শুক্রবার ২২ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

ঘরে ঘরে ভাসুরেরা

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী: বাঙালির গ্রাম জীবনে ভাসুর একটি অনসৃক্ত বটে। এই ভাসুর নিয়ে নানা কথা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। যেমন ভাসুরের নাম নিতে নেই। তাদের সংবোধন করতে ‘উনি’ ‘তিনি’ বলা হয়। আর ভাসুর কোন কারণে সামনে পড়ে গেলে গৃহবধূ লম্বা ঘোমটা টেনে নিজের মুখ আড়াল করেন, যাতে ভাসুর ছোট ভাই-বৌয়ের মুখ সহজে দেখতে না পান। ভাসুরকে ছোট ভাইয়ের বৌয়ের পা ছুঁয়ে সালাম করার রেওয়াজ আছে বটে। তবে সে ক্ষেত্রে ভাতৃবধূ নিজেকে যথেষ্ট আড়াল করেই সে সালাম করেন। এ রেওয়াজ গ্রামগঞ্জে এখনও আছে কিনা বলতে পারি না। কিন্তু ভাসুরের অবস্থান আগের মতোই আছে। গ্রাম্য বধূরা সাধারণত ভাসুরের নাম নেন না। অমুকের বাপ, অমুকের চাচাÑ এই বলে সংবোধন করেন।

ফলে ভাসুর আমাদের দেশে এক কালচারের নাম। আমরা যথাসম্ভব ভাসুরের নাম এড়িয়ে চলি। সেই ঘটনাই দেখলাম বসুন্ধরা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ক্ষেত্রে। এই পরিচালক, যার বয়স ৪২ বছর, তিনি একুশ বছর বয়সের এক তরুণীকে ফুসলিয়ে নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিয়েছিলেন। তারপর নানা অজুহাতে সেই মেয়েটিকে তিনি আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছিলেন। তিনি বসুন্ধরার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর। বসুন্ধরা বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। কী শিল্প নেই তাদের, হাউজিং তো আছেই। তার সঙ্গে আছে শত ধরনের কল-কারখানা। টিস্যু কিনেন বসুন্ধরা, পাইপ কিনেন বসুন্ধরা, কাগজ কিনেন বসুন্ধরা, আটা-ময়দা বসুন্ধরা। তার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর।

সত্তোরের দশকে টাইম ম্যাগাজিনে একটি কভার স্টোরি হয়েছিলÑ কে হবেন কোন্্ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা সিইও। এই বিষয়ে গবেষকরা বলেছিলেন, এমন ব্যক্তি সিইও হবেন যার বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। অর্থাৎ পঞ্চাশ থেকে কোন অবস্থাতেই কম নয়। পঞ্চান্নর উপর হলে ভাল হয়। তার কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছিলেন যে, এই বয়সে এসে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের যৌন আকাক্সক্ষা নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে তারা অফিসের সহকর্মী বা আশপাশের অন্যদের সঙ্গে সহজে যৌন সম্পর্কে মিলিত হন না। তারা নানাবিধ বিষয়ে বিবেচনা করেন এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তারা কাজটাকেই বড় করে দেখেন। অফিসে সাধারণত প্রেমের সম্পর্কের দিকে তারা ফিরেও তাকান না। তাদের কাছে যৌনতা বড় বিষয় হয় না, বড় বিষয় হয় সফর হওয়া, তাক লাগিয়ে দেওয়া। সেই কারণে পঞ্চান্ন থেকে পঁয়ষট্টি বয়সের নারী-পুরুষের সিইও হিসেবে অধিক সফল হয়ে থাকেন। শারীরিক চাহিদা তাদেরও থাকে কিন্তু সেটা নিয়ন্ত্রিত থাকে। ফলে তাদের সিইও কাহিনী সাফল্যের কাহিনী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমদ আকবর সোবহান  বড় বেশি দ্রুত তার ভালবাসার সন্তান সায়েম সোবহান আনভীরকে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে কিংবা তারও আগে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দিয়ে নিজে বোধ করি খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সোবহান সাহেবের সেটি হলো না। এবার আপনি কী বলবেন?

তবে এক দারুণ ঘটনা লক্ষ্য করলাম। সাধারণত সরকার নিষেধ করলে আমরা অনেক জিনিস এড়িয়ে যাই। সরকারও বহু জিনিস আমরা যাতে এগিয়ে যাই তার ব্যবস্থা করে। প্রধানমন্ত্রীর কোন সংবাদ সম্মেলন হলে দু’একটি টেলিভিশনকে এলাও করা হয়। বাকিরা মাত্র বিটিভি দেখে। সব সংবাদপত্রকেও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্সে ডাকা হয় না। মুখচেনা সাংবাদিকরা সেখানে যান। প্রশ্ন করার নামে প্রধানমন্ত্রীর কীর্তন করেন। অনেক সময় মনে হয়, কোন্্ সাংবাদিক কী প্রশ্ন করবেন তা আগে থেকেই তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হয়। কেমন এক আজব ভাসুরীয় কা-? এই চলছে। এর মধ্যে সৎ সাংবাদিকতা আশা করা বাতুলতা মাত্র।

মনিয়ার হত্যা বা আত্মহত্যা নিয়ে অনেক কিছু সোশাল মিডিয়ায় এখন ঘুরছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও তৎপর রয়েছে। ইতিমধ্যে খবর বেরিয়েছে, আনভীরের স্ত্রী কার্গো বিমানে করে দেশত্যাগ করেছেন। আরও কেউ দেশত্যাগ করেছেন কিনা, এখনও জানা যায়নি। আনভীরের বিরুদ্ধে মনিয়ার বোন হত্যার অভিযোগ এনেছেন। তাতে একমাত্র আসামী তিনিই। তিনি হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেছেন।

মোসারাত ওরফে মুনিয়াকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন আনভীরের মা। তিনি মুনিয়াকে ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলেন। ভীত-সন্ত্রস্ত মুনিয়া ঢাকা ছেড়ে কুমিল্লা চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আনভীর তার পিছু ছাড়েননি। তিনি মুনিয়াকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনেন এবং তার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করতে থাকেন। এই পরিচয় সূত্রের প্রথম থেকেই মুনিয়া ডায়রি লিখেছেন। তাতে প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে ছয়টি ডায়রিতে। পুলিশ সেগুলো খতিয়ে দেখছে। মুনিয়ার গলায় কালো দাগ ছিল। হতে পারে তাকে গলা টিপে হত্যা করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। সেটি অবশ্য নাও হতে পারে।

চট্টগ্রামের হুইপ পুত্র শারুনের সঙ্গে মুনিয়ার কথা হয়েছিল। শারুন তাকে বলেছিল, সাবধান থাকতে। আনভীর শারুনের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। ভোগ করেছিল। কিন্তু বিয়ে করেনি। শারুন মুনিয়াকে সতর্ক করেছিল, তোমাকেও ভোগ করবে, বিয়ে করবে না। এ রকম চরিত্রের লোকেরা সাধারণত বিয়ে করার ঝুঁকি নেয় না। মাঝপথে ভোগ শেষে একটা গ-গোল বাধায়। তারপর পরিত্যাগ করে চলে যায়।

মুনিয়ার সঙ্গে দ্বন্দ্ব সে তৈরি করতই। সে দ্বন্দ্ব তৈরি করে মুনিয়ার বাড়িঅলার বাসায় ইফতার পার্টিতে যাওয়া নিয়ে। সেখানে বাড়িঅলার  মেয়ে ছবি তুলে সে ছবি ফেসবুকে আপলোড করে। আনভীরের অভিযোগ, ঐ ছবি তার স্ত্রী দেখবে, দেখে প্রশ্ন করবে। দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে। মুনিয়া আনভীরের শত্রুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, অতএব তার ক্ষমা নেই।

আনভীর আর মুনিয়ার একটি অডিও কথোপকথন এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে। সেটি ভয়ঙ্কর। আনভীরের ভয়াবহ এক ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কাহিনী আছে সে অডিও টেপে। তাতে আনভীর বলছে (যদি এটা ওদের কথোপকথন হয়ে থাকে) তুই আমার ৫০ লক্ষ টাকা নিয়েছিস। সে টাকা ফেরত দে। টাকা রেডি কর, আমি আসছি। মুনিয়া বলছে, আপনার টাকা আমি নেইনি। নিয়েছি, কে বলেছে। তার নাম বলেন। আনভীর বলে না। বলে, টাকা রেডি কর, আমি আসছি। অসহায় মেয়েটি চীৎকার করে কাঁদতে থাকে, আর্তনাদ করতে থাকে। তার সামনে কোনো পথ খোলা নেই। সে শুধু বলে, টাকা নিয়েছি কে বলেছে, বলেন। আনভীর অবিরাম বলছে, তুই চোর, চোর, আমার টাকা চুরি করেছিস। এখনই টাকা ফেরত দে। টাকা রেডি কর, আমি আসছি। অসহায় মেয়েটি চীৎকার করে কাঁদছিল।

সম্ভবত এই পর্যায়ে সে কুমিল্লায় তার বড় বোনকে ফোন করেছিল, আমার ভীষণ বিপদ, তোমরা তাড়াতাড়ি এসো। বড় বোন তখনই কুমিল্লা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন। পথে বার বার ফোন করেছেন। কিন্তু জবাব পাননি। বাসায় এসে দেখেন গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে আছে মুনিয়া।

ওই ভয়ঙ্কর দানবের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আর বোধ করি কোনো পথ ছিল না মুনিয়ার সামনে। সে পালাতেও চেয়েছিল। বাড়িঅয়ালীর কাছে গাড়ি চেয়েছিল। কিন্তু গাড়ি তখন সম্ভবত ছিল না। মুনিয়া পালাতেও পারেনি। ওহ্ খাঁচায় বন্দী জীবের মতো সে শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল।

আনভীর আগাম জামিন পাবে কিনা, বলা যায় না। নৌবাহিনী কর্মকর্তাকে ঘুষি মেরে দাঁত ফেলে দেয়া ইরফান সেলিম সর্বোচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে এসেছেন। কেউ ভাবতে পারেনি। নিশ্চয়ই কোনো যুক্তি আছে তার জামিনের পক্ষে। আমরা আইন-অজ্ঞ মানুষ, আদালতের রায় পছন্দ না হলে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারি, আদালতের রায় তো আর বদলাতে পারি না। সুতরাং আদালত জিন্দাবাদ বা চিরজীবী হোক। আর আমার ভাসুরের খোঁজ করতে থাকি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ