শনিবার ০৮ মে ২০২১
Online Edition

কর্মহীন নারীদের পুনর্বাসন

করোনার নেতিবাচক প্রভাবে মানুষের কর্মের ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। করোনার প্রাথমিক ধাক্কার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসলেও দ্বিতীয় ঢেউ সবকিছুকেই ওলটপালট করে দিয়েছে। সঙ্গত কারণেই মানুষের জীবনযাত্রা আবারও স্থবির হতে শুরু করেছে। উৎপাদন, আমদানি, রফতানিতে নেমেছে ধস। ফলে কাজ হারিয়ে ফের ঘরে ফিরতে হচ্ছে লক্ষ-লক্ষ শ্রমিককে। 

এক্ষেত্রে বড় সমস্যায় পড়েছেন কর্মচ্যুত নারী শ্রমিকরা। করোনার প্রাথমিক আক্রমণ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নারীকর্মীরা কর্মহারাতে শুরু করলেও তাদের অধিকাংশই নতুন করে কাজে ফিরতে পারেননি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পায়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার’ ও ‘ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জরিপ-এর ফলাফল থেকে জানা গেছে, গত বছর জুন মাসে কর্মজীবী ৩২ ভাগ নারী কাজ হারিয়েছেন ও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তা ৩১ শতাংশে এসে ঠেকেছে। ‘ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যারা কাজ হারিয়েছেন ও কাজে ফিরতে পারেননি তারা মূলত কল-কারখানা, ঘর-গৃহস্থালী ও দিনমজুরের কাজ করতেন। ফলে তারা জীবিকা হারিয়ে বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হলেও তারা মানবিক সাহায্য থেকে বরাবরই বঞ্চিত হয়েছেন।

মহামারির কারণে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষ। এদের মাঝে আছে হত-দরিদ্র ও মাঝারি দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ বেশি। এদের অবস্থান দারিদ্র্যসীমার নিচে। এছাড়া রয়েছে দরিদ্র নয় কিন্তু ঝুঁকিতে থাকা এক শ্রেণীর মানুষ। যাদের বলা হচ্ছে ‘ভালনারেবল নন পোর’ (ভিএনপি)। দেখা গেছে, দারিদ্র্যসীমার ওপরে কিন্তু মধ্যম জাতীয় আয়-সীমার নিচে থাকা এই শ্রেণীর মানুষদের অবস্থা নি¤œগামী হতে শুরু করেছে।

গত জুনে দরিদ্র নয় কিন্তু সেই ঝুঁকিতে থাকা এই মানুষদের ৭২ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছিলো। তাদের আখ্যায়িত করা হয়েছিল ‘নতুন দরিদ্র’ হিসেবে। সেই নতুন দরিদ্রদের ৫০ ভাগ এখনো ঝুঁকিতে থাকা মানুষের তালিকায় বিদ্যমান। এই হার শহরে ৫৯ ভাগ এবং গ্রামে ৪৪ ভাগ। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে ১৪ দশমিক ৮ ভাগ নতুন দরিদ্রের এই হার বিগত বছরের জুনে ছিলো ২১ দশমিক ২ ভাগে। এসব ভাগ্যাহত মানুষদের কোন প্রণোদনার আওতায় আনা হয়নি।

আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণের পর বিভিন্ন সেক্টরে প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে সরকার। মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তারা যাতে ঘুরে দাঁড়ান সেজন্য দেয়া হয়েছে সরকারি সহায়তা। কিন্তু একেবারে তৃণমূল ও প্রান্তিক পর্যায়ে যেসব নারী কর্মীরা রয়েছেন তারা পড়েছেন বিপাকে। অর্থনীতিবিদ এবং গবেষকরা বলছেন, সরকার যে প্রণোদনা দিয়েছে তা শ্রেণি বিশেষের জন্য; নারীদের জন্য নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব নারী বেকার রয়েছেন তাদের কাজে ফেরাতে তাৎক্ষণিক এবং স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করা দরকার। অন্যথায় সামাজিক অস্থিরতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। 

২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত যৌথ গবেষণার দ্বিতীয় ধাপে করোনার কারণে সৃষ্ট দারিদ্র্যের গতিপ্রকৃতি এবং স্বল্প আয়ের মানুষদের মাঝে এর প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। এ বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে ৪৪ শতাংশ। কিন্তু এক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা বা অভাবগ্রস্তদের জন্য দুর্দশা লাঘবে সংশ্লিষ্টদের জন্য উল্লেখযোগ্য ও ইতিবাচক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।

করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের নারী শ্রমিকরা। কারণ, তাদের অধিকাংশই বিকল্প কর্মসংস্থানে ব্যর্থ হয়েছেন। এমতাবস্থায় নারী শ্রমিকদের জীবন-জীবিকায় ধারাবাহিকতা রক্ষা তাদের  বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন করা দরকার। আর এ দায় রাষ্ট্রের। সমাজের সভ্য হিসাবে আমরাও এ দায় এড়াতে পারি না।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ