বৃহস্পতিবার ০৫ আগস্ট ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

সাজজাদ হোসাইন খান:

 

।।সাঁইত্রিশ ।।

খেলাতেই বেলা যায়। টুপটাপ ঝরে সময়। আকাশে সূর্য হাঁটে।  দৌড়ায় চাঁদ। পার হয় জোসনার বন। অশোকতলা রামচন্দ্র পাঠশালা হঠাৎ হঠাৎ জেগে ওঠে চোখের মণিতে। আগানগর তখন ঝাপসা ঝাপসা । ঝাঁপিয়ে পড়ে সন্ধ্যা, সারা শরীর জুড়ে। ভাবনারা দাঁড়িয়ে থাকে হতাশার কপাট ধরে। বেশ কদিন থেকেই এমন লাগছে। আব্বার দেখা নাই। কিভাবে আছেন কে জানে। আম্মাকে জিজ্ঞেস করলেও সঠিকভাবে তেমন কিছু বলতে পারেন না। শুধু বলেন ভালো আছেন। কদিন বাদেই নাকি আসবেন। আমরা ঢাকা যাবো সহসা। কেন! মন খারাপ লাগছে আব্বার জন্য। আমি নীরব থাকলাম। দেখলাম আম্মার মনও হাসফাস করছে। এদিকে আমার পড়ালেখারও ছেড়াবেড়া অবস্থা। যদিও মামার সাথে আগানগর স্কুলে যাই। সকাল বিকাল পড়ায় যোগ দিচ্ছি বৈঠকখানায়। স্যার আছেন, আছেন মওলানা হুজুর। তারপরও শহরের স্কুল বলে কথা। হঠাৎ মনটা কেমন যেন ভিজাভিজা হয়ে গেল। মনের কিনার ঘেঁষে ভাসছে হতাশার কচুরিপানা। দিন যাচ্ছে প্রজাপতির পাখায় ভর করে। মাঝ বরাবর এসে নানাবাড়ির দিনগুলো কোথায় যেন হোঁচট খাচ্ছে। আনন্দ-পুলকে ভাটার টান। সকাল-দুপুর কাটে বৈঠকখানার বারান্দায়, নিরানন্দ। জালালী কবুতরের দাপাদাপিতে ঘোর ভাঙ্গে। বৈঠকখানার কারে অনেকগুলো কবুতর। নানাবাড়ির প্রতিটি ঘরেই কবুতরের বাড়িঘর। অবাক ব্যাপার হলো এসব কবুতরকে তেমন কেউ যতœ আত্তি করে না। এরা আপনা থেকেই বাসা বাঁধে। কোথা থেকে যে আসে কে জানে। বাড়ির উঠানজুড়ে এরা হাঁটে টুকটাক। ঠুকরে ঠুকরে কি জানি খায়। ভয় ডর নাই একেবারেই। কবুতরের দৌড়ঝাঁপে হতাশার কচুরিপানাগুলো ডুবে যায় এক সময়। আবার জাগতে থাকে আনন্দের আকাশ। 

বৈঠকখানার পাশেই লম্বামতো একটি টিনের ঘর। সে ঘরটিতে বসে সকালের মক্তব। আশেপাশের বাড়িঘর থেকে বালক বালিকারা এসে জমা হয়। কারো হাতে কায়দা, কারো হাতে সিপারা, কেউ কেউ আনে কুরআন শরীফ। এদের সংখ্যা অবশ্য অল্প। মাওলানা হুজুর প্রতিদিন আরবি পড়ান। তিনি নানাবাড়িতেই জায়গির থাকেন। এখানে আসলেই আমিও এই মক্তবের ছাত্রবনে যাই। এ মক্তবেই কায়দা শেষ করে সিপারায় সবক নিয়ে ছিলাম। মনে আছে যে দিন সিপারায় সবক নেই সেই খুশিতে মক্তবের বালক-বালিকা এবং কাছের ঘরবাড়ির লোকদের মিষ্টিমুখ করাতে হয়েছিল। গ্রামে এমনটাই নাকি রেওয়াজ। সেদিন একটা অন্যরকম পুলকে পুলকিত হয়েছিল মন-শরীর। নানি আনন্দে একবারে কেঁদেই ফেললেন। আম্মাও খুশিতে আটখানা। সারাবাড়ি জুড়ে যেন আনন্দের হাঁট বসলো। মওলানা হুজুরও আমার মাথায় পিঠে হাত বুলালেন বার কয়েক। এদিকে স্কুলবইয়েরও পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে হচ্ছে সকাল বিকাল। মামার সাথে স্কুলে যাই। দুএক কদম গেলেই সে স্কুল। সেখানেও ঘন্টা বাজায় দপ্তরি। গ্রাম হলে কি হবে স্কুলটি পরিপাটি। টিনের ঘর বেশ মজবুত। পাকা ভিটি। রামচন্দ্র পাঠশালা থেকে অনেকটাই উঁচু জাতের। তবে ভূপাল স্যারদের মতো পাঠের কায়দা কৌশলে তেমনটা দাপুটে নয় আগানগরের স্যাররা। এরপরও ¯েœহ-ভালবাসায় কমতি নাই। ছাত্ররাও মান্যগণ্য করে স্যারদের। হেডস্যার ছিলেন ফইজুদ্দিন মাস্টার। এ গ্রামেরই দক্ষিণ পাড়ার বাসিন্দা। খুবই হাসিখুশি লোক। পড়াতেনও ভালো। 

একদিন সকালে ধনা মামা এসে হাজির। পুরা নাম ধনঞ্জয় শিল। ধনা নাপিত বলেই চিনে এলাকার লোকজন। হাতে কাঠের একটি ছোট বাক্স। কাঁধে জড়ানো গামছা। হাঁটু পর্যন্ত উঠানো লুঙ্গি আর গায়ে জড়ানো গেঞ্জি মতো একটি জামা নীল রংয়ের। আমি আগে থেকে তাকে চিনতাম। নানাবাড়ি এলেই তার সাথে আমার দেখা হয়ে যায়। এবারও ধনা মামার সাক্ষাৎ মিলল। দূর থেকেই চিৎকার দিয়ে বললেন কি মামু কেমন আছো। শরীর-টরির ভালো তো। বললাম ভালো, আপনি কেমন। ধনা নাপিত মাসে একবার করে আসেন নানাবাড়িতে। চুলটুল ছেঁটে দেন। যার যার দরকার। এবারও এসেছেন সে কারণে। এরিমধ্যে পৌঁছে গেলো খবর অন্দরমহলে। বেড়ার আড়াল থেকে আম্মা ডেকে বললেন ধনাভাই তোমার ভাগিনার চুলটা ভালোভাবে ছেঁটে দাও। চুলগুলো একটু খাটো করে দিও। মামুর চুল  কাটব না তো আর কার কাটবো। বলেই ডাকলেন আসো মামু তোমাকে দিয়েই শুরু করি। আমি নীরব থাকলাকম। আম্মার কথা শুনে ভিতরে ভিতর রাগ উথাল পাতাল করছে। ধনা মামাকে বললাম আমি চুল ছোট করব না। ঠিক আছে মামু চুল খাটো করব না, বলেই ধনাশীল হাসলেন। বৈঠকখানার মুখোমুখি ছিল দুটি আমগাছ। একটির তলায় চেয়ার পাতা হলো, ছায়া মতো জায়গায়। তারপর পাশে রাখা তার জাদুর বাক্সটির ঢাকনা উঠালো। আমি সবসময় তার বাক্সে কি আছে দেখার জন্য ব্যস্ত থাকতাম। খুলতেই দেখি সেখানে চুল কাটার যন্ত্রপতি। ধনামামা আমার চোখের ভাষা পড়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন কি মামু লাগবে তোমার। আমি হাসলাম। ধনঞ্জয়শীলের বাড়ি ছিল রাজনগর। নানাদের গ্রামের দু গ্রাম পড়েই সেই গ্রাম। (চলবে)

 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ