিষয়ক গ্রন্থ ‘বিশ্বকাপ ফুটবল-১৯৯০’ প্রকাশক সৃজন প্রকাশন। দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে তিনি লিখে চলেছেন এবং কয়েকটি বইয়ের একাধিক সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে। জানা যায়, এবছর প্রকাশিত বইগুলোও করোনাকালে ভালোই চলেছে। গল্পগ্রন্থ “আমাদের বারান্দায় এখন পাখি আসে’ ঝিঙেফুলের স্টলে ভালো বিক্রি হয়েছে। শিশুরা বইটি গ্রহণ করেছে। এসব তথ্য  প্রমাণ করে তিনি পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠেছেন।  

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ