শনিবার ০৮ মে ২০২১
Online Edition

মাহে রমযানের প্রকৃত শিক্ষা

এইচ এম আব্দুর রহিম: মাহে রমযানের রোজা মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। ব্যক্তি পরিবার সমাজজীবনে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে চলার শিক্ষা দেয়। হিংসা বিদ্বেষ হানাহানি ও আত্ম অহংবোধ ভুলে গিয়ে সুখী সুন্দর সমৃদ্ধশালী সমাজ প্রতিষ্ঠার মাস হলো মাহে রমযান। উম্মতে মুহাম্মদীর নৈতিক চরিত্রকে উন্নত করে সাহাবায়ে কেরামের মত আদর্শ জীবন গঠন করার প্রশিক্ষণ এ মাসে দিতে হয়। রোজা মানুষকে প্রকৃত ধার্মিক হিসাবে গড়ে তোলার সুযোগ দেয়। রোজাদারদের ইবাদত বন্দেগীর ভেতর দিয়ে সব ধরনের অন্যায় অত্যাচার, দুরাচার-পাপাচার ও যাবতীয় অকল্যাণের কাজ-কর্ম থেকে বিরত হয়ে সংযম সাধনার পথ ধরে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়। ক্ষুধা তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করে একত্রে ইফতার, দীর্ঘ তারাবী নামায, সেহরি-এসব কিছুর মাধ্যমে একজন রোজাদার ব্যক্তি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন। ঈদুল ফিতর উদযাপনের মাধ্যমে মাহে রমযানের পরিসমাপ্তি ঘটে। রমযান মাসের সম্পূর্ণ কার্যক্রমটি ইসলামী সংস্কৃতির মহান ঐতিহ্য বহন করে। রোজা মুসলমানদের চরিত্র গঠন, নিয়মানুবর্তিতা ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের শিক্ষা দেয়। সত্যিকার মুমিন হিসাবে গড়ে উঠার অনুপম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাস এ রমযানুল মোবারক; এর মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সব ধরনের নাফরমানি থেকে বিরত থাকার নাম ‘তাকওয়া’। রোজা মানুষের মনে ভয় ভীতি সৃষ্টি করে থাকে। আল্লাহর কাছে বান্দার মান মর্যাদা নির্ধারণের একমাত্র উপায় তাকওয়া। এটি মানুষের মনে সৎ মানবিক গুণাবলী সৃষ্টি করে। সুতরাং, যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে বিরত থেকে ভাল কাজ করতে পারলেই রোজা পালন সফল সার্থক হবে। এভাবে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে অর্জিত প্রশিক্ষণ দ্বারা নিজেদের একজন সৎ ও খোদাভীরু নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে। রোজার শিক্ষা নিয়ে তাকওয়ার গুণাবলী অর্জনের মধ্য দিয়ে মানুষ ইহকালীন কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তি লাভ করতে পারে। মাহে রমযানের শিক্ষা যদি ১১ মাস কাজে লাগানো যায়, তাহলে পৃথিবীতে এত অশান্তি ও অনাচার থাকতে পারে না। যেমনভাবে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যে সংশোধিত হলো সে সফলকাম হলো’ (সূরা আল-আ’লা, আয়াত-১৪) মাহে রমযান মানুষ কে ঐশ্বরিক গুণে গুণান্বিত হওয়ার এবং কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়। রোজাদার একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, প্রভৃতি রিপু দমনপূর্বক রোজা পালন করেন। রোজার মাধ্যমে পরমত সহিষ্ণুতা, হত দরিদ্রের প্রতি সাহায্য সহযোগিতা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতা শিক্ষা লাভ করেন। রোজা মানুষের ভেতর ও বাহির দুই দিকের সংশোধন করে। মানুষের বাতেন বা ভেতরের অবস্থা পরিবর্তন করা, অর্থাৎ আলোকিত করা এবং তার স্বভাব চরিত্র আচার আচরণ সংশোধনপূর্বক প্রকাশ্যভাবে সুন্দর করে গড়ে তোলা রোজার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এ পরিপ্রেক্ষিতে রোজা মানুষকে পার্থিব লোভ লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের আকাক্সক্ষা প্রভৃতি থেকে সরিয়ে রেখে আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। রোজা মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ, মিতব্যয়িতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার শিক্ষা দেয়। তাই এ  মাসে রমযান মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সবাইকে প্রকৃত মানুষ হিসাবে গড়ে উঠার দৃপ্ত শপথ নিতে হবে। রোজা মানুষকে সংযমী মনোভাব গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ শিক্ষা দেয়। রোজা পালনের মাধ্যমে মানুষ নিজের নফস বা অন্তঃকরণকে পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। মাহে রমযানে এ শিক্ষাকে সবর ধৈর্য ও সহনশীলতার শিক্ষা বলা হয়। রোজাদার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও ক্ষুধার্ত থাকেন এবং অনাহারি, অর্ধাহারিদের সঙ্গে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। তাই মাহে রমযানের মানুষকে দুঃখীজনের পাশে দাঁড়াতে শিক্ষা দেয়, সৃষ্টি জগতের প্রতি উদার, সহমর্মিতা ও দয়াশীল হতে শিক্ষা দেয়। মাহে রমযানের শুভ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে কাজে লাগানো যায়। শুধু রমযান মাস নয়, সমগ্র জীবনে যদি সবাই দুঃখীজনের পাশে থাকি, তবে মানব সমাজে আর কোনো রকম অসাম্য ও বর্ণবৈষম্য থাকতে পারে না। রোজা পালন করে মানুষ ইবাদত বন্দেগীর দ্বারা আল্লাহর অশেষ নিয়ামতের শোকর আদায় করতে শেখে এবং শরিয়তের বিধানের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারে। এভাবে যদি সে কোন কামনা বাসনা ত্যাগ করে ঐকান্তিকতার সাথে রোজা রাখে এবং ধৈর্যের সঙ্গে  যাবতীয় কষ্ট সহ্য করে, তাহলে সে অবশ্যই সৌভাগ্যের অধিকারী হবে। তাই রোজাদারের জন্য আল্লাহ পাক নিজ হাতে সওয়াব প্রদানের সুসংবাদ দিয়েছেন। রমযান মাসকে তাকওয়া অর্জন, নৈতিক চরিত্র গঠন ও প্রশিক্ষণের মাস হিসাবে গ্রহণ করা বাঞ্চনীয়। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক স্নেহ, ভালোবাসা, মায়া-মমতা, আন্তরিকতা, দানশীলতা, বদান্যতা, উদারতা, ক্ষমা, পরোপকারিতা, সহানূভুতি, সমবেদনা প্রভৃতি সদাচরণ জন্মায়। মাহে রমযানের যে মহান শিক্ষা, তা গ্রহণ করে ব্যক্তি পরিবার ও সমাজ জীবনে শান্তিও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রোজা যে শিক্ষা দেয়, সে অনুযায়ী মানবজীবন পরিচালিত করা উচিত। মাহে রমযানে সংযম সাধনার শিক্ষা রয়েছে। আমাদের জাতীয় জীবনে যথার্থ প্রতিফলন ঘটাতে হবে। প্রকৃত পক্ষে মুসলমানদের ব্যক্তিগত জীবন পারিবারিক জীবন, সামাজিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক জীবনসহ সর্বস্তরে অনুশীলনের শিক্ষা দিয়ে থাকে। তাই রোজার প্রকৃত শিক্ষা ও উদ্দেশ্যের প্রতি যত্নবান হতে হবে, নিজেদের মানুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করতে হবে। মানবিক গুণাবলীতে জীবনকে আলোকিত করতে হবে। তাহলে রমযানের সিয়াম সাধনা অর্থবহ হবে। তখন মানুষের মধ্যে গড়ে উঠবে সুমধুর সম্পর্ক বিদায় নিবে অরাজকতা, অন্যায়-অনাচার এবং দুর্নীতি ও ভেজালমুক্ত হয়ে আর্দশ জাতি হিসাবে আমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব। রমযান মাসের সফল পরিসমাপ্তি সমাজ জীবনের আমূল পরিবর্তন, আত্মসংযম, মানবপ্রেম ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বয়ে আনুক। তবে বিশেষ করে রমযান থেকে মানুষ তিনটি জিনিস শিক্ষা লাভ করে তাহলো (১) কম কথা বলা। (২) স্বল্প নিদ্রার অভ্যাস। (৩) নিজেকে স্বল্প পানাহার। তাছাড়া রোজাদার রমযান মাস জুড়ে অনুভব করছেন গরিব দুঃখীর ক্ষুধার যন্ত্রণা। একজন সফল রোজাদারের সফল শিক্ষার আলোকিত দিকগুলো হলো : (ক) আল্লাহর ভয় ও নৈকট্য লাভ। (খ) ধৈর্যের শিক্ষা। (খ) নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষা। (ঘ) রোজাদার হয়ে উঠে পরিশ্রমী। (ঙ) রোজাদার হয়ে উঠে সত্যবাদী। (চ) রোজা দায়িত্বশীল হতে শিখায়। (ছ) রোজার অন্যতম প্রশিক্ষণ নামায। (জ) কুরআনের বিধান বাস্তবায়নের মাস রমযান। (ঞ) গোনাহ মুক্তির মাস রমযান। (ট) রোজার মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা। আল্লাহপাক রমযানের শিক্ষাকে বাকী ১১টি মাস পালন করার তওফীক দান করুন আমীন।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ