বুধবার ২৮ জুলাই ২০২১
Online Edition

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চিংড়ি শিল্পে বিপর্যয়

খুলনা অফিস : করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চিংড়ি শিল্প দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। রফতানি বন্ধ থাকার কারণে চাষিরা বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্য মূল্য থেকে। সেইসঙ্গে মওসুমের শুরুতে ঘর পরিচর্যা শেষ করলেও চাহিদা অনুযায়ী পোনা ছাড়তে পারছেন না চাষিরা। ফলে গত বছরের মতো এবারও আর্থিক ক্ষতির মুখে তারা। এছাড়া লকডাউনে চিংড়ি পোনা পরিবহন ব্যবস্থা অচল থাকায় পোনার সংকটও দেখা দিয়েছে। আর এ কারণেই গলদা-বাগদা পোনার দাম হুট করে বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। অনেকেই বেশি দামে পোনা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
খুলনা জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, খুলনাসহ উপকূলীয় জেলাগুলোর প্রায় দুই লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে প্রতিবছর বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাষ হয়। চাষের সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। আর দেশের চিংড়িঘেরের ৮০ শতাংশই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায়। দেশে মোট চিংড়ি উৎপাদিত হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে খুলনাঞ্চল হতে প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি রফতানি হয়। ২০১৬-১৭ বছরে উৎপাদন কমায় রফতানি কমে দাঁড়ায় ২৫ হাজার মেট্রিক টনে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চিংড়ি রফতানি হয়েছে ২২ হাজার মেট্রিক টন।
বাগরহাট মৎস্য অধিদফতরের হিসাব মতে বাগরহাটে চিংড়ি চাষি রয়েছেন ৭৯ হাজার ৭৩৬ জন। আর ৭১ হাজার ৮৮৬ হেক্টর জমিতে ৮১ হাজার ৩৫৮টি বাগদা ও গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে। এসব ঘেরে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ১৭ হাজার ৪৮৭ মেট্রিক টন বাগদা ও ১৬ হাজার ৩৩৭ মেট্রিক টন গলদা চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে।
বাগরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস,এম রাসেল বলেন, করোনার প্রভাবে রফতানি বন্ধ থাকায় বর্তমানে মাছের দাম অনেকটা কমে গেছে। এর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষিরা। রফতানি বন্ধ থাকায় গত এক বছর বাগরহাটের চিংড়ি শিল্প ক্ষতির পরিমাণ ১শ’ ৪০ কোটি টাকা। আর সব মিলিয়ে এই ক্ষতির পরিমাণ হবো প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। এরই মধ্য বাজারে পোনা সংকটও দেখা দিয়েছে। বাগেরহাটে ৭৭ কোটি বাগদা ও ২১ কোটি গলদা পোনার চাহিদা রয়েছে। চাষিদের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এর অংশ হিসাব জেলার ২৮ হাজার মৎস্য চাষিক আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি সহজ শর্তে চাষিদের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
খুলনা মৎস্য পরিদর্শন ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিস সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া হিমায়িত চিংড়ির ৮৫ ভাগ যায় ইউরোপে, আর ১৫ ভাগ আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে। তবে এসব দেশে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানায় এক প্রকার বন্ধ হয়ে পড়েছে হিমায়িত চিংড়ি রফতানি। ফলে আর্থিক মন্দার শিকার হয়েছে দেশের অন্যতম রফতানি পণ্যের এই খাত।
চিংড়ি চাষের সঙ্গে জড়িত ঘের মালিকরা জানিয়েছেন, এ মওসুমে ঘেরের হার বেশি। চিংড়ি পোনার দামের ঊর্ধ্বগতি, মাছের খাবারের দাম বেশি, ঘের প্রসেসিংয়ের জন্য মালামালের দাম এবং শ্রমিকের মজুরিও বেশি। কিন্তু, মাছের দাম কম। আর তার জন্যই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা।
বাগরহাটের রামপাল উপজলার ফয়লাহাটে আগে প্রতিদিন কোটি টাকার গলদা-বাগদা বেচাকেনা হলেও এখন আর নেই আগের মতো কর্মব্যস্ততা। করোনাভাইরাসের প্রভাবে পোনা পরিবহন সংকট দেখা দেওয়ায় শূন্য হাঁড়ি নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে এই আড়তের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের।
আড়তদার ও চিংড়ি পোনা গণনাকারি শ্রমিকরা জানান, গত ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া কঠোর লকডাউনের কারণে অনেকটা বেকার হয়ে পড়ছে এই হাটের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকসহ প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার মানুষ। আবার, এমন অবস্থা চলতে থাকলে মওসুমের শুরুতে চাহিদা অনুযায়ী পোনা সরবরাহ করতে না পারলে চিংড়ি চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
আড়তদার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও কক্সবাজার থেকে বাগদা ও গলদা পোনা আসে এই হাটে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এই হাটে প্রায় কোটি টাকার গলদা-বাগদার পোনা বেচাকেনা হয়। তবে করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে হাটে। আগের মতো পোনার সরবরাহ নেই। চাষিরা চাহিদা অনুযায়ী পোনা পাচ্ছেন না। এ কারণে ৯৫ শতাংশ চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। লকডাউনের কারণে হাটে পোনা সরবরাহ কমে যাওয়ায় কারণে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা অসহায় দিনযাপন করছেন।
হাটে চিংড়ি পোনা গণনাকারী তরিকুল ইসলাম বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি ফ্যামিলিকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য আমাকে বাজার আসতে হচ্ছে। এক হাজার মাছ গুনলে আমি বিশ টাকা পাই। লকডাউনের কারণে তাও বন্ধ।  
চিংড়ি পোনা গণনাকারী হাকিম শেখ বলেন, ‘পোনা-পাতি আসতিছে না, তালি আমরা কি করে বাঁচবো? বাড়ি ছেলে-মেয়ে আছে, মা আছে। আমাদের তো না খেয়ে মরার পথ।’
চিংড়ি চাষি হারুন শেখ বলেন, ‘আমি আইজ ১২-১৩ বছর ঘের করি। আমার ঘেরের পরেই সংসার চলে। এই করোনাকালীন সময়ে আইসে মাছের রেট কুমে গেইছে। আগে মাছ বিক্রি করিছি ১৩-১৪শ’ টাকা, এখন সেই মাছের দাম ৬শ’ থেইকে ৯শ’ টাকা গলদা-বাগদা। আমার ১০-১২ বিঘার দু’টি ঘের আছ। আমি যা লগ্নি করছি, তার অর্ধেক টাকাও আসবে না। এখন সামনে আর ঘের করবো কি না, সেই তৌফিক থাকবে কি না, টাকা থাকবে কি না...করার মতো সেই অবস্থা আর নাই।’
চিংড়ি চাষি আতিয়ার গাজী বলেন,‘আমরা ঘের রেডি করে রাইছি। মাছ ছারতি পারতিছিনা করোনার কারণে। মাছ পাওয়া যাচ্ছে না, কম কম আসে, দাম বেশি। আগে ছিল বাগদার হাজার ৩শ’ টাকা, এহন ৬শ’ টাকা- ডবল দাম। নদীর বাগদা ছিল ৭শ’ টাকা এহন ১২-১৪শ’ টাকা- তাও পাওয়া যাচ্ছে না। রেনু (গলদা) হালকা-পাতলা পাওয়া যাচ্ছে ৩ হাজার ৩২শ’ টাকা করে হাজার।’
বারাকপুর চিংড়ি আড়তদার সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, করোনাকালীন সময়ে চিংড়ি শিল্পে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ১৭শ’ টাকার চিংড়ি মাছ ৮শ’-৯শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই চিংড়ি শিল্প থেকে প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব আয় হয়। চিংড়ি শিল্পকে বাঁচিয় রাখতে হলে চাষিদের সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। তা না হল এই খাতকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
ডুমুরিয়ার চাষি গাজী মেহেদী হাসান বলেন, ‘মওসুমের শুরুতে চিংড়ি ঘেরে পোনা ছাড়া যাচ্ছে না। দাম বেশি, পোনা পাওয়া যাচ্ছে না।’
খুলনা বিভাগীয় পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পাইকগাছা উপজেলার পুরস্কারপ্রাপ্ত ঘের ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া রিপন বলেন, চিংড়িতে  করোনার প্রভাব মারাত্মক। আর আম্পানের আঘাতে সব স্বপ্নই চুরমার হয়েছে। তারপরও চাষিরা মাথা তুলে দাঁড়াতে সচেষ্ট। কিন্তু, ১০-১২ দিন হলো অজানা কারণে চিংড়ি মরতে শুরু করেছে। এখন মাছ তোলার গোনে চিংড়ি মরার কারণে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, পোনা স্বল্পতা রয়েছে। তারপরও হ্যাচারিতে সামান্য পোনা থাকলেও চাষিদের অনাগ্রহে তা বিক্রি হচ্ছে না। ঘেরে মাছ মরার কারণে চাষিরা নতুন করে পোনা ছাড়ছেন না।
চিংড়ি ব্যবসায়ী লিটন পরামানিক বলেন, করোনার প্রভাবে মাছ রফতানি বন্ধ। দেশের বাজারেও ক্রেতা নেই। তাই বেকার অবস্থায় দিন কাটছে।
খুলনার কয়রা বাগালি ইউনিয়নের বাগদা চাষি মফিজুল ইসলাম জানান, গরমের কারণে ঘের-পুকুরে চিংড়ি মরছে। গরমে ঘেরে পানি কম, বৃষ্টি নেই, পোনা ও খাবার সংকট, কর্মচারীদের বেতন সব মিলিয়ে বড় ধরনের লোকসানে তারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ